১ লাখ ডলার অথবা একুশ টাকা

জামিল জাহাঙ্গীর

পুরোনো কাপড়ের গাঁইট থেকে সংগ্রহ করা কোটের পকেটে ওয়াশের পরও ভাঁজ হয়ে চকচক করছিল এক লাখ ডলারের নোটটা! ‘হাহ, এক

2026-01-30T04:17:28+00:00
2026-01-30T04:17:28+00:00
 
  সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬,
৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
১ লাখ ডলার অথবা একুশ টাকা
জামিল জাহাঙ্গীর
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬, ৪:১৭ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
পুরোনো কাপড়ের গাঁইট থেকে সংগ্রহ করা কোটের পকেটে ওয়াশের পরও ভাঁজ হয়ে চকচক করছিল এক লাখ ডলারের নোটটা! ‘হাহ, এক লাখ ডলার, একের পর পাশাপাশি পাঁচটি শূন্য। ভাগ্য বুঝি বদলে গেছে। সুন্দর করে ছাপা দেশের নাম জিম্বাবুয়ে। খোকন মালো ক্রিকেট দেখতে এই দেশের নাম শুনেছে। তাই কান দুটো আর বেশি লাল হয়ে গেছে। মানি এক্সচেঞ্জে গেলেই ভাঙানো যাবে ভেবে দিলকুশা এসে জানতে পারল এর বিনিময় মাত্র ২১ টাকা! কী কাণ্ড! মনে মনে হেসে বলল, ‘ভাঙব না, ভাঁজ করে রেখে দিই। একদিন কাজে লাগতে পারে।’

কাজে লাগে না এমন জিনিস তার কাছে নেই। প্রয়োজনহীন ভেবে ফেলে দেওয়ার পরপরই একটা বিরাট প্রয়োজন এসে সামনে দাঁড়ায়। খোকন নোটটিকে সিগারেট প্যাকেটের ফিনফিনে সিলোফেনে মুড়ে মানিব্যাগের গোপন সুড়ঙ্গে রেখে দিল।

পেশায় ক্যানভাসার। তাবিজ-কবজ, হরিণের চামড়া, শিং এমনসব বিক্রি করে সে জীবিকা নির্বাহ করে। জীবনের তাগিদে তার স্থির থাকার কোনো উপায় নেই। আজ ঢাকায় তো কাল হবিগঞ্জ। পরশু কিশোরগঞ্জ। এমন করে সারা দেশে কখনো কখনো প্রতিবেশী দেশের সীমান্তঘেরা কোনো এক হাটে মজমা বসিয়ে অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-বিনোদনের এন্তেজাম করেন। তার কোনো পাসপোর্ট নেই। ভিসার তো প্রশ্নই ওঠে না।

প্রায়ই তাকে সীমান্তরক্ষীদের মুখোমুখি হতে হয়। ভারত আর মিয়ানমারের অনেক ফাঁকফোঁকরে তার আসা-যাওয়া। সহাস্যবদন আর সশ্রদ্ধ সমর্পণ বারবার তাকে দেশে ফিরিয়ে এনেছে। সবসময় যে এমন হয় তাও নয়। অনেক রকমের দফারফা করে নাকে খত দিয়ে ছাড়া পেতে হয়। নগদ জরিমানাও তাকে গুনতে হয়েছে বারকয়েক। তাই সীমান্তের রক্ষী আর দালালদের প্রতি তার একটা প্রচ্ছন্ন খেদ জমে আছে বুকের গভীরে। এসব পাসপোর্ট, কাঁটাতার তাকে চেতনে-অবচেতনে বেপরোয়া করে দেয়।

মাস তিনেক আগে ভোতামারির এক মেয়ে প্রলোভন দেখিয়ে ওর ব্যবসার সব উপকরণ হাতিয়ে নিয়েছে। মানুষের চেতন নিয়ে খেলা করা খোকন মালো বুঝতেই পারেনি মেয়েটির আড়ালে অন্য কেউ ওকে পথে বসিয়ে দেওয়ার প্ল্যান করে বসে আছে। পথে পথে বড় হওয়া যার স্বভাব তাকে পথে হার মানানো যায়, দমিয়ে রাখা যায় না।

খোকন মালো দমে যায়নি। পুরোনো গাছের বাকল, মহানন্দায় ভেসে আসা চকমকি পাথর, কবরস্থানের আশপাশের এলাকা থেকে কয়েকটা হাড়গোড় আর তার নানা রঙ্গের কাপড়ে পুঁটলি করে মজমার জন্য শিকড়-বাকড় সংগ্রহ করে ফেলেছে। এবার ঠিক করেছে নীলফামারী জেলার ওপরের কোনো এক সীমান্তঘেরা এলাকায় আস্তানা করবে। কিন্তু যেখানে সব হারিয়ে যায় সেখান থেকে সহসা সরে যেতে মন চায় না। সে একটা ঘোরের মধ্যে এদিক-ওদিক করে। তেঁতুলিয়ার মায়া তাকে ঘিরে রাখে ঘন কুয়াশার মতো জেঁকে।

কালো কালো কুয়াশা ভেসে আসছে পঞ্চগড়ের গ্রামের শেষ রাস্তার ওপর। ধুলো উড়ছে, হালকা হাওয়া খোকন মালোর মুখে লাগছে। দূরের সীমান্ত বাতি ঝলমল করছে। পুরোনো জামা, পকেটে এক লাখ ডলার, হাতে টর্চলাইটের আলোয় কিছু একটা দুর্লভ খুঁজতে খুঁজতে একদিন খোকন মালো পথ ভুলে সীমান্ত পার হয়ে ভারতে ঢুকে পড়ল। ঝলমল সীমান্ত বাতি, নদীর কুলকুল জল তার ঠোঁটের কাছে স্পর্শ করছে। হঠাৎ বাতাসে আওয়াজ ‘রুকো! ক্যা কর রহে হো? কোথা থেকে এলি?’

বিএসএফের হেলমেট পরিহিত সৈনিকরা ঘিরে ধরল। টর্চলাইটের ফোকাস খোকনের চোখে। ভয়ে হাত কাঁপছে থরথর করে। এতদিন ইচ্ছাকৃত আসা-যাওয়ার সঙ্গে আজকেরটা কিছুতেই মিলছে না। তবু স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলল, ‘ভাই, মেই ভুল সে চলা আয়া, বাস ঘুমনে আয়া থা।’ সেনারা চোখে চোখ রাখছে। বাতাস থেমে গেছে। সীমান্তে উত্তেজনা টানটান। ‘কারাগারে পাঠানো হবে’। একজন বলল, চোখে সংকেত। খোকন চুপ করে দাঁড়াল। হৃদযন্ত্র দ্রুত স্পন্দিত হচ্ছে। স্পষ্ট স্বরে বলল, ‘অরে ভাই, মেরে পাছ এক লাখ ডলারের একটা নোট আছে। এটি নিয়ে হলেও আমাকে পুশব্যাক করে দাও, জেলে মাত দালো, প্লিজ।’

সেনারা একে অন্যকে দেখল। সবার বিস্ময় দৃষ্টি নোটের দিকে।

‘ডলার নোট?’ একজন বিস্ময়ে বলল।

খোকন মানিব্যাগ খুলল। সিলোফেনে মোড়া নোট বের করল। সৈনিকরা চশমা দিয়ে পরীক্ষা করছে।

‘ঠিক হ্যায়, ইয়েহ হ্যায় এক লাখ!’

খোকন বলল, ‘তেঁতুলিয়া থেকে আমাকে যেতে হবে অনেকদূর। আমার কাছে আর কোনো টাকা নেই। তোমরা এক লাখ ডলার ভাঙালে অনেক টাকা পাবে। আমাকে বাড়ি ফেরার জন্য কিছু টাকা দাও।’ বিএসএফের মুরুব্বি ধীরে ধীরে মানিব্যাগ খুলল। নিজের পকেট থেকে দুটি ৫০০ রুপির নোট বের করে খোকনের হাতে দিল। ‘ইয়ে লো, নিরাপদে পার হও মহানন্দা লদী।’

আনন্দ আর উল্লাসে পুরো ক্যাম্পজুড়ে হইহই-রইরই কাণ্ড। পটকা, আতশবাজি আর শূন্যে গোলাবর্ষণে পুরো এলাকা একটা উৎসবে মেতে উঠল। এত বড় নোট আগে এই তল্লাটে কেউ দেখেনি। একটা অফিসার্স চয়েসের বোতল দিতে চাইল এক সীমান্তরক্ষী। খোকন মালো গুরুর দিব্যি খেয়ে বলল, ‘গুরু নিষেধ করেছেন, ডিউটিরত অবস্থায় এসব পান করা যাবে না।’ 

ওরা বিস্মিত হয়ে খোকন মালোর দিকে আরও ভালো করে তাকিয়ে দেখল। পকেটে এক লাখ ডলারের নোট আর বলে কি না মাল টানে না। এ মাল মানুষ না ভগবান!

খোকন মালোর গা ছমছম ভাব অনেকটা কেটে গেছে। গরুর দালালদের দলে ভিড়ে একটা বিড়ি চেয়ে আগুন ধরালো নিজের ম্যাচ দিয়ে। বড় করে একটা টান দিয়ে দম ছাড়ল। ধোঁয়ায় কুণ্ডলী পাকিয়ে বাতাস ভেঙে পড়ছে। কান ধরে একশোবার ওঠবস করিয়ে তাকে ছেড়েছে এই পয়েন্টের সীমান্তরক্ষীরা। অনেক দিন পরে হলেও একটা জুতসই জবাব দেওয়া গেছে। 

ভোতামারিতে সর্বস্বান্ত হয়ে বিএসএফের কাছে বিচার চেয়ে একশোবার কান ধরে ওঠবস করা খোকন মালোর জন্য এর চেয়ে আনন্দ হয় না। সেই মেয়েটির চেহারা মনে করতে গিয়ে পুরোপুরি চিত্র চোখে ভাসল না। নিজের ওপর বিরক্ত হতে চেয়ে খুশি হলো সে।

কুচক্রী সঙ্গিনীর চেয়ে ফণাতোলা শঙ্খিনী অনেক বেশি নিরাপদ খোকন মালোর গুরু লেবু চন্দ্র দাস শিখিয়েছেন। গুরুজি একবারের বেশি মেয়েমানুষের কাছে সমর্পিত হতে নিষেধ করেছেন। যে কবার খোকন কপাট ডিঙ্গিয়ে বাইরে গেছে সে কবারই ধরা খেয়েছে উপর্যুপরি। গুরুজি এখন ধূপগুড়ি আছেন। শীতের পুরো সময়টাই তিনি ঘরে কাটান। উত্তর কামাক্ষ্যাগুড়ি ধূপগুড়ি তুফানগঞ্জ ছেড়ে দূরে কোথাও যেতে চান না। এই সাফল্যের দিনে গুরুজির দর্শন চাওয়া নিষেধ।

রাতের অন্ধকারে সব সরঞ্জাম গোছগাছ করে আবার নতুন মজমা সাজাতে খোকন মালো পা দিয়েছে নতুন কোনো লোকালয়ে।

এফআর


  বিষয়:   ১ লাখ  ডলার  একুশ  টাকা 


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: