নিস্তব্ধ শোকাচ্ছন্ন ‘ফিরোজা’

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাড়ির অভিভাবককে হারিয়ে শোকাচ্ছন্ন হয়ে আছে ‘ফিরোজা’। এ বাড়িতে দীর্ঘ সময় থেকেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ফিরোজার নিরাপত্তাকর্মীরা এখনও পাহারা

2026-01-02T02:42:45+00:00
2026-01-02T02:42:45+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
নিস্তব্ধ শোকাচ্ছন্ন ‘ফিরোজা’
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২ জানুয়ারি, ২০২৬, ২:৪২ এএম   (ভিজিট : ১২৪)
খালেদা জিয়ার বাসভবন ফিরোজা। ছবি : সংগৃহীত
বাড়ির অভিভাবককে হারিয়ে শোকাচ্ছন্ন হয়ে আছে ‘ফিরোজা’। এ বাড়িতে দীর্ঘ সময় থেকেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ফিরোজার নিরাপত্তাকর্মীরা এখনও পাহারা দিচ্ছেন বাড়িটি। প্রহরী ছাউনিসহ সবকিছুই সাজানো-গোছানো আছে ঠিক আগের মতোই। শুধু নেই বাড়ির মুরব্বি খালেদা জিয়া। ঢাকা সেনানিবাসে শহিদ মইনুল সড়কের যে বাসাটিতে জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান হিসেবে ছিলেন, যে বাসাটিতে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ছিলেন, তার মত্যুর পর ওই বাসাটি একমাত্র ঠিকানা ছিল খালেদা জিয়ার। কিন্তু  এক/এগারোর পরে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এলে ওই বাসা থেকে উচ্ছেদ হন খালেদা জিয়া। এরপর গুলশানের এ বাসাটি ‘ফিরোজা’ করা হয় বিএনপি চেয়ারপারসনের জন্য।

২০১৮ সালে এ বাসা থেকে পুরোনো ঢাকার আদালতে গিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলার রায়ে সরাসরি কারাগারে যান খালেদা জিয়া। করোনা প্রাদুর্ভাবের সময়ে শেখ হাসিনার সরকার বিশেষ শর্তে সাময়িক মুক্তি দিলে হাসপাতাল থেকে ফিরোজাতেই ওঠেন বিএনপি চেয়ারপারসন।

বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের অনেক স্মৃতি এ বাসায় লেগে আছে, যারা বাড়ির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত তাদের আবেগ-অনুভূতিও রয়েছে তাকে ঘিরে। বিএনপি চেয়ারপারসনের সিকিউরিটি ফোর্সের (সিএসএফ)একজন সদস্য বলেন, ম্যাডামের ডিউটি করতাম। আজকে ম্যাডাম নেই, পুরো বাড়িটাই খালি। বাড়ির ভেতরে ঢুকলে কেমন জানি একটা শূন্যতা, কেমন জানি একটা নিস্তব্ধতা কানে আসে। দোয়া করি, আল্লাহ যেন ম্যাডামকে ভালো রাখেন পরপারে। আরেক নিরাপত্তা কর্মী বলেন, ম্যাডাম সবসময় আমাদের খোঁজখবর  রাখতেন। বিকাল অথবা দুপুরে খবর নিতেন আমরা ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করছি কি না। তিনি ছিলেন আমাদের প্রাণের মা।

ফিরোজায় দায়িত্ব পালনরত নিরাপত্তাকর্মীরা বুকে কালো ব্যাজ ধারণ করেছেন। তাদের চোখে-মুখে শোকের ছায়া ফুটে উঠেছে।

ফিরোজার পাশের লাগোয়া বাসাটি হচ্ছে ১৯৬নং বাসা। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর তার পরিবারের জন্য খালেদা জিয়ার নামে বরাদ্দ দিয়েছিল তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারের সরকার। কয়েক মাস আগে ফিরোজায় এসে এ বাড়িটির দলিলসহ কাগজপত্র বিএনপি চেয়ারপারসনের কাছে হস্তান্তর করেছিলেন বর্তমান অন্তবর্তী সরকারের গণপূর্ত উপদেষ্টা  আদিলুর রহমান খান। সেই বাসাটিতে উঠেছেন তারেক রহমান। সেই বাসার সামনে দায়িত্বরত নিরাপত্তাকর্মীদের মধ্যেও শোকের ছায়া দেখা গেছে। গুলশান অ্যাভিনিউ ডিপ্লোমেটিক জোনের মধ্যপাড়ায় সেখানে নেতাকর্মীদের ভিড় সেভাবে নেই।

বাসায় দোয়া-দরুদে তারেক রহমান : মায়ের চলে যাওয়ার শোকে আচ্ছন্ন তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার সারা দিন পার করেছেন দোয়া-দরুদ ও নামাজে। বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য আতিকুর রহমান রুমন বলেন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বাসায় ম্যাডামের আত্মার মাগফিরাত কামনায় ইবাদত-বন্দেগিতে ছিলেন। দোয়া-দরুদ, কুরআন তেলাওয়াত করেছেন। আত্মীয়স্বজনরা অনেকে বাসায় আসছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে সান্ত্বনা জানাতে।

গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে শোকের ছায়া : দল ঘোষিত সাত দিনের শোকের অংশ হিসেবে গুলশানের অফিসে কালো পতাকা উড়ছে। জাতীয় পতাকা ও বিএনপির পতাকা অর্ধনমিত করা হয়েছে। এখানে শোকবই খোলা হয়েছে। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, রাজনীতিবিদরা আসছেন তাদের শোক জানাতে।

বৃহস্পতিবার সমাজ কল্যাণ উপদেষ্টা শারমীন এস মুর্শিদ, যুক্তরাষ্ট্রের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসন, ইরানের রাষ্ট্রদূত মনসুর চাভুশি, জামায়াতে ইসলামী আমির ডা. শফিকুর রহমান, ছারছীনা দরবার শরিফের পীর মাওলানা মুফতি শাহ আবু নছর নেছার উদ্দিন আহমেদ, জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি-বিএসপির চেয়ারম্যান ড. সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ মাইজভাণ্ডারী এবং ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি সভাপতি মাহবুবুর রহমানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা শোকবইয়ে স্বাক্ষর করেন।

জানাজায় বিপুলসংখ্যক মানুষ গভীর ভালোবাসারই প্রতিফলন, ফখরুল : বৃহস্পতিবার গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, খালেদা জিয়ার জানাজায় বিপুলসংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণ তার প্রতি মানুষের গভীর ভালোবাসারই প্রতিফলন।

খালেদা জিয়ার জানাজায় মানুষ বাড়ির ছাদ থেকেও অংশ নিয়েছে- এত বিপুল ভালোবাসার কারণ কী? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, এই ভালোবাসার কারণ হলো, বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি ছিলেন এক বিরল ব্যক্তিত্ব। যিনি তার নীতির প্রশ্নে কখনো আপস করেননি। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কখনো আপস করেননি। যিনি তার সমগ্র জীবন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে লড়াই করেছেন, কারাভোগ করেছেন। শেষ দিন পর্যন্ত তিনি অসুস্থ ছিলেন। কিন্তু কখনো দেশ ছেড়ে চলে যাননি।

খালেদা জিয়ার কবরে শ্রদ্ধা সর্বসাধারণের : বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কবরে বৃহস্পতিবারও শ্রদ্ধা নিবেদন করে সব শ্রেণিপেশার মানুষ। এক দিন বন্ধ থাকার পর গতকাল দুপুরে সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে শেরেবাংলা নগরে জিয়াউর রহমানের সমাধিস্থল। বিএনপি নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ অনেকে মোনাজাত করেছেন, ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন কেউ কেউ। কেউ বা দাঁড়িয়ে ছিলেন নীরবে, ছবিও তুলেছেন অনেকে। নেতাকর্মীরা তাদের প্রিয় নেত্রীর কবর জিয়ারত করছেন, কায়মনোবাক্যে দোয়া করছেন আল্লাহর দরবারে ‘পরপারে ভালো থাকেন’। সন্ধ্যায় বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সমাধিস্থলের পাশে মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। এখানে আলেম-ওলামা ও হুজুররা কুরআন তেলাওয়াত করছেন। এই মঞ্চ এখানে ৪০ দিন থাকবে।

বুধবার বিকালে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে সমাহিত করা হয় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশেই। এরপর থেকে বন্ধ ছিল সমাধিস্থলের গেট। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে সমাধিস্থল সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হলে নেতাকর্মীরা কবর জিয়ারতের সুযোগ পান। এরপর সমাধি প্রাঙ্গণে নেতাকর্মী-সমর্থকদের ঢল নামে। শিশু, স্কুলশিক্ষার্থী থেকে শুরু সব বয়সি নারী-পুরুষ আসেন সমাধি প্রাঙ্গণে। সন্ধ্যার দিকে বিএনপি চেয়ারপারসনের কবর জিয়ারত করতে আসেন মির্জা ফখরুল। গাড়ি থেকে নেমে কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দোয়া-মোনাজাত করেন। সমাধিস্থল থেকে বেরিয়ে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি। গাড়িতে উঠে চলে যান। এ সময় একান্ত সহকারী ইউনূছ আলী তার সঙ্গে ছিলেন।

গতকাল সকালে নিরাপত্তা বলবৎ থাকার মধ্যে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর কবর জিয়ারত করেন। সকালে নিরাপত্তা বেষ্টনীর সামনে দাঁড়িয়ে মোনাজাত করেছেন দলের যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স। জিয়ারত করে বাবর সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের নেত্রী ছিলেন জিয়াউর রহমানের আদর্শকে উড্ডীন করে রাখার একজন নেত্রী, যিনি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় মূর্ত প্রতীক হিসেবে পরিচিত সেই নেত্রীর আদর্শ অনুসরণ করেছেন আমাদের নেতা তারেক রহমান। আপনারা সবাই আমাদের নেত্রীর জন্য দোয়া করবেন, আল্লাহ তায়ালা যেন তাকে বেহেশতের সবচেয়ে ভালো জায়গায় স্থান দেন।

সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী বলেন, সকালে বাসায় থাকতে ইচ্ছা করছিল না। নেত্রীর কবর জিয়ারত করতে এসেছি। দেশনেত্রী অন্ততকালে চলে গেছেন কিন্তু তার আদর্শ আমাদের পাথেয় হয়ে থাকবে। গণতন্ত্রের সেই দেখানো পথে বিএনপি চলবে, আমাদের নেতা তারেক রহমান সেই পথে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নেবেন।

খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারতে কান্নায় ভেঙে পড়েন মেক্সিকোয় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবরে তিনি মেক্সিকোর ফ্লাইট বাতিল করে ঢাকায় আসেন।

সময়ের আলো/এসকে/ 



  বিষয়:   শোকাচ্ছন্ন  ফিরোজা  খালেদা জিয়া 


Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: