ইউ আর মাই সানশাইন

মঈনুস সুলতান

লাওসে আসার আগে আমাদের প্রস্তুতির কোনো শেষ ছিল না। শ্রীমতি হলেন, হাতে করার মতো কোনো কাজ ছিল না বলে যার

2026-02-06T05:04:36+00:00
2026-02-06T05:04:36+00:00
 
  সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬,
৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
ইউ আর মাই সানশাইন
মঈনুস সুলতান
প্রকাশ: শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৫:০৪ এএম 
প্রতীকী ছবি
লাওসে আসার আগে আমাদের প্রস্তুতির কোনো শেষ ছিল না। শ্রীমতি হলেন, হাতে করার মতো কোনো কাজ ছিল না বলে যার সঙ্গে আমি সম্প্রতি বিবাহিত হয়েছি; সে লাওসের নাম শোনামাত্র বাজার থেকে কিনে নিয়ে আনল প্রমাণ সাইজের একখানা মানচিত্র। কিন্তু তাতে লাওসের রাজধানী ভিয়েনচান শহরটি সহজে দৃষ্ট হলো না বটে, তবে হলেনের উৎসাহ বিন্দুমাত্র কমল না। জোগাড় করা হলো আতশিকাচ। নির্ণয় করা হলো বিষুবরেখার অবস্থান। দুজনে মিলে পুরো এক বিকাল কাটিয়ে এলাম লাইব্রেরিতে। পাঠ করা হলো যুগলে, ঋতুচক্রের পরিবর্তন থেকে রাষ্ট্রনৈতিক বিধিবিধান পর্যন্ত। অবশেষে দুজনই একমত হলাম যে, পুঁজিপ্রধান মার্কিন দেশে তো একত্রে অনেক দিন বসবাস হলো, এবার যাওয়া যাক লাওসে; একেবারে হাতেনাতে দেখা যাক সমাজতন্ত্র বিষয়টি কি?

বছর কয়েক আগে আমি ও হলেন যখন কোলে শিশুকন্যা কাজরিকে নিয়ে লাওসের রাজধানী ভিয়েনচানে আসি, তখন উদ্বেগের কোনো কমতি ছিল না। অপরিচিত পরিবেশ মোকাবিলা করার ভীতি ছিল প্রবল। কিন্তু যখন এসেই পড়লাম, নগরটি মনে হলো বড় আপন, যেন কত দিনের চেনা। আমরা যে কাঠের বাংলো বাড়িটিতে সাময়িকভাবে থানা গাড়লাম, তার পেছন দিকে ধানের চৌখুপি ক্ষেত। কৃষকরা টোকা মাথায় মহিষ দিয়ে জমি চষছেন। শহরে ভিড়বাট্টা তেমন নেই। সর্বত্র কেমন যেন মফস্বলী আমেজ। সড়ক ধরে মৃদুতালে টেম্পুগুলো হামেশা যাতায়াত করছে, যা এখানে টুকটুক বলে পরিচিত। 

সমগ্র ভিয়েনচানে দুটি মাত্র বৃহৎ বাজার, যা পর্যটকদের কাছে ‘তালাত ছাও ও তালাত লেঙ’ বা মর্নিং ও ইভিনিং মার্কেট বলে খ্যাত। এখানে সদ্য আসা বিদেশিদের প্রথমেই যা নজর কাড়ে তা হচ্ছে, সর্বত্র ছড়ানো-ছিটানো অসংখ্য বাসন্তী বর্ণের মন্দির। রাজপথ থেকেই দৃষ্ট হয় মন্দিরগুলোর কারুকার্যময় স্বর্ণালি শীর্ষ। 

যখন-তখন দেখা যায় সারি বেঁধে চলছে হরেক বয়সের মুণ্ডিত মস্তক বৌদ্ধ শ্রমণবৃন্দ।

ভিয়েনচান শহরের ঘরবাড়িগুলো যেন দুটি ভিন্ন রূপরেখায় নির্মিত হয়েছে। লাওরা বাস করছে কাঠের পাটাতন দেওয়া নিচে খুঁটি যুক্ত চাঙ-বাংলা ধাঁচের সনাতনী কায়দার গৃহগুলোতে। পাটাতনের নিচে খানিকটে খোলামেলা ভিটে। প্রায় প্রতিটি ভিটেতেই একটি করে তাঁত অথবা এককোণে ঝুলছে দোলনার মতো দড়ির হ্যামক। অন্যধারার গৃহগুলো মূলত ফরাসি ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের জের। বিপুল ফ্রেঞ্চ উইন্ডোঅলা ভবনগুলোর বেশিরভাগই জরাজীর্ণ। তবে কোনো কোনো ফ্রেঞ্চ ভিলা সদ্য মেরামতি করে পর্যটক পছন্দ রেস্তোরাঁ অথবা সরকারি দফতর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। 

আমাদের অফিস যাওয়ার পথেই পড়ে মস্ত এক ফরাসি ম্যানসন, যা বর্তমানে রূপান্তরিত হয়েছে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মিউজিয়ামে। ফোয়ারা খাঁচা বিস্তৃত আঙিনায় প্রতিদিন দেখি রক্তিম পতাকা এক উড়ছে পত পত করে; সঙ্গে সঙ্গে উড়ছে কাস্তে-হাতুড়ির নকশাটি।

আমি কাজরি ও হলেন যে বাংলোটিতে থাকছি তা খানিকটা ফরাসি, খানিকটা লাও ধাঁচের। পাটাতন, রেলিং ও দেয়াল ইত্যাদি মজবুত ঠিক কাঠে নির্মিত। দরজা, জানালাগুলো লালচে মেহগনির। পাটাতনের নিচে খোলামেলা টাইলস বসানো বৃহৎ ভিটে। এককোণে একটি দোলনা ছাড়াও এখানে আছে একটি ইঞ্জিনবিহীন নৌকা। সামনের খোলা ব্যালকনি থেকে দেখা যায় মেকং নদীর বিস্তীর্ণ বালুময় জলমগ্ন বাঁক। আঙিনাটি পরিচ্ছন্ন ছিমছাম, তবে মধ্যখানে চিনামাটির বৃহৎ গোলাকার সব পাত্রে ফুটে থাকে থোকা থোকা রাঙা শাপলা। নদীর পাড়টি সিমেন্টের দেয়াল দিয়ে বাঁধানো। 

দেয়ালের গায়ে লাগোয়া কাঠের অপরিসর সাঁকো। সাঁকোটি যুক্ত স্রোতবহুল জলের ওপর খুঁটি দিয়ে দাঁড় করানো ডেকে; তাতে পাতা খান দুই বেতের চেয়ার ও একটি শিশুতোষ রকার।

ভিয়েনচানে এখনও আমাদের সামাজিকতার গণ্ডি নিবিড় হয়ে আসেনি, স্থানীয় লোকজনদের আচার-আচরণকে মনে হয় বেজায় রকমের দুরূহ, যাওয়ারও নেই বিশেষ কোনো স্থান। তাই হলেন ও আমি শিশুকন্যাকে নিয়ে বেশিরভাগ সময় এ হাওয়া ধু ধু ডেকে কাটাই। আমরা জল দেখি, দেখি স্রোতের চলাফেরা, কখনো-সখনো দাঁড় বেয়ে দূরে চলে যায় দুটি জেলে নৌকা। ওপারে শ্যামদেশ তথা থাইল্যান্ড; সন্ধ্যাবেলা ওখানকার বাণিজ্যিক নিয়নগুলো বেজায় রকমের নীলাভ হয়ে জ্বলে। 

চাঁদনি রাতে ডেকে বসে হলেনের অপরিচিত ফুল হাসনাহেনার তীব্র গন্ধে আমরা যুগলে চমকে উঠি। ভিয়েনচানে আছি মাত্র মাসদুয়েক। কথাবার্তা তেমন কারও সঙ্গে বলে উঠতে পারি না। আশপাশে লোকজন কেউ বড় একটা ইংরেজি জানে না। আমাদেরও দ্রুত লাও ভাষা শেখা হয়ে ওঠে না। তবে সন্ধ্যারাতে চেনা ফুলের গন্ধে দেশটিকে আর পর মনে হয় না।

মার্কিন দেশের সর্বত্র তো পুঁজিবাদের মস্ত রকমের চর্চা। ওখানে আমাদের রান্নাবান্না কাপড়কাচা সবই করতে হতো নিজ হাতে। লাওসে সমাজতন্ত্র বটে, তবে এখানে গৃহ কাজের লোকজনের অভাব বিশেষ নেই। আমাদের দফতরের হাউসকিপিংয়ের দায়িত্বে আছেন যে স্থূলকায়া চঞ্চল গোছের মহিলা, তিনি দুটি ‘লাওলুম’ গোত্রের তরুণী নিয়োগ করেছেন বিদেশ থেকে আগত আড়াই প্রাণীর পরিবারটিকে দেখভালের জন্য। 

তরুণী দুটির মধ্যে রান্না-সহায়িকাটি সুশ্রীতর, প্রতিদিন নতুন রকমের বিছেহার পরে কাজে আসে। শিশু-সহায়িকাটি অতটা সুদর্শনা না হলেও তার কানে খোঁপায় ফুল গোঁজার কিন্তু বিরাম নেই। এদের নিয়োগের শুরুতেই হাউসকিপার মহিলা আমাদের সাফ সাফ জানান যে, পরিচারিকাদের যেন ‘কাজের মেয়ে’ অথবা ‘চাকরানী’ সম্বোধন করা না হয়। এতে নাকি সমাজতান্ত্রিক আইনে ফাটক-বাসের সমূহ সম্ভাবনা। 

বিনীতভাবে জানতে চাই, কীভাবে নারী দুটিকে সম্বোধন করা এখানে আইনত জায়েজ? হাউসকিপারের জবাবে জানা যায় যে, ‘মেবান’ অর্থাৎ ‘গৃহজননী’ শব্দটি সম্বোধনের জন্য রাজনৈতিকভাবে সিদ্ধ। তবে ক্ষেত্রবিশেষে তাদের ‘নঙ’ অথবা ‘ছোটবোন’ও বলা যেতে পারে, তাতে হাজত-বাসের কোনো আশঙ্কা থাকবে না।

প্রতিদিন বিকালবেলা শিশু-সহায়িকা ছোটবোনটি আমাদের নিয়ে পাড়া বেড়াতে যায়। ভিয়েনচান শহরে পার্ক-টার্ক বিশেষ নেই। তাই ছোট্ট একটি কন্যাকে নিয়ে যাওয়ার মতো জায়গার বিশেষ অভাব। তাই প্রায়শ আমরা আসি কোনো না কোনো মন্দির দেখতে। মন্দিরগুলোর সংখ্যার যেন শেষ নেই, তেমনি কোনো বিরাম নেই পূজারির। বিগ্রহদের আকার-আকৃতিও বিচিত্র। বেদির বর্ণের স্বর্ণাভায়, অর্ঘ্যরে পুষ্পের সৌরভে এবং আরতির ধূপধুনায় সারাক্ষণ মন্দিরগুলো মশগুল হয়ে আছে। বাংলোতে ফেরার পথে প্রায়ই দেখি, সোভিয়েত স্থাপত্যের আদলে গড়া একটি রংচটা বৃহৎ অট্টালিকা। প্রশস্ত আঙিনার এক পাশে ছোট্ট পুকুর, দুটি হাঁস। পাড়ে খান কতক ইস্পাতের বেঞ্চ, দোলনা এবং একটি ঢাউস খাঁচায় ময়না, টিয়া ও অনেক মুনিয়া। লাও ভাষায় লেখা সাইনবোর্ডটির দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়েও বুঝতে পারি না, ভবনটি কীসের? 

অবশেষে একদিন পুকুরপাড়ে গিয়ে বসি। আমাদের আশপাশে বেশ কয়েকটি বালক-বালিকা। ওরা যে সবাই ‘লাপতা’ বা দৃষ্টিহীন তা বুঝতে আমাদের বেশিক্ষণ লাগে না। চোখে না দেখলেও ওরা আমাদের কাছাকাছি আসে, কথা বলে। আমাদের ইংরেজিতে জবাব শুনে খিল খিল করে হাসে। ওরা বিনা দ্বিধায় বুঝি গন্ধ শুঁকে শুঁকে এসে কাজরিকে স্পর্শ করে। অবশেষে একটি অন্ধ বালিকা তাকে কোলে তুলে নেয়। 

আমাদের শিশু-সহায়িকা ছোটবোনটি তাদের জানায় যে, আমরা বিদেশি, শুধু ‘পাছা আংগিত’ বা ইংরেজি ভাষা বুঝতে সক্ষম। একটি বালক অন্ধ ছুটে গিয়ে নিয়ে আসে একতারার মতো দেখতে একটি বাদ্যযন্ত্র। ছেলেটি আমাদের পাশাপাশি একই বেঞ্চে বসে, তারপর আমাদের দিকে সরাসরি চোখ মেলে দৃষ্টিহীন নজরে তাকিয়ে সহসা গাইতে শুরু করে, ‘ইউ আর মাই সানশাইন, মাই অনলি সানশাইন।’ আমি হলেনকে চোখ মুছতে দেখি।

এ নিয়ে বছর কয়েক হলো আমরা ভিয়েনচানে আছি। এখানকার সাঁঝবেলা প্রায়শ সন্ধ্যামালতির ঝোপে মৌটুসি পাখির গুঞ্জন শোনা যায়। চিনামাটির গোলাকার পাত্রে রাঙা শাপলাটি ফোটে হররোজ। রাতের বেলা তক্ষকের যখন তখন ডাকে আমরা আর চমকে উঠি না তেমন। 

আমাদের শিশুকন্যাটি আর নির্বাক পুতুলটি নয়। আজকাল সে কথা বলে, মূলত ইংরেজিতে তবে লাও শব্দের মিশেল দিয়ে। আমরা এখনও একটুখানি সময় পেলে অন্ধ ইশকুলের আঙিনায় গিয়ে বসি। কাজরি জিগ্যেস করতে ভুলে না, ‘হোয়াই সাম চিলড্রেন ডোন্ট সি? হোয়াই আর দে লাপতা বাবা?’ আমরা আজও এ প্রশ্নের জুতসই কোনো জবাব খুঁজে পাই না।

ভিয়েনচান শহরটিও আমাদের কন্যাটির আকার-আকৃতি ও বোলচালের পরিবর্তনের মতো দ্রুত বিবর্তিত হচ্ছে। এ আর কেবল ছোট্ট সমাজতান্ত্রিক দেশের রাজধানীই নয়; এখানে পরগাছা উদ্ভিদের মতো টগবগ করে বিকশিত হচ্ছে বাজার অর্থনীতি। মার্কিন বিশেষজ্ঞরা আসছে পার্বত্য অঞ্চলে দস্তা ও স্বর্ণের সন্ধানে। কুয়ালালামপুরের বণিকরা খোঁজ পেয়েছে কাঠের। বিশ্বব্যাংক নাকি পর্বত, প্রান্তর ও প্লাটো এবং ‘সনপাও’ বলে পরিচিত উপজাতীয়দের ঘরদোর ভাসিয়ে নির্মাণ করবে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। এ ডামাডোলে ভিয়েনচানের সড়কগুলো সয়লাব হতে চলল আমদানিকৃত নিত্যনতুন যানবাহনে। সঙ্গে সঙ্গে ট্রাফিক দুর্ঘটনাও বেড়েছে বিস্তর। 

যে শেডট্রি ছাওয়া ডাইক রোডে আমরা বিকালবেলা হাঁটতে যেতাম, তাকে রাতারাতি বৃক্ষহীন করে দেওয়া হয়েছে হাইওয়ের নকল আকৃতি। একখানি আমঝোপকে পয়ঃপরিষ্কার করে তৈরি করা হয়েছে নৈশ ক্লাব।

ক্লাবের চত্বরে গোলতানি করা যুবতীদের দিকে তাকালে, আজকাল তাদের সৌন্দর্য়ের চেয়ে বেশি করে নজরে পড়ে অনাবৃতিটুকু। সরকারি দফতরগুলোতে কাস্তে-হাতুড়ির রক্তিমতা কায়ক্লেশে টিকে আছে বটে; তবে শোনা যাচ্ছে বাজার অর্থনীতিতে কামিয়াবির মুখ দেখতে হলে অন্ধ ইশকুলের মতো অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোর অচিরেই তামাদি করতে হবে। 


এফআর


  বিষয়:   প্রবন্ধ  মঈনুস সুলতান 


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: