নতুন বছরে সাহিত্যের কাছে প্রত্যাশা

ফরিদ আহমদ দুলাল

সাহিত্য শব্দটির ব্যাখ্যা বিভিন্ন রকম পেয়েছি, তার মধ্যে পছন্দের ব্যাখ্যা হলো- ‘হিতের সঙ্গে যা, তা-ই সাহিত্য’; অর্থাৎ সাহিত্যের কাজ হলো

2026-01-02T05:21:42+00:00
2026-01-02T05:21:42+00:00
 
  শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২০ ভাদ্র ১৪৩৩
শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নতুন বছরে সাহিত্যের কাছে প্রত্যাশা
ফরিদ আহমদ দুলাল
প্রকাশ: শুক্রবার, ২ জানুয়ারি, ২০২৬, ৫:২১ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
সাহিত্য শব্দটির ব্যাখ্যা বিভিন্ন রকম পেয়েছি, তার মধ্যে পছন্দের ব্যাখ্যা হলো- ‘হিতের সঙ্গে যা, তা-ই সাহিত্য’; অর্থাৎ সাহিত্যের কাজ হলো মানবজাতির ‘হিত’ বা ‘কল্যাণ’। সাহিত্য কীভাবে মানুষের কল্যাণ করে সে ব্যাখ্যায় না যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে, কেননা সে ব্যাখ্যা সবাই জানেন এবং নিজের মতো করে বলতে পারেন। আমি বরং প্রত্যাশার কথা বলি; কী চাই আমি সাহিত্যের কাছে? অথবা কী চাই আমি কবি-লেখকদের কাছে? কী চাই সাহিত্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান অথবা সংগঠনের কাছে? আর যখন বিষয় হয় ‘নতুন বছরে সাহিত্যের কাছে প্রত্যাশা’; সংগত কারণে তখন আলোচনার সীমা কিছুটা সংক্ষিপ্ত হয়ে যায়; আবার অন্যভাবে বলতে পারি, যখন বিষয়ের সীমানা একটি বছরে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তখন সে ব্যাখ্যায় এবংবিধ জটিলতাও মুখোমুখি দাঁড়ায়। ‘নতুন বছরে সাহিত্যের কাছে প্রত্যাশা’র কথা বলতে গেলে অতিক্রান্ত বছরে সাহিত্য অঙ্গনের চিত্র, প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তি নিয়েও কিঞ্চিৎ আলোকপাত করা প্রয়োজন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, সমকাল নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে কিছুটা বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজন পড়ে; কারণ সমকালের আবেগের আঙিনা অনেকটাই কাঁচা থাকে আর কাঁচা আবেগে নাড়া লাগলে ক্ষরণের আশঙ্কাও বেশি থাকে; বিশেষ করে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সময়টি যখন অনেকটাই স্পর্শকাতর! সবদিক বিবেচনায় নিয়েই আলোচনায় ব্রতী হতে চাই। পাঠকের কাছেও সবদিক ঔদার্য দিয়ে বিবেচনায় নিতে আহ্বান জানাই; আলোচনার ফলাফল যেন কিছুতেই ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দে সংক্রমণ না হয়ে যায়। লেখকের কোনো কথা বা যুক্তি কারও মনঃপূত না হলে তিনি নিশ্চয়ই তার যুক্তি প্রদর্শন করে আপত্তি জানাতেই পারেন; কিন্তু কিছুতেই তা ব্যক্তিগত পর্যায়ে নয়। এবারে মূল আলোচনায় প্রবেশ করা যাক।

গত বছরের বাস্তবতায় শিল্প-সাহিত্যের অঙ্গন ছিল দ্বিধাগ্রস্ত এবং সংকটাপন্ন; ২০২৪-এর দ্বিতীয়ার্ধে দেশে যে আন্দোলন-সংগ্রাম সফল হলো, প্রবল প্রতাপশালী শাসকের অপসারণের দুঃসাধ্য সাধন হলো; তার রেশ পরবর্তী ২০২৫ জুড়েই বিরাজমান ছিল। সহজ কথায় বলতে গেলে বলতে হয়, শিল্প-সাহিত্যের জন্য বছরটি ছিল বাহ্যত বন্ধ্যা বছর। একান্তে শিল্পী-সাহিত্যিকরা নিজস্ব পরিমণ্ডলে কেউ কেউ নিজেদের চর্চা অব্যাহত রাখলেও জনসমক্ষে বা মিডিয়ায় কেউ সামান্য সরব ছিলেন না; আর মিডিয়ার সতর্ক-কৌশলী আচরণ সবাইকে দ্বিধাগ্রস্ত করে রেখেছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় ঘোষিত কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও নেপথ্য নিয়ন্ত্রণের অশুভ এক শৃঙ্খল কম-বেশি সবসময়ই সচল থেকেছে; যা নিয়ে যুক্তি-তর্ক প্রদর্শন করে বিজয়ী হওয়ার অবকাশ নেই। শিল্পী-সাহিত্যিকরা প্রায়শ ‘ট্যাগ’ এবং নিগ্রহের শিকার হয়েছেন; ‘মব’ ভায়োলেন্সে আক্রান্ত হয়েছে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক এবং বুদ্ধিজীবীরা আক্রান্ত হয়েছেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে; কিন্তু আক্রমণকারীদের আইনের আওতায় আনা হয়নি; উপরন্তু নিগৃহীতদের ওপরই নেমে এসেছে আইনের খড়গ; এমন বাস্তবতায় নতুন বছরে সাহিত্যের কাছে প্রত্যাশার কথা উচ্চারণ সহজ নয়। অবশ্য শিল্পকলার বিভিন্ন শাখা আর সাহিত্যের বাহ্যিক অবয়বে যথেষ্ট পার্থক্য আছে। কিন্তু পার্থক্য যতই থাকুক শিল্প-সাহিত্য অঙ্গনের মধ্যে আছে অদৃশ্য সুতোর বন্ধন; তাই সুস্থ সংস্কৃতি বিকাশের স্বার্থে শিল্পী-সাহিত্যিক, যারা সমাজে সৃজনশীল চর্চায় নিয়োজিত আছেন, তাদের জন্য সমাজে সম্মান প্রতিষ্ঠার জন্য জরুরি ভিত্তিতে সরকারের কিছু শুভ উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত। যা হোক আমি বরং নতুন বছরে সাহিত্যের কাছে প্রত্যাশার কথা তুলে ধরার চেষ্টা করি।

Advertisement
কোনো সাহিত্যকর্মীকে আমি বলতে পারি না, নমিত হও, নতজানু হও, নিজের বিশ্বাস ও সত্যের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে সাহিত্যচর্চায় ব্রতী হও! তা ছাড়া সাহিত্য এমন এক মাধ্যম, যা শুধুই সাহিত্যিকের বিশ্বাস-রুচি এবং চিন্তারই প্রতিফলন ঘটায়; সুতরাং সহজেই বলতে পারি, ‘সত্য-বিশ্বাস-আদর্শ-রুচি এবং মূল্যবোধের আলোকে প্রত্যেক লেখক নতুন বছর পূর্ণ উদ্যমে নিজের সৃষ্টিতে আত্মনিয়োগ করবেন; আপাতত এটুকুই প্রত্যাশা।’ কিন্তু সে প্রত্যাশা পূরণের কি ন্যূনতম সম্ভাবনা আছে? আমি সূচনাতেই বলেছিলাম- ‘কী চাই সাহিত্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান অথবা সংগঠনের কাছে?’ একজন সাহিত্যিক নিজের ইচ্ছানুযায়ী তার কবিতা-গল্প-উপন্যাস-গান রচনা করতেই পারেন; প্রবন্ধ লিখতেই পারেন, গবেষণাকর্ম চালিয়ে যেতেই পারেন এবং ট্রাঙ্কে তালাবদ্ধ করে রেখে দিতেই পারেন; কিন্তু সাহিত্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান অথবা সংগঠন যদি তার রচনাকে মানুষের কাছে পৌঁছাতে হাত প্রসারিত না করে, তা হলে সাহিত্যের ‘হিতের’ সঙ্গে চলার সম্ভাবনা থাকে কী করে? একটি গীতিকবিতায় যদি সুরের সংযোগ না ঘটে, যদি যন্ত্রীদের সহযোগে শিল্পী উপস্থাপন না করেন, তা হলে কী তার মূল্য! নাটক রচনার পর সেটি যদি মঞ্চে অভিনীত না হয়, তা হলে সে নাটক থেকে সমাজ হিতৈষণা পাবে কী করে! কবিতা-গল্প-উপন্যাস বা প্রবন্ধ যদি পাঠকের পাঠসীমায় না আসে, তা হলে সে সাহিত্যে সমাজ মানসের কল্যাণ সাধন হবে কী করে! সুতরাং কারও কাছে কিছু প্রত্যাশা করার আগে তাকে মুক্ত করে দিতে হবে। সৃষ্টিশীলতার পূর্বশর্ত ‘চিন্তার মুক্তি’।

সাহিত্য যত্ন এবং মনোযোগ চায়। কবিতা কবিকে কানে কানে বলে কবিতায় ব্রতী হও। প্রতিটি চরণ, পঙ্ক্তি অক্ষর-বর্ণ মনোযোগ চায়। কবিতা কখনোই নির্মিতির গ্রন্থনা নয়; প্রথমত কবিতায় স্বতঃস্ফূর্ততা, অতঃপর তাতে সচেতন নির্মিতি যুক্ত হয়। প্রতিটি শব্দের সমন্বিত বিন্যাসেই একটি উত্তীর্ণ কবিতার জন্ম হয়। কবিতা নানাবর্ণ রঙিন পাথর বসানো স্বর্ণপিণ্ড নয়, কবিতা উপলব্ধির কলস্বর। মূর্খ-অজ্ঞের হইচই আর মণি-মানিক্যের চাকচিক্যই কবিতা নয়। কবিতা নম্র-মোলায়েম, কবিতা মিতবাক, ভয়ানক রকম সংযমী। বিন্যাসের সুষম ঋজুতা কবিতার শক্তি-প্রাণ-ভ্রমরা। আমরা মনে রাখতে চাই চিৎকারের শক্তির চেয়েও নৈঃশব্দ্যের সামর্থ্য অনেক বেশি।

কাণ্ডজ্ঞানহীন অশিষ্ট মানুষের চিৎকারে কবিতা কখনো দিকভ্রান্ত হতে পারে; কবিকে তাই সতর্ক-সংযমী ও সহিষ্ণু হতেই হয়। কবিতা তো পাথর ছুড়ে দুর্বৃত্ত শয়তান নিধন নয়, কবিতা বরং পুষ্পার্ঘ্য নৈবেদ্য দিয়ে অনুপম সুন্দরের আবাহন। গল্প-উপন্যাস বা প্রবন্ধ, কোনোটিই এর ব্যতিক্রম নয়। কবিতার ভাব-বিষয় আর উপস্থাপন শৈলীর সঙ্গে সাযুজ্য রেখে তার জন্য যথাশব্দ নির্বাচন করতে হয়; শব্দ বাছাই করতে হয় ছন্দের চারিত্র্যের সঙ্গে মিল রেখে। 

কবিতাটি পড়ে যেন এই প্রতীতি দৃঢ় হয়, কবিতা মসৃণ এবং সাবলীল হতে নিয়মিত অনুশীলন প্রয়োজন। মরচে পড়ে গেলে দা-ছুরির ধার যেমন নষ্ট হয়ে যায়, অনুশীলনের ধারাবাহিকতা বজায় না থাকলে কবিতার মসৃণতায়ও মরচে পড়ে যায়। যেসব কাগুজে বন্ধুরা সৌজন্য করে কেবল প্রশংসাই করেন, তারা কিন্তু বন্ধুর ছদ্মবেশে কবির জন্য অমঙ্গলই বয়ে আনেন। কবির সত্য উচ্চারণের সাহস তখন রুগ্ন হয়ে যায়; কিন্তু কবির দায়িত্ব নিজের কবিতার গতিযাত্রায় দৃষ্টি রাখা। কোথায় কবিতা কেন শ্লথ হয়ে যাচ্ছে, কোথায় হোঁচট খাচ্ছে সেদিকে লক্ষ রাখা এবং এটিই কবির ছন্দের অন্তর্লোক আবিষ্কার। যে কথাগুলো কবিতা প্রসঙ্গ বলা হলো, একই কথা সাহিত্যের অন্যান্য শাখার ক্ষেত্রেও সমান প্রযোজ্য।

নতুন বছর সাহিত্যের কাছে প্রত্যাশা আমার তাই কেবল কবি-লেখকদের কাছে নয়, বরং সাহিত্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, প্রতিষ্ঠান, সংগঠন এবং রাষ্ট্র ও প্রশাসনের কাছেও। সুন্দর-সত্য ও কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় চিন্তার মুক্তি, বাক-স্বাধীনতা, পরমতসহিষ্ণুতা এবং সংযমের কোনো বিকল্প দেখি না।

সময়ের আলো এসকে/


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: