‘রম্যরচনা’র আভিধানিক অর্থ— যে রচনা রমণীয় বা সুন্দর। এই অর্থে রম্যরচনার এই সংজ্ঞা অতি ব্যাপক। কারণ সাহিত্যের ধর্মই এই যে তা রমণীয় ও সুন্দর হয়, এককথায় রসোত্তীর্ণ। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ— সব শ্রেষ্ঠ রচনাকেই রম্যরচনা অভিধায় ভূষিত করা যেতে পারে। রম্যরচনা কথাটির এই ব্যাপক অর্থ স্বীকার করেও, বিশেষ অর্থে রম্যরচনা বলতে আমরা এক বিশেষ রচনারীতিকেই বুঝে থাকি। বলা যেতে পারে, যে রচনায় জীবনের লঘু-চপল বিকাশগুলোকে নিয়ে উচ্চতর সারস্বত কর্মে নিয়োজিত করা হয়, সেই রচনাই রম্য।
শফিক হাসান রম্যগল্প ও রম্যরচনা লিখছেন দীর্ঘদিন ধরে। সবশেষ প্রকাশিত রম্যগ্রন্থ ‘ইট ছুড়লে পাটকেল ফ্রি’। বইটিতে ২০টি রম্যগল্প স্থান পেয়েছে। তার লেখা গল্পগুলো হাস্যরসাত্মক, তবে আরও রসসিক্ত হলে ভালো হতো। রম্যগল্পগুলোর মধ্যে যেগুলো সবচেয়ে ভালো লেগেছে সেগুলোর ওপর আলোচনা করব। ২০টি গল্পের মধ্যে ‘বেফাঁস মন্তব্য স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর’, ‘পারিবারিক সিনেমা’, ‘বাণী নিরন্তর’, ‘দশে ১০ নাকি অশ্বডিম্ব’, ‘ইট ছুড়লে পাটকেল ফ্রি’ ভালো রচনার উদাহরণ।
বর্তমানে মানুষ হাসতে ও হাসাতে ভুলে গেছে। সমাজ, পরিবারের মানুষ ও বাইরের মানুষের ধুরন্ধর ক্রিয়াকলাপের কারণে। শফিক হাসান এই রম্যগল্পগ্রন্থে আমাদের চারপাশের মানুষের ক্রিয়াকলাপকে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ, হাসি-ঠাট্টা, রাগ-দ্বেষ, দ্রোহের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। ‘পারিবারিক সিনেমা’ রম্যগল্পটির বিষয় সত্যিই সিনেমার গল্পের মতোই, পারিবারিক অনুষঙ্গে আবর্তিত। ‘বেফাঁস মন্তব্য স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর’ বইয়ের প্রথম গল্প। এই গল্পের মূল কথা— বেফাঁস মন্তব্য কখনোই সুখকর হতে পারে না। তা সবসময়ই স্বাস্থ্য তথা সবকিছুর জন্য ক্ষতিকর হয়ে থাকে।
আর একটি রম্যগল্প ‘ফুটবল যুদ্ধ’। আমাদের দেশের নারী-পুরুষরা খেলাধুলাকে ভালোবাসে মনপ্রাণ দিয়ে। নিজেরা খেলা করতে না পারলেও খেলাধুলার পাঁড় সমর্থক। একই পরিবারে স্বামী-স্ত্রী ফুটবলযুদ্ধে দুই দলের সমর্থক। স্ত্রী রেবা আর্জেন্টিনার সমর্থক, অন্যদিকে স্বামী রিমন ব্রাজিলের। দুজনই ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের মাধ্যমে নিজের নিজের দলের পক্ষে বাকযুদ্ধ শুরু করে, যা রম্য অনুষঙ্গে রম্য লেখক শফিক হাসান উপস্থাপন করেছেন।
‘শীত নিবারণে বাজার গমন’ রম্যগল্পটি ছোট হলেও সুন্দর। শীতে শরীর ঠান্ডা, কিন্তু বাজার গরম। তাই গল্পটি পড়ে সত্যিই হাসি পায়। ‘ইট ছুড়লে পাটকেল ফ্রি’ রম্যগল্পটির কথা বলতে হয়। সত্যিই রসসিক্ত। ‘ইট ছুড়লে পাটকেল ফ্রি’ বইয়ের মান বৃদ্ধি করেছে। বইটির নামকরণও যথার্থ হয়েছে। কবি, প্রকাশক, বই ক্রেতাদের নিয়ে রম্যকথা এগিয়েছে সুন্দরভাবে। গল্পটিতে তাদের মাঝের নানা বিড়ম্বনার চিত্র ফুটে উঠেছে।
পবন পুরোহিত একজন কবি। অটোগ্রাফ দিয়ে কবিতার বই বিক্রি করেন। অটোগ্রাফ দেওয়া তার হবি! উঠতি কবি, উঠতি প্রকাশক, অটোগ্রাফলোভী পাঠকের কথাবার্তা গল্পটিকে রসসিক্ত করেছে। এই বইয়ের অন্য গল্পগুলোর মধ্যে ‘সম্পাদক ভজানোর বটিকা’, ‘বাম হাতের খেল’, ‘কবি মামার পাত্রী দর্শন’ ইত্যাদি হাস্যরসে টইটম্বুর। শফিক হাসানের লেখা অনুপম রম্যবইটি ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা লাভ করুক।
ইট ছুড়লে পাটকেল ফ্রি, শফিক হাসান, প্রকাশক : পুণ্ড্র প্রকাশন, প্রচ্ছদ ও অলংকরণ : আহসান হাবীব, মূল্য : ২৮০ টাকা।
এফআর