গত
দেড়-দুই বছর ধরেই দেশে বিনিয়োগ খরা চলছে। অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীরা
একরকম হাত গুটিয়ে রেখেছেন। নতুন বছর, ২০২৬ সালেও বিনিয়োগের মন্দাভাব কাটিয়ে
সচল করা বড় চ্যালেঞ্জ হবে। কেননা বিনিয়োগ বৃদ্ধি নির্ভর করছে আগামী
ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু হয় এবং কতটা স্থিতিশীল সরকার আসে
তার ওপর।
এ ছাড়া নতুন বছরে অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য বড়
চ্যালেঞ্জ রয়েছে এলডিসি থেকে উত্তরণ। চলতি বছরের নভেম্বরে বাংলাদেশের
এলডিসি থেকে উত্তরণের কথা রয়েছে। এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটলে বিশ্ব বাজারে
পণ্য রফতানিতে শুল্ক ছাড় সুবিধা হারাবে বাংলাদেশ। যদিও ব্যবসায়ীরা এলডিসি
উত্তরণ ৬ বছর পিছিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন। তবে সরকার এ বিষয়ে এখনও অনড়
থাকায় হয়তো চলতি বছরেই বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটবে। শেষ পর্যন্ত
যদি এমনটি ঘটেই যায় তাহলে নতুন বছরটি দেশের ব্যবসায়ীদের জন্য হবে বড়ই
চ্যালেঞ্জের।
বিনিয়োগ ও এলডিসি উত্তরণ ছাড়াও ২০২৬ সালে উচ্চ
মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা, কর্মসংস্থান বাড়ানো, খেলাপি ঋণের বোঝা কমিয়ে আনা,
সামষ্টিক অর্থনীতিতে গতি ফিরিয়ে আনা এবং রফতানি বাণিজ্যে স্থিতিশীলতা আনাও
চ্যালেঞ্জের হবে। একই সঙ্গে বিদায়ি বছর, ২০২৫ সালে রেমিট্যান্সে যেভাবে
ধারাবাহিক ভালো অবস্থা ছিল সেটি ধরে রাখাও চ্যালেঞ্জের।
অর্থনীতিবিদরা
বলছেন, নতুন বছরের ব্যবসা-বাণিজ্য কেমন চলবে, অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি কোন
দিকে যাবে- সেটি নির্ভর করছে আগামী জাতীয় নির্বাচনের ওপর।
এ বিষয়ে
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য
অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, গত অর্থবছরে অর্থনৈতিক
প্রবৃদ্ধি দুর্বল ছিল। প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ শতাংশেরও কম। অন্যদিকে
মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও উচ্চপর্যায়ে রয়েছে। ২০২৫ সালের প্রথম ৭ মাস গড়
মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশেরও বেশি ছিল। সর্বশেষ নভেম্বর মাসে তা কমে ৯ শতাংশের
কাছাকাছি আসে। রফতানি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে ধীরগতি দেখা গেছে। অর্থনৈতিক
কর্মকাণ্ডে চাঞ্চল্য তৈরি হয়নি। নতুন বছরের শুরু থেকেও এসব চ্যালেঞ্জ থেকে
যাবে।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের পর দেশ হয়তো একটি রাজনৈতিক
স্থিতিশীল অবস্থায় পৌঁছাতে পারবে। কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি
অর্জন কতটা হবে। বর্তমানে বিনিয়োগ এবং যে ধরনের জনমিতিক পরিস্থিতি আছে,
তাতে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনার একটা হিসাব বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ করে। সেখানে
সাড়ে ৬ শতাংশের বেশি সম্ভাবনা নেই। তবে বড় ধরনের সংস্কার হলে প্রবৃদ্ধির
সম্ভাবনা বাড়বে। উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে হলে আমাদের প্রবৃদ্ধি ৮
শতাংশে নিতে হবে এবং ২০৩৫ সাল পর্যন্ত তা টেকসই রাখতে হবে, যা খুবই
উচ্চাভিলাষী। কিন্তু ৮ শতাংশ না পারলেও আমরা যদি সাড়ে ৬ শতাংশেও উঠতে চাই,
তা হলে অর্থনৈতিক পূর্বসত্য হলো, সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা
ধারাবাহিকভাবে থাকতে হবে।
সদ্য বিদায়ি বছরে আর্থিক খাত ছিল বড়
চাপের মধ্যে। খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে দুর্বল পাঁচটি ব্যাংক একীভূত হওয়ায় ২০২৬ সালে ঋণপ্রদান ও আর্থিক
স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে কিছুটা শক্ত ভিত্তি তৈরি হয়েছে। তবে নতুন বছরে ৬ লাখ
কোটি টাকারও বেশি যে খেলাপিঋণের বোঝা রয়েছে তা কমিয়ে আনা অনেক বড়
চ্যালেঞ্জ হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ২০২৬ সালের জন্য অর্থনীতিতে
চারটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রথমত চলমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক সমস্যা
মোকাবিলা করা। দ্বিতীয়ত বিনিয়োগ, রফতানি, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও দেশের ভেতরের
চাহিদাসহ যেসব খাতের গতি কমে গেছে, সেগুলো আবার পুনরুজ্জীবিত করা। তৃতীয়ত
ব্যাংক, বীমা, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও পুঁজিবাজারসহ পুরো আর্থিক
খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনা। চতুর্থত একটি সুসংগঠিত অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি
বাস্তবায়ন করা।
তিনি বলেন, কিছু উন্নতি হলেও মূল্যস্ফীতি এখনও
বেশি। বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির প্রায় ২২ শতাংশের কাছাকাছি আটকে আছে।
রফতানি ও পণ্যের বৈচিত্র্য এখনও দুর্বল। গত ১৫ মাসে ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলো খুব
কম লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা পেয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন আরও
বলেন, অর্থনৈতিক দিক থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশ ২০২৬ সালে মিশ্র অবস্থার
মধ্যে প্রবেশ করছে। বিদেশি খাতের অবস্থা কিছুটা স্থিতিশীল হলেও অভ্যন্তরীণ
অর্থনীতি এখনও চাপে। বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল হয়েছে, রেমিট্যান্স
রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং ব্যালান্স অব পেমেন্টে চাপ কমেছে। বিদেশি খাত
এখন ভালো অবস্থায় রয়েছে, যা পরবর্তী সরকারের জন্য শক্ত ভিত্তি তৈরি করছে।
তবে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি এখনও দুর্বল। নতুন বছরে এসব জায়গায় অনেক উন্নতি
ঘটাতে হবে।
সময়ের আলো/এসকে/