চোখেমুখে বিষাদের ছায়া। শরীরটাও বেশ ক্লান্ত। দিনাজপুর থেকে রাতভর জার্নি করে ঢাকায় এসেছেন সত্তরোর্ধ্ব বয়সি আব্দুল হান্নান। বুধবার সকালে রাজধানীর ফার্মগেটের ইন্দিরা রোডে একটি ভবনের সামনে বসে তসবি জপছিলেন। আর দোয়া করছিলেন প্রিয় নেত্রী খালেদা জিয়ার জন্য। সেখানেই কথা হয় তার সঙ্গে।
তিনি জানান, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বাবার বাড়ি আমাদের দিনাজপুরের বালুবাড়ী এলাকায়। ওই এলাকার তৈয়বা ভিলা বাড়িতেই কেটেছে তার শৈশব ও কৈশোরের দিনগুলো। বর্তমানে সেই বাড়িতে তার কেউ বসবাস করেন না। সেভাবে পরিচয় না থাকলেও আমি ছোট থেকেই তাকে দেখেছি। তার মা-বাবার গল্প বড়দের কাছ থেকে শুনেছি। কিন্তু আমি কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নই। কিন্তু মন থেকেই তাকে ভালোবাসি। তাই এই বয়সেও তার জানাজায় ছুটে এসেছি।
তিনি জানান, খালেদা জিয়া দিনাজপুরের গর্ব, দেশের গর্ব। আমরা তার জন্য গর্ব করি। তিনি যে রাজনীতির ‘আপসহীন নেত্রী’ ছিলেন তার প্রমাণ এই লাখ লাখ মানুষ। এত মানুষ আমি জীবনেও দেখিনি। যেদিকে তাকাই শুধু মানুষ আর মানুষ। এমন ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর গৌরবের বিদায় কজনের ভাগ্যেই বা জোটে?
আব্দুল হান্নানের পাশে বসা ছিলেন সিলেটের বাসিন্দা জাকারিয়া আরেফিন। তিনি জানান, রাতে সিলেট থেকে এসে ঢাকায় এক আত্মীয়ের বাসায় ছিলাম। সকালে সংসদ ভবনে এসেছি। ধন্য খালেদা জিয়া। আমি ধন্য- এমন জানাজায় অংশ নিয়ে ইতিহাসের অংশ হতে পেরেছি। দল-মত নির্বিশেষে শোকার্ত মানুষের এই ঢল প্রমাণ করল রাজনীতির ‘আপসহীন নেত্রী’ খালেদা জিয়া মানুষের হৃদয়ে কতটা গভীরে স্থান করে নিয়েছিলেন। অনন্তকালের মহাযাত্রায় ভালো থাকবেন আপসহীন নেত্রী। সবাই সেই দোয়া করবেন।
শরিয়তপুর সদর থেকে জানাজায় অংশ নিতে এসেছে কলেজপড়ুয়া শফিকুর। সে সময়ের আলোকে বলেন, জানাজায় অংশ নিয়ে আমিও ইতিহাসের সাক্ষী হতে পেরেছি। আমার ধারণা- পৃথিবীতে আর কারও জানাজায় এত মানুষ হয়নি আজ পর্যন্ত।
বুধবার বেলা ৩টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। তার আগে সকাল থেকেই সংসদ ভবন ও ঢাকা মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের আশপাশের সড়কগুলো কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।
কনকনে শীত উপেক্ষা করে লাখ লাখ মানুষ ভিড় করে। সময় যত গড়ায়, ভিড় ততই বাড়তে থাকে। শুধু ঢাকা নয় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ছুটে আসেন ইতিহাসের মহীয়সীকে শেষ বিদায় জানাতে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ঢল রূপ নেয় এক বিশাল জনসমুদ্রে। শুধু দলীয় নেতাকর্মী নন, জানাজায় অংশ নেন বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতা, সাধারণ চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী, রিকশাচালক থেকে শুরু করে দেশের সর্বস্তরের মানুষ।
ভিড়ের চাপে সংসদ ভবনের আশপাশের গাছ, ফুটপাথ, অলিগলি এমনকি নিকটস্থ ভবনগুলোর ছাদও ছিল লোকে লোকারণ্য। জানাজাস্থল মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ পূর্ণ হয়ে সেই জনস্রোত আছড়ে পড়েছিল আশপাশের কয়েক কিলোমিটারজুড়ে। এর মধ্যে উত্তরে জাহাঙ্গীর গেট, পশ্চিমে মিরপুর রোড এবং পূর্বে ফার্মগেট পেরিয়ে কারওয়ান বাজার, বাংলামোটর ও মগবাজার পর্যন্ত।
মাইকের আওয়াজ যতদূর পৌঁছায়, মানুষ ততদূরেই রাস্তায় কাতারবন্দি হয়ে দাঁড়িয়েছেন। অনেকের চোখের কোণে জল, কেউবা হাত তুলে নীরবে দোয়া করছেন। ঢাকা যেন শোকযাত্রার নগরীতে পরিণত হয়। কেউ সেøাগান দিচ্ছেন না, কেউ নির্দেশনা দিচ্ছেন না, তবু সবাই একই দিকে যাচ্ছে। এক নীরব শৃঙ্খলা, যা কেবল শোক থেকেই জন্ম নেয়।
আবার কেউ কেউ খালেদা জিয়ার ত্যাগ, বন্দি হওয়াসহ নানা বিষয়গুলো তুলে ধরে আলোচনা করেন। তারা বলেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রায় দেশের জন্য তিনি (খালেদা জিয়া) সব উজাড় করে দিয়েছেন। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বাংলাদেশে গণতন্ত্র, বহুদলীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে খালেদা জিয়ার ভূমিকা স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
দেশ ও জাতির প্রতি তার অবদান জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে এবং দেশের মানুষের জন্য অনুকরণীয়, অনুসরণীয় ও প্রেরণাদায়ী এবং দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। তবে জানাজায় অংশ নেওয়া বিএনপির নেতাকর্মী থেকে শুরু করে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ মানুষ সবাই এক বাক্যে স্বীকার করেছেন- দেশে এমন জানাজা এর আগে আর দেখেনি কেউ।
জানাজায় অংশ নিতে আসা গাজীপুর থেকে ব্যবসায়ী হাজী মোতালেব হোসন সময়ের আলোকে বলেন, আমি প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জানাজাতে অংশ নিয়েছি। সেটি ১৯৮১ সালের কথা। দেশের ইতিহাসে সেটাই সর্ববৃহৎ জানাজা বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু আজ ৪৪ বছর পর তার স্ত্রীর জানাজায় এসে মনে হচ্ছে, সেই রেকর্ড ভেঙে আরও কয়েকগুণ বেশি মানুষ হয়েছে। ইতিহাস আবার ফিরে এসেছে।
আমার বিশ্বাস- এটি মুসলিম বিশ্বের স্মরণকালের বড় জানাজা। এটি ইতিহাস হয়ে থাকবে। কোনো মুসলিম নারীর সর্ববৃহৎ জানাজায় এত মানুষ হয়েছিল। আর এমন ভালোবাসা জোর করে আদায় করা যায় না। এটা আল্লাহ প্রদত্ত বিষয়। তিনি যাকে সম্মান দেন, কেউ তাকে অসম্মান করতে পারে না।
প্রিয় নেত্রীর মৃত্যুর সংবাদে বগুড়া থেকে ছুটে এসেছেন মহিলা দলের নেত্রী নীলা রহমান। অশ্রুসিক্ত নয়নে তিনি বলেন, আজ ভোরে ঢাকায় এসে এভারকেয়ার হাসপাতালে গিয়েছিলাম। শুধু প্রিয় নেত্রীকে একবার দেখার জন্য। কিন্তু দেখতে পারিনি। সেখান থেকে জানাজার নামাজে এসেছি।
নীলা রহমান বলেন, আমাদের নেত্রী গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার আদায়ের আজীবন সংগ্রাম করেছেন। দেশের জন্য তিনি সব উজাড় করে দিয়েছেন। জানাজায় অংশ নিতে কয়েক কিলোমিটার হাঁটব, এতে আর কষ্ট কী? ম্যাডাম আরও কিছু দিন ভালো থাকতে পারতেন।
কিন্তু স্বৈরাচার শেখ হাসিনার প্রতিহিংসার রাজনীতির কারণে মিথ্যা ও বানোয়াট মামলায় তাকে ১৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং দীর্ঘদিন কারাবাস করতে হয়েছিল। তাকে কারাগারে রেখে চরম মানসিক নির্যাতন করা হয়েছে। চিকিৎসা পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। দেশের মানুষ তাকে আজীবন মনে রাখবে।
লাখ লাখ লোকের ভিড়ে কথা হয় ২৫ বছর বয়সি মানুষ হোসেনের সঙ্গে। তিনি বুধবার দুপুরে ফেনী থেকে ঢাকায় এসেছেন শুধু খালেদা জিয়াকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে। তিনি সময়ের আলোকে বলেন, আমাদের ফেনী থেকে খালেদা জিয়া বারবার নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু আমি তার শাসন দেখিনি।
তবে আমার পরিবার ও মানুষের কাছ থেকে শুনেছি। যখন থেকে বুঝতে শিখেছি, তখন থেকে দেখেছি, খালেদা জিয়া শুধু নির্যাতিত হয়েছেন। দেশের জন্য অনেক কিছু হারিয়েছেন। আপসহীন নেত্রী খালেদা জিয়ার জন্য সাধারণ মানুষের এমন ভালোবাসাই প্রমাণ করে দেশের কল্যাণে তিনি সঠিক পথেই ছিলেন।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইয়াসিন ইবনে জাবির বলেন, নিজেকে এতিম মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, মাথার ওপর থেকে একটা ছায়া হারিয়ে গেল। এই শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। তার অবদান নিয়ে কথা বলতে গেলে তা শেষ করা যাবে না। ফ্যাসিস্ট খুনি হাসিনা যাকে অসম্মান করতে চেয়েছিল আল্লাহ তাকে সম্মান দিয়েছেন। খালেদা জিয়ার জানাজার নামাজের এই দৃশ্য ইতিহাস হয়ে থাকবে। ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে খালেদা জিয়ার রাজসিক এ প্রস্থান।
সময়ের আলো/কেএইচও