আপসহীন এক মহীয়সীর শেষ বিদায়ের আয়োজন। শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় বিদায় জানাতে লাখ লাখ শোকার্ত মানুষ যেন কার্পণ্য করেনি একটুও। কেউ মাইলকে মাইল পথ পায়ে হেঁটে কেউবা রিকশা-সাইকেল ভ্যানে চড়ে আসেন সংসদ ভবন এলাকায়। উদ্দেশ্য একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক ও গণতান্ত্রিক অভিভাবক খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশগ্রহণ। যিনি ছিলেন একাধারে বিএনপির মেরুদণ্ড, বাংলাদেশের রাজনীতির আপসহীন নক্ষত্র।
দল ছাপিয়ে অগণিত সাধারণ মানুষের অশ্রুজলে চির বিদায় নিলেন খালেদা জিয়া। তাদের ভাষ্য, জানাজায় এত মানুষের উপস্থিতি দেশের ইতিহাসে আর দেখেননি তারা। জানাজা শেষে বিএনপি চেয়ারপারসনকে শায়িত করা হয় তার স্বামী আরেক কিংবদন্তী সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের (বীর উত্তম) কবরের পাশে। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বুধবার তাকে দাফন করা হয়। নিজ হাতে মরহুমাকে কবরে নামান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
বুধবার ভোর থেকেই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসতে থাকে শোকের মিছিল। বেলা বাড়ার সঙ্গে শোকের স্রোত মিলিত হয় রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও সংসদ ভবন এলাকায়। দলমত-নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ ছুটছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে শেষ বিদায় জানাতে। জানাজার সময় স্রোত ছাপিয়ে যায় রাজধানীর কারওয়ান বাজার থেকে শ্যামলী পর্যন্ত। যেদিকে চোখ গেছে শুধু শোকার্ত মানুষ। অনেকের চোখের কোনা পানিতে ছলছল করছিল। অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
তারা জানান, এত বড় জানাজা তাদের জীবদ্দশায় এর আগে কখনো দেখেননি। মিরপুর রোড, ধানমন্ডি, ফার্মগেট, পুরাতন বাণিজ্যমেলা, আগারগাঁও, বিজয় সরণি ছাড়িয়ে যায় মানুষের সমাগম। তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে। বিএনপি নেতাকর্মী ছাড়াও অসংখ্য পুরুষ-নারী, বৃদ্ধ, শিশু-কিশোর সবার অংশগ্রহণ ছিল খালেদা জিয়ার জানাজায়।
যারা খালেদা জিয়ার বক্তৃতা শুনে মুগ্ধ হয়েছেন। অনেক বাবা তার শিশু ও কিশোর সন্তানকে জানাজায় সঙ্গে নিয়ে আসেন। পরিচয় করিয়ে দেন দেশের জীবন্ত এক ইতিহাসের সঙ্গে। সড়কের পাশে স্থাপিত প্রজেক্টে দেখানো খালেদা জিয়ার গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে নানা আপসহীন সংগ্রামের সঙ্গে পরবর্তী প্রজন্মকে পরিচয় করিয়ে দেন অভিভাবকরা। জানাজায় অংশ নেওয়া অনেক বয়স্ক নাগরিক বলেন, খালেদা জিয়ার শুরুটা হয়েছিল রাজপথের সাহসী নেতৃত্ব দিয়ে আর বিদায় দৃঢ়তার ইমেজে। তার বিদায়ে রাজনীতিতে অপূরণীয় ক্ষত সৃষ্টি হলো। সমাপ্তি ঘটল রাজনীতির শৈল্পিক এক অধ্যায়ের।
বৃহস্পতিবার বিকাল সাড়ে ৪টায় সাবেক বিএনপি চেয়ারপারসনকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়। সাড়ে চুয়াল্লিশ বছর আগে যেখানে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে সমাহিত করা হয়েছে, সেই জিয়া উদ্যানে স্বামীর পাশেই শায়িত হন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।
দাফনের সময় কিছুটা দূরে বিমর্ষচিত্তে দাঁড়িয়ে ছিলেন তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান এবং আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী সৈয়দা শামিলা রহমান সিঁথিসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা। তারা সবাই আলাদাস্থানে জানাজায় অংশগ্রহণ করেন। এর বাইরে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা সেখানে দাঁড়িয়ে দাফন প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করেন। কবরে নামেন খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান ও ভাই শামীম ইস্কান্দার।
এর আগে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা থেকে খালেদা জিয়ার মরদেহ জিয়া উদ্যানে নেওয়া হয়। জিয়াউর রহমানের সমাধির কাছাকাছি নেওয়ার পর খালেদা জিয়ার মরদেহবাহী কফিন কাঁধে নিয়ে কবরে নিয়ে যান সেনা ও নৌবাহিনীর সদস্যরা। এরপর রাষ্ট্রপতির তরফে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কবরে শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আদিল। তারপর প্রধান উপদেষ্টার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ তারিক পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের তরফে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল শ্রদ্ধা জানান। তারপরে শ্রদ্ধা জানান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এরপরে শ্রদ্ধা জানান সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান ও বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান। তারপর সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা গার্ড অব অনার প্রদান করে। এ সময় বিউগলে করুণ সুর বেজে ওঠে। শেষে প্রয়াতের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। মোনাজাতের পর তারেক রহমানের কাছে এসে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী ও তিন বাহিনী প্রধানরা সহমর্মিতা প্রকাশ করেন।
জানাজায় জনসমুদ্র : বুধবার বেলা ৩টায় জাতীয় সংসদের সামনে জনসমুদ্রের মধ্যে খালেদা জিয়ার জানাজা হয়। জাতীয় সংসদ ভবনের ভেতরের মাঠ, বাইরের অংশ এবং পুরো মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ছাড়িয়ে আশপাশের সব সড়ক, অলিগলি থেকে অজস্র মানুষ তাতে শরিক হন। এ ছাড়া ফার্মগেটের ফুট ওভারব্রিজ, এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেলের সিঁড়ি ওবং স্টেশনের দোতলাতেও ভিড় দেখা গেছে। ওই এলাকায় যে যেভাবে পেরেছেন পশ্চিমমুখী হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে কেবল রাজধানী থেকে নয়, তীব্র শীতের মধ্যে অন্যান্য জেলা থেকেও অনেক মানুষ এদিন ভোরবেলা ঢাকায় প্রবেশ করেন। অনেকে আবার বাস-গাড়ি-মাইক্রো রিজার্ভ করে এসেছেন আগের রাতে।
এই মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতেই ১৯৮১ সালের ২ জুন খালেদা জিয়ার স্বামী তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জানাজা হয়েছিল। পরে তাকে সমাহিত করা হয় জিয়া উদ্যান। ৪০ দিন ধরে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়াকে মঙ্গলবার সকাল ৬টায় মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। তার মৃত্যুতে দেশে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক চলছে, বুধবার ঘোষণা করা হয় সাধারণ ছুটি। বুধবার সকাল সোয়া ৯টায় এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে খালেদা জিয়ার কফিন নেওয়া হয় গুলশান অ্যাভিনিউয়ের ১৯৬ নম্বরে তার ছেলে তারেক রহমানের বাসায়। খালেদা জিয়ার মরদেহ নেওয়ার পর সেখানে স্বজন ও নেতাকর্মীরা তাকে শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানান।
মায়ের কফিনের পাশে বসে ছেলে কুরআন তেলাওয়াত করেন। পরে জাতীয় পতাকা শোভিত লাশবাহী গাড়ি দুপুর পৌনে ১২টার দিকে সংসদ ভবনের সামনে পৌঁছায়। গাড়িবহরে একটি বাসে করে সেখানে পৌঁছান খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান ও তার পরিবারের সদস্যরা।
বাদ জোহর খালেদা জিয়ার জানাজা হওয়ার কথা থাকলেও তার আগেই সংসদ ভবন এলাকা লোকে লোকারণ্য হয়। জানাজায় প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ও সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের পাশাপাশি অংশগ্রহণ করেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান ও বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান। আরও উপস্থিত ছিলেন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন, মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, আসিফ নজরুল ও আদিলুর রহমান খান, কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার, সাবেক নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামসহ দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি জামায়াত ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, শামীম সাঈদী, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও হাসনাত আবদুল্লাহ, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান ও গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে দেখা গেছে। ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম, আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের আহমাদুল্লাহ ও আলোচিত ধর্মীয় বক্তা মিজানুর রহমান আজহারীসহ রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা বিএনপি নেত্রীর জানাজায় অংশ নেন।
জানাজায় মায়ের জন্য দোয়া ছেলে তারেক রহমানের : জানাজার আগে পরিবারের তরফে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার জন্য সবার কাছে দোয়া চান। তিনি বলেন, আমি মরহুমার বড় সন্তান তারেক রহমান। আমি আজকে এখানে উপস্থিত সব ভাই এবং বোনেরা- যারা উপস্থিত আছেন মরহুমা খালেদা জিয়া জীবিত থাকাকালীন অবস্থায় যদি আপনাদের কারও কাছ থেকে কোনো ঋণ নিয়ে থাকেন, দয়া করে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। আমি সেটি পরিশোধের ব্যবস্থা করব ইনশাআল্লাহ। একই সঙ্গে তিনি জীবিত থাকাকালীন অবস্থায় তার কোনো ব্যবহারে, তার কোনো কথায় যদি কেউ আঘাত পেয়ে থাকেন, তা হলে মরহুমার পক্ষ থেকে আমি আপনাদের কাছে ক্ষমা প্রার্থী। দোয়া করবেন। আল্লাহ তায়ালা যাতে তাকে বেহেশত দান করেন।
পুরাতন বাণিজ্যমেলায় খোলা মাঠে জানাজা শেষে অনেক মানুষ বলাবলি করছিল ‘বক্তব্যে তারেক রহমানের পরিমিতবোধ প্রশংসার দাবি রাখে। অল্প কথায় তিনি সবার মনে দাগ কেটেছেন।’ জানাজার আগে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া লড়াকু জীববৃত্তান্ত ও শোকগাথা তুলে ধরেন। এ ছাড়া দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার আপসহীন নেতৃত্ব ও দেশের জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা উল্লেখ করেন।
খালেদা জিয়ার প্রতি শেষ শ্রদ্ধায় বিদেশি অতিথি : বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে আসেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, পাকিস্তানের জাতীয় সংসদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক, ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডি এন ধুঙ্গেল, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দা শর্মা, শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিজিতা হেরাথ, মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতির উচ্চ শিক্ষা, শ্রম ও দক্ষতা উন্নয়নবিষয়ক মন্ত্রী আলি হায়দার আহমেদ। চীন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন মিশনের প্রধানরাও তাদের দেশের পক্ষে খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধা জানাতে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে শেষ যাত্রায় অংশ নেন।
নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আপসহীন নেত্রী অভিধা পাওয়া খালেদা জিয়া মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছিলেন গত ২৭ নভেম্বর থেকে। ওইদিন তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) নেওয়া হয়। ২৩ নভেম্বর থেকে তিনি এভারকেয়ারের ভর্তি ছিলেন। এর আগে এই হাসপাতালে বহুবার ভর্তি ছিলেন খালেদা জিয়া। প্রতিবারই তিনি মোটামুটি সুস্থ হয়ে বাসভবন ফিরোজায় ফিরেছেন। এই যাত্রায় আর ফেরা হলো না। গত ৪০ দিন ধরে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়াকে মঙ্গলবার সকাল ৬টায় মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। ৭৯ বছর বয়সি খালেদা জিয়া বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন ৪১ বছর। তিনি পাঁচবারের সংসদ সদস্য, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, আর বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেছেন দুবার।