ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল আলম নীরব, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. সাইফুল আলম খান মিলন। সংগৃহীত ঢাকা-১২ আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী ১৬ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাদের মধ্যে ৩ জনই হচ্ছেন ‘সাইফুল’। এই আসনের ভোটাররা বলছেন, ৩ সাইফুলের প্রচারে জমে উঠেছে নির্বাচন।
লড়াই হবে এই ৩ সাইফুলের মধ্যেই। জয়-পরাজয় যাই হোক শেষ হাসি হাসবেন সাইফুল-ই। এই ৩ প্রার্থী হচ্ছেন, বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সমর্থিত প্রার্থী বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক (কোদাল), বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল আলম নীরব (ফুটবল) ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. সাইফুল আলম খান মিলন (দাঁড়িপাল্লা)।
এখানকার অন্য প্রার্থীরা হলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কল্লোল বনিক, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট মোহাম্মাদ শাহজালাল, বিএনপি জোটের দল জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন-এনডিএমের মোমিনুল আমিন, আমজনতার দলের তারেক রহমান, জাতীয় পার্টির সরকার মোহাম্মদ সালাউদ্দিন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাহমুদুল হাসান, জনতার দলের ফরিদ আহমেদ, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মোছা. সালমা আক্তার, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের (মুক্তিজোট) মুনতাসির মাহমুদ, বিএনপি জোটের গণঅধিকার পরিষদের (জিওপি) আবুল বাশার চৌধুরী, গণসংহতি আন্দোলনের তাসলিমা আখতার, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (কাঁঠাল) মোহাম্মদ নাঈম হাসান।
শুরুতে এই আসনে বিএনপি সাইফুল আলম নীরবকে মনোনয়ন দেওয়ায় প্রচারে নেমে পড়েন তিনি। পরে জোটের সঙ্গে সমঝোতার কারণে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হককে আসন ছেড়ে দেওয়া হয়। সাইফুল আলম নীরব নির্বাচন থেকে সরে না যাওয়ায় তাকে বহিষ্কার করে বিএনপি। সে হিসেবে সাইফুল হক অনেক দেরিতে নেমেছেন প্রচারে। আর এ সুযোগটা কাজে লাগাতে চেষ্টা করছেন জামায়াতের সাইফুল আলম মিলন।
নানা বয়সি ভোটারের ভাষ্য, সাইফুল আলম নীরব স্থানীয় এবং এই আসনের পরিচিত মুখ। তার বিশাল কর্মী বাহিনী থাকায় তিনি শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। এই আসনে ধানের শীষের কোনো প্রার্থী নেই। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী হলেও সাধারণ মানুষের কাছে তুলনামূলক কম পরিচিত সাইফুল হক। তিনি নির্বাচন করছেন কোদাল প্রতীকে। বিএনপির একটি অংশ তার পাশে থাকলেও সুপরিচিত না হওয়া এবং ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন না করে কোদাল মার্কায় নির্বাচন করায় তিনি অনেকটা পিছিয়ে রয়েছেন। এই সুযোগটাকেই কাজে লাগাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন জামায়াতের প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন। এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল আলম নীরবকে এগিয়ে রাখলেও যেকোনো সাইফুল জয়ী হবেন বলে মনে করছেন তারা।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, হাতিরঝিল, শেরেবাংলা নগর ও রমনা থানার ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ৩৫ ও ৩৬ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ঢাকা-১২ আসন। এই আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৩২০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৭৪ হাজার ৩৪৯ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ৫৮ হাজার ৯৬৮, ৩য় লিঙ্গের ৩ জন ভোটার। রাজধানীর ব্যবসায়িক হাব হিসেবে পরিচিত কারওয়ান বাজার এ নির্বাচনি এলাকার অন্তর্গত। জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ও পড়েছে ঢাকা-১২ আসনে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এ আসনের দিকে নজর রয়েছে দেশবাসীর। ৩ সাইফুল-ই জনগণের ভোটে নির্বাচিত হতে পারলে এই আসনটিকে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ, মাদক ও কিশোর গ্যাংমুক্ত, এলাকার রাস্তা, ড্রেনেজ, শিক্ষা ও সামাজিক অবকাঠামোর উন্নয়ন করে বাসযোগ্য এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট চাইছেন।
হাতিরঝিলের বাসিন্দা পারভেজ। এ আসনে প্রার্থীদের প্রচার নিয়ে জানতে চাইলে বলেন, ‘ঢাকা-১২ আসনে সংসদ সদস্য পদে সাইফুলের ছড়াছড়ি। এ নিয়ে ভোটাররাও বেশ কৌতূহলী।’
মগবাজারের মধুবাগ এলাকার ফারুক ভূঁইয়া বলেন, কোদাল মার্কার প্রার্থীকে সাধারণ মানুষ ততটা চেনে না। ভোটের মাঠে তাকে প্রথম দেখছে। তাই ফুটবল আর দাঁড়িপাল্লার মধ্যেই মূল লড়াই হবে।
মধুবাগ এলাকার বাসিন্দা রনি বলেন, মানুষ মূলত মার্কা দেখে ভোট দেয়। এই আসনে ধানের শীষ মার্কার কোনো প্রার্থী নেই। এতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা সুবিধা পাবেন বলে মনে হয়।
পূর্ব রাজাবাজারের ব্যবসায়ী সুমন বলেন, নীরবকে এলাকাবাসী বিএনপির নেতা হিসেবে চেনেন। সে ক্ষেত্রে মার্কা যেটাই হোক, বিএনপির বেশিরভাগ ভোট তার পক্ষেই যাবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে এবং দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও দলটির স্থানীয় অনেক নেতাকর্মী নীরবের পক্ষেই কাজ করছেন। মিছিল, সভা ও প্রচারে তাদের দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে বিএনপির একজন সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর নীরবের নির্বাচনি কর্মকাণ্ডের সমন্বয় করছেন।
নীরবের প্রধান নির্বাচনি ক্যাম্পেইনার আবু সুফিয়ান দুলাল সময়ের আলোকে বলেন, আমরা বিএনপি করি। কোদাল মার্কাকে বিএনপি সমর্থন দেওয়ায় সে কিছু ভোট পাবে, বাকি সব ভোট ফুটবল প্রতীকে আসবে।
তার দাবি, নীরব এই আসনের স্থায়ী বাসিন্দা, সে হিসেবে সবাই নীরবকে ভোট দেবে। সে জন্য নীরবের জয়ের সম্ভাবনা বেশি। তবে লড়াই হবে দাঁড়িপাল্লার সঙ্গে।
সাইফুল হকের পক্ষে নির্বাচনি প্রচারের বিষয়টি দেখভাল করছেন বিএনপি নেতা আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ার। তিনি সময়ের আলোকে বলেন, বিএনপি কোদাল প্রতীককে সমর্থন দেওয়ায় ওনার অবস্থান ভালো। আমি মনে করি ভালো ভোটে জয়ী হবেন, মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে জামায়াতের সঙ্গে। ফুটবল প্রতীকের প্রার্থীর অনেক বদনাম আছে। আমার এলাকায় বিশাল ভোট ব্যাংক রয়েছে তারা সবাই কোদাল মার্কায় ভোট দেবে বলে মনে করেন তিনি।
জামায়াত প্রার্থীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়কারী ইঞ্জিনিয়ার নোমান সময়ের আলোকে বলেন, দাঁড়িপাল্লার পক্ষে জনগণের সাড়া ভলো। এই আসনের মানুষ এখন আর পুরোনো বন্দোবস্ত চায় না, তারা পরিবর্তন চায়। সে জন্য মনে করি দাঁড়িপাল্লা মানুষ সমর্থন করছে, আমরা বিপুল ভোটে জয়ী হব।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট প্রার্থী সাইফুল হক সময়ের আলোকে বলেন, রাজনীতি আমার জন্য কোনো ব্যবসা নয়, এটি আমার কাছে ইবাদতের মতো। জনগণের কল্যাণ ছাড়া আমার কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ নেই। তিনি বলেন, ঢাকা-১২ আসনের সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত এবং অবহেলার শিকার।
তিনি আরও বলেন, এই এলাকায় চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও মাদকের দৌরাত্ম্য ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ক্ষমতায় গেলে এসব অপশক্তির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আমার অন্যতম অগ্রাধিকার। এ সময় তিনি বলেন, ঢাকা-১২ আসনে এত আবর্জনা জমেছে যে কোদাল দিয়ে পরিষ্কার করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। তিনি আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে কোদাল প্রতীকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
সাইফুল আলম নীরব বলেন, ‘আমি এ এলাকার সন্তান, এখানে আমার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা। এলাকার সন্তান হিসেবে আমার চাওয়া এ এলাকার ভোটাররা আমাকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করে এলাকার কাজ করার সুযোগ দেবে।
নীরব বলেন, ঢাকা-১২ মর্ডান এলাকা হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করব। পরিষ্কার ভাষায় বলতে চাই আল্লাহ আমাকে সফল করলে মাদকের কোনো চিহ্ন থাকতে দেব না। চাঁদাবাজদের অস্তিত্ব থাকতে দেব না। কিশোর গ্যাং থাকবে না। তিনি বলেন, আমি শহিদ জিয়া এবং খালেদা জিয়ার সৈনিক, আমি তারেক রহমানের সৈনিক, আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী। এখানে কোনো ধানের শীষ প্রতীক নেই, ধানের শীষ মানেই ফুটবল। এ আসনে বিএনপি মানেই ফুটবল। ঢাকা-১২-তে শহিদ জিয়ার মার্কা ফুটবল বলে দাবি করেন তিনি।
জামায়াত প্রার্থী সাইফুল আলম মিলন বলেন, ‘ভোটাররা আমাকে বেছে নেবেন ও ভোট প্রদান করবেন। ইতিমধ্যে ১১ দলীয় জোটের পক্ষে গণজোয়ার তৈরি হয়েছে, আমরা ব্যাপক জনসমর্থন পাচ্ছি। মানুষ বর্তমান রাজনীতির পরিবর্তন চায়।’
সময়ের আলো/এআর