কষ্ট

আবু সাইদ কালাম

দাঁতের অসহনীয় ব্যথায় কাতর হয়ে শাহ আলম শেষ বিকালে হাসপাতালে যায়। বয়স তো আর কম হয়নি। পঞ্চাশ পেরিয়েছে অনেক আগেই।

2026-02-06T05:01:28+00:00
2026-02-06T05:01:28+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
কষ্ট
আবু সাইদ কালাম
প্রকাশ: শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৫:০১ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
দাঁতের অসহনীয় ব্যথায় কাতর হয়ে শাহ আলম শেষ বিকালে হাসপাতালে যায়। বয়স তো আর কম হয়নি। পঞ্চাশ পেরিয়েছে অনেক আগেই। পাঁচ-ছয় বছর বাকি, তারপর অবসরে যাবে। ডান চোয়ালের ওপরের মাড়িতে একটা দাঁত অনেক দিন ধরেই যন্ত্রণা দিচ্ছে। ব্যথানাশক ওষুধে সাময়িক শান্তি পায়। কিন্তু এবার আর পারেনি।

বেসরকারি ‘স্বদেশ হাসপাতাল’-এর কথা আগে থেকেই জানা। ভালো ডাক্তার বসেন। অভ্যর্থনাকক্ষে নাম দেখে জানতে পারে, নিচতলায় দাঁতের ডাক্তার বসেন। আলম ধীরপায়ে চেম্বার খুঁজতে থাকে। হঠাৎ চোখ পড়ে যায় নামফলের দিকে— ‘খন্দকার সামিয়া’।

মনে মনে ভাবে, পরিচিত কী?

স্মরণ করার চেষ্টা করে। ভেতর থেকে কোনো উত্তর খুঁজে পায় না। চেম্বারের সামনে রোগীর ভিড়। তবু সিরিয়াল দেয়। এক ঘণ্টা পরে ডাক্তারের চেম্বারে ঢোকার সুযোগ হয়। 
ডাক্তারের সামনে রোগীর আসনে বসে আলম। বলে, ‘ডানপাশের একটা দাঁত প্রচণ্ড ব্যথা দিচ্ছে। যদি মনে করেন, তোলা প্রয়োজন, তবে আর দেরি না করে তুলে দেন। তবু এই যন্ত্রণা থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মুক্তি চাই।’

ডাক্তার যন্ত্রপাতি দিয়ে দেখলেন। বললেন, ‘দাঁত তুলতে হবে না। কয়েক দিন ওষুধ খেলেই ঠিক হয়ে যাবে।’

আলম হালকা মন নিয়ে ওঠে। ডাক্তার বারবার তার দিকে তাকাচ্ছেন। রহস্যময় দৃষ্টিতে চোখে কিছু খুঁজে ফিরছেন। আলম পকেট থেকে ফি বের করতে চাইলে ডাক্তার থামালেন, ‘কিছু মনে করবেন না। একটা কথা জিগ্যেস করি। আপনি কি সুমির বাবা?’

‘হ্যাঁ।’

‘আমি সামিয়া, আপনার মেয়ের বান্ধবী। মনে আছে আঙ্কেল?’

আলম হালকা হাসে। তারপর বলে, ‘হ্যাঁ, মনে আছে। নামফলক দেখেই মনে হয়েছে তুমি— সেই সামিয়া।’

ডাক্তার বললেন, ‘বাইরে রোগীর ভিড় আছে। ফি নেব না, একদিন আমাদের বাসায় আসবেন।’

শাহ আলম বের হয়ে রিকশায় চাপে। মনে মনে ভাবে, সামিয়া তার লক্ষ্যে পৌঁছেছে।

কিন্তু ফি না নেওয়ার বিষয়টি মেলাতে গিয়ে মনে নানা প্রশ্ন জাগে। 

পরিচয় দিয়ে কি শুধু অভিব্যক্তি জানাতে চেয়েছিল, নাকি অন্য কোনো কারণ নিহিত আছে? অতীতের স্মৃতিতে ফিরে গিয়ে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করে আলম।

দুই
শহরের একটি আবাসিক এলাকার চার তলায় আলমের বাস ছিল। বেসরকারি কলেজে বাংলা পড়ায়। একই তলার অন্যপাশে থাকত সামিয়াদের পরিবার। বাবার পেশা ব্যাংক কর্মচারী। মেয়েটি তখন চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। মায়াবী মুখ, চপলতা আর মেধা— সব মিলিয়ে আলমের মেয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল।

কয়েক মাস পর তাদের পরিবারে ঘটে অঘটন। বাবা সাময়িক বরখাস্ত, আর্থিক সংকট, খাওয়া-পরার অভাব। কয়েক দিনে এমন অনটন এমনভাবে চাপল, যে সামিয়ার মলিন মুখ দেখে আলম অনুমান করতে পারছিল— তাদের সংসারে ভাতের কষ্ট আছে। এ জন্য তার মেয়ে সুমিকে বলেছিল, মাঝেমধ্যে সামিয়াকে নিয়ে একসঙ্গে খেও!

কিন্তু সামিয়ার আত্মসম্মান এতই প্রবল যে, অন্যের বাড়িতে খেয়ে কষ্ট লাঘব করতে রাজি হয়নি। একদিন সামিয়া আলমকে বলে, ‘আঙ্কেল, আমাকে একটা টাকা দেবেন?’

আলম হাসল, ‘মাত্র এক টাকা?’

‘হ্যাঁ। এক টাকা হলেই চলবে।’

সামিয়া কথা না বলে একটি টাকাই নিল। তখন এক টাকায় চারটি লজেন্স কেনা যেত। মেয়েটি সম্ভবত শুধু নিজের প্রয়োজনে চেয়েছিল। আলম নিজেকে বোঝাল— এত কষ্টেও মেয়েটি কত অমায়িক। সামিয়ার অধ্যবসায়, মেধা আর সততার মধ্য দিয়ে পরিবারে আশা ফিরল। প্রাইমারি বৃত্তি পরীক্ষায় সে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেল। আলম তাদের পরিবারের আনন্দের অশ্রু দেখল, ভাবল— এই ত্যাগ ও নিষ্ঠা না থাকলে কি এমন আনন্দের বন্যা বইয়ে দেওয়া সম্ভব হতো!

তিন
দুদিন পরে, সাপ্তাহিক ছুটির দিনে আলম ভোরে হাঁটতে বের হয়। সামিয়ার বাসার দরজায় টোকা দিয়ে বাবাকে ডেকে সঙ্গে নেয়। 

দুজন হাঁটতে থাকে। গল্প করতে করতে অল্প সময়ের ব্যবধানে ওরা নদের পাড়ে পৌঁছে। ব্রহ্মপুত্র নদের কিনারে একটা নির্জন গাছের তলায় কংক্রিটের বেঞ্চে দুজন পাশাপাশি বসে। আলম হঠাৎ তার মেয়ের প্রসঙ্গ টেনে বলে, ‘আপনার মেয়েটা তো বৃত্তি পরীক্ষায় অসাধারণ রেজাল্ট করল।’

‘জি, আপনাদের দোয়ায়।’

‘আপনার মেয়ের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য কী?’ জানতে চেয়েছিলাম। জবাবে বলল যে, ‘ডাক্তার হবে।’

‘ডাক্তার হবে কেন?’ জানতে চাইলে জবাবে সে বলল যে, ‘ডাক্তার হলে ভাতের অভাব হবে না। যদি কিছু মনে না করেন, তা হলে আপনার কাছে একটা প্রশ্ন...।’

‘বলুন কী প্রশ্ন?’

‘মেয়েটা কি কখনো খাবারে কষ্ট পেয়েছে?’

প্রশ্নটা শুনেই আবেগে বেসামাল হন সামিয়ার বাবা। আলমের দুটি হাত চেপে ধরে বলেন, ‘এমনিই বুকের মধ্যে দুর্বহ কষ্টের আগুন। তাতে আপনি বারুদ নিক্ষেপ করলেন ক্যান ভাই!’
বলেই ডুকরে কেঁদে ফেলেন তিনি। কেঁদে কেঁদে বলেন, ‘আমি তো অযোগ্য বাবা, ভাই! চাকরি থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত হয়ে দারুণ অভাবে দিন কাটছে আমার। কত কষ্ট করেছে নিষ্পাপ ছেলেমেয়ে দুটি। এ কেমন বাবা হলাম আমি বলেন, যে বাবা ছেলেমেয়েদের ঠিকমতো ভরণপোষণ করতে পারে না, তার কি বাবা দাবি করার যোগ্যতা থাকে!’ বলে আবার হৃদয়ছোঁয়া কান্নায় ভেঙে পড়ে। আলম প্রবোধ দিয়ে বলে, ‘আপনিই তো যোগ্য পিতা। একই ক্লাসে পড়ে তো আমার মেয়েও। কই সে তো পারেনি আপনার মেয়ের মতো রেজাল্ট করতে! সেসব কথা থাক। 

চলুন এখন ফিরে যাই।’

ওরা ওঠে। এর কয়েক দিন পরই সামিয়ার বাবা নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ায় বিভাগীয় মামলা থেকে সসম্মানে চাকরিতে পুনর্বহাল হন। এক বছরে তার বাবার একটি পদোন্নতিযোগে বদলি হন। ফলে তাদের এ বাসা ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল। পরে অবশ্য আলম তার মেয়ের কাছে শুনেছিল সামিয়া অষ্টম শ্রেণিতেও একইভাবে মেধার স্বাক্ষর রেখেছে। তারপর আর তাদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না। দীর্ঘদিন পরও স্মৃতির পাতায় সেই ‘ভাতের কষ্ট’ আর ত্যাগের দৃশ্য অমলিন হয়ে থাকল।

এফআর


  বিষয়:   গল্প  কষ্ট 


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: