হাজার বছর ধরে সংগ্রাম

রাকিবুল রকি

‘মন্তু বলে, বুড়া যদি জানে তোমারে আমারে মাইরা ফালাইব।টুনি বলে, ইস, বুড়ার নাক কাইটা দিমু না।’(হাজার বছর ধরে)নির্মলা ম্যাডাম এমনভাবে

2026-01-30T04:11:31+00:00
2026-01-30T04:11:31+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬,
৫ ভাদ্র ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬
হাজার বছর ধরে সংগ্রাম
জহির রায়হান
রাকিবুল রকি
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬, ৪:১১ এএম 
প্রতীকী ছবি
‘মন্তু বলে, বুড়া যদি জানে তোমারে আমারে মাইরা ফালাইব।
টুনি বলে, ইস, বুড়ার নাক কাইটা দিমু না।’
(হাজার বছর ধরে)

নির্মলা ম্যাডাম এমনভাবে পাঠ করে শোনায়, আমরা ক্লাসসুদ্ধ হেসে উঠি। তার বলার ভঙ্গি, নাক-চোখ-মুখ কুঁচকানোর মধ্যে যেন টুনিকেই দেখতে পাই।

সেই প্রথম জহির রায়হানের লেখার সঙ্গে পরিচয়। আমরা তখন নবম শ্রেণি। বয়ঃসন্ধির আলো-আঁধারির সীমানা পেরোচ্ছি। চোরা কাঁটায় জামা ফেঁসে যাচ্ছে, কখনো হাত-পা ছিঁড়ে যাচ্ছে। বাংলা সহপাঠের নির্ধারিত উপন্যাস হিসেবে ‘হাজার বছর ধরে’ আমাদের পাঠ্য। জহির রায়হানের হাজার বছর ধরে। 

যদিও টিভিতে তার ‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমা এর আগে বহুবার দেখেছি। প্রতি বছরই এ সিনেমা একুশে ফেব্রুয়ারিতে দেখানো হতো। কিন্তু তখনও জীবন থেকে নেয়া সিনেমার রস উপলব্ধি করার কিংবা পরিচালকের মহিমা বোঝার ক্ষমতা হয়নি। তাই নবম শ্রেণির বাংলা ক্লাসেই জহির রায়হানের সঙ্গে আমাদের পরিচয়ের পত্তন ঘটে। 

জহির রায়হানের আরেকটি রচনা আমাদের পাঠ্য ছিল। ছোটগল্প। ‘সময়ের প্রয়োজনে’। একই ক্লাসে। জহির রায়হানের সাহিত্য আমাদের ‘বড়’ করে তুলেছিল। সেই বড়টা প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে নয়, প্রাপ্তমনস্ক হিসেবে। কীভাবে তা পরে বলছি।

জহির রায়হান (১৯ আগস্ট ১৯৩৫—৩০ জানুয়ারি ১৯৭২) বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার, ঔপন্যাসিক এবং ছোটগল্পকার। ১৯৫৫ সালে ‘সূর্যগ্রহণ’ গল্পগ্রন্থের মাধ্যমে তিনি গ্রন্থকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। সূর্যগ্রহণ বইয়ের বাইরেও তার বেশ কয়েকটি ছোটগল্প রয়েছে, বর্তমানে ‘গল্পসমগ্র’ শিরোনামে তার সব ছোটগল্প এক মলাটের মধ্যেই পাওয়া যায়। 

জহির রায়হানের প্রথম উপন্যাস ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’ ১৯৬০ সালে প্রকাশিত হয়। মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপড়েনই এ উপন্যাসের উপজীব্য। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এক অদ্ভুত বিষাদের সুরে গাঁথা। ১৯৬২ এবং ১৯৬৪ সালে যথাক্রমে প্রকাশিত হয় ‘তৃষ্ণা’ ও ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাস। ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত প্রথম সার্থক উপন্যাস ‘আরেক ফাল্গুন’ প্রকাশিত হয় ১৯৬৯ সালে। 

এ ছাড়া তার অন্যান্য উপন্যাস হলো— ‘বরফ গলা নদী’, ‘কয়েকটি মৃত্যু’, ‘আর কতদিন’ ও ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’। তবে আর কতদিন এবং একুশে ফেব্রুয়ারিকে উপন্যাস বলার চেয়ে চিত্রনাট্যের রূপরেখা বা ছবির কাহিনি বলা যেতে পারে। একুশে ফেব্রুয়ারি বইয়ের ভূমিকায় শাহরিয়ার কবির এমনটাই মত দিয়েছেন।

ফিরে আসি হাজার বছর ধরে উপন্যাসের কথায়। টুনি এবং মন্তুর অবৈধ প্রণয় মন কেড়েছিল। অবশ্য তখন এটিকে অবৈধ প্রণয়ের চেয়ে একজন সমবয়সি খেলার সাথীর প্রতি ভালোবাসাই বেশি মনে হয়েছিল। এই দুটো চরিত্র তৈরির সময় জহির রায়হানের মনে কি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে কাদম্বরী দেবীর সম্পর্কের কথা মনে ছিল? নাকি বৈষ্ণব কবিরা যে পরকীয়া রসে কথা উল্লেখ করেছেন, সেই তত্ত্ব তার মনে ক্রিয়াশীল ছিল? নাকি নিছক সমবয়সি দুজন খেলার সঙ্গীকেই তিনি আঁকতে চেয়েছিলেন, যাদের মধ্যে গড়ে উঠেছিল ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, নির্ভরতা। 

মন্তু আর টুনির প্রেমকে তখন প্লেটোনিক ভালোবাসাই মনে হয়েছিল। আজও হয়। নইলে বুড়ো মকবুল মারা যাওয়ার পর টুনিকে বাপের বাড়ি ফিরিয়ে দিয়ে আসার সময় মন্তু মিয়া যখন বিয়ের কথা তোলে, তখন টুনি রাজি হলো না কেন? কিংবা বুড়ো মকবুল যখন মরণশয্যায়, তখন মকবুলকে যারা প্রাণপণে সেবা করেছিল, টুনি ছিল তাদের একজন। অর্থাৎ স্বামীর মরণাপন্ন অবস্থায় টুনি যথার্থ নারী হয়ে উঠেছিল। তার আগে একজন উচ্ছল কিশোরীই ছিল, যার খেলার সঙ্গী ছিল মন্তু। যার ভাগ সে কাউকে দিতে চায়নি। কিন্তু যখন সে নারীতে রূপান্তরিত হয়, তখন সে আর খেলার সঙ্গীকে জীবনসঙ্গীতে রূপান্তরিত করতে চায়নি সুযোগ পেয়েও। অর্থাৎ আবহমানকাল ধরে বা হাজার বছর ধরে নারীদের মধ্যে যে নৈতিকতা প্রচলিত ছিল, টুনিও নিজেকে সেই নৈতিকতা, প্রথা, বিশ্বাসেই সমর্পণ করেছে। এখানে টুনি চরিত্রটাও হাজার বছর ধরে গ্রামবাংলা অকালে বিধবা হওয়া নারীদের প্রতীক। 

সেই ‘পথের পাঁচালী’র ইন্দিঠাকুরণের মতো টুনিও নিজের জন্য বৈধব্যব্রতকেই আজীবনের সঙ্গী করে নিল। যদিও এসব তত্ত্বকথা, ভাবনা চিন্তা তখন আমাদের মাথায় আসেনি। মনে খেলা করেনি। তবে? তবে জহির রায়হানের লেখা কীভাবে আমাদের বড় করল? প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। এককথায় সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব। 

তবে হাজার বছর ধরে উপন্যাস কীভাবে আমাদের একাত্ম করে নিল সেই কথাটা আরেকটু বলতে চাই। এই উপন্যাসের গ্রাম যেন আমাদের চেনা পরিচিত কোনো গ্রাম। মানুষগুলোও ছিল আমাদের ভীষণ চেনা। আমাদের জীবনের মিথ, লৌকিক কাহিনিগুলোও এই পন্যাসের পরতে পরতে মিশে আছে। 

যেমন পরীর দীঘির নামকরণের যে গল্প, তেমন গল্প আমাদের জীবনে তখন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিল। পরীর দীঘি কীভাবে হলো, সে কথাটাই একটু বলি। সংক্ষেপে। এক পূর্ণিমার রাতে আকাশ থেকে দলে দলে পরী নেমে এসেছিল। তারা জ্যোৎস্নায় খেলাধুলা করল। হঠাৎ তাদের মনে হলো গোসল করার কথা। কোথায় স্নান করবে? আকাশ থেকে দীঘি খননের সব যন্ত্রপাতি নেমে এলো। এক রাতের মধ্যে খোঁড়া হলো দীর্ঘ দীঘি। পরীরা মন ভরে সেখানে স্নান করল, পানি দিয়ে খেলা করল। তারপর রাত যখন শেষ হলো, পরীরা আবার ফিরে গেল আকাশে। স্মৃতিস্বরূপ পড়ে রইল দীঘি। পরীর দীঘি। এই পরীর দীঘির পারের মানুষগুলো, যারা হাজার বছর ধরে টিকে আছে, অবহেলিত— তারা আমাদের পরিচিত। 

আমরা প্রায় শুনতাম, অমুককে পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ পরী তাকে তুলে নিয়ে গেছে। কবিরাজ ধ্যানে বসে দেখতে পেত, সেই হারিয়ে যাওয়া বালক বা বালিকা পরীর সঙ্গে আকাশে উড়ছে। জিন-পরী আমাদের কাছে কোনো অলীক বস্তু ছিল। ছিল পাশের বাড়ির মানুষের মতোই সত্য। যদিও আমরা কখনো তাদের দেখতে পাইনি, কিন্তু তাদের অস্তিত্বে বিশ্বাসী। ফলে এই উপন্যাস আমাদের উপন্যাস হয়ে উঠেছে। 

উপন্যাসের শুরুতে মন্তু মিয়াকে মনে হয়েছিল আমাদের বয়সি কেউ। যার কেউ নেই বলতে গেলে। বিশাল বাড়ির এক কোণে তার ঘর। বলা যায়, বাড়ির শিকড় ছাড়া এক মানুষ সে। উপন্যাসের শেষে এসে দেখি, উপন্যাসজুড়ে দাপট ছিল, বুড়ো মকবুল, রশীদ, আবুল, সুরত আলী কেউ নেই। বাড়ির এক কোণের ঘরে থাকা মন্তুই এখন বাড়ির প্রধান। পুথির আসরে মন্তু এগিয়ে গেলে সবাই সরে তাকে মাঝখানে বসার জায়গা করে দেয়। মন্তুর এই রূপান্তর আমাদের মনের রূপান্তর ঘটিয়ে দেয়। 

এক বছরেই আমরা অনেক বছরের বড় হয়ে উঠি। আমরা বড় হয়ে উঠি, যখন তার ‘সময়ের প্রয়োজনে’ গল্পটি পড়ি। 

যেখানে জনৈক সাংবাদিক যুদ্ধের খবর সংগ্রহ করতে গেলে কমান্ডার তাকে একজন হারিয়ে যাওয়া মুক্তিযোদ্ধার ডায়েরি পড়তে দেন। সেই ডায়েরি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে এগিয়েছে গল্পের কাহিনি। ডায়েরি এক জায়গা লেখা আছে, অপারেশনে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনীর লোকদের হত্যার হিসাব রাখার জন্য দেয়ালে দাগ কেটে রাখত। দিনে দিনে সেই দাগ বেড়ে উঠছে। আরও একটি দাগ বাড়ছে। তবে সেটি দেয়ালে নয়, মনে। সেসব মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধে গিয়ে আর ফিরে আসে না, সেসব হারিয়ে যাওয়া মুক্তিযোদ্ধার হিসাব রাখা হয় মনের ভেতর দাগ কেটে। 

গল্প পড়তে পড়তে এক পর্যায়ে আমরাও খেয়াল করি, দেশমাতৃকার জন্য জীবনদানকারী যোদ্ধাদের হিসাব আমরাও মনের জমিনে দাগ কেটে রাখতে শুরু করেছি। গল্পের শেষে যখন জানতে পারি, ডায়েরি লেখক অপারেশনে গিয়ে ধরা পড়েছে, ফিরে আসেনি, তখন তার জন্য আমাদের শ্বাস ঘন হয়ে ওঠে। বুকের ভেতর স্থায়ী দাগ পড়ে। এভাবেই জহির রায়হান আমাদের বড় করে তুলেছেন। 

গল্পে যুদ্ধের সঙ্গে প্রকৃতির এমন নিবিড় বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, যার ফলে এরপর লাউয়ের মাচায় কয়েকটি লাউ ঝুলতে দেখলেই গল্পের কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে মুক্তিযুদ্ধের কথা, মুক্তিযোদ্ধাদের কথা। ভুলতেই পারি না তাদের জীবন দেওয়ার কথা। জহির রায়হান এভাবেই আমাদের চেতনার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধকে গেঁথে দিয়েছেন। কোনো চেতনার আখ্যান গাইতে হয়নি তাকে। লেখার মাধ্যমেই আমাদের মনে স্থায়ীভাবে সেঁটে দিয়েছেন একুশের চেতনার পোস্টার।

জহির রায়হানের গল্প, উপন্যাস কিংবা সিনেমা শুধু বিষয়বস্তুর কারণেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ আঙ্গিক-প্রকৌশলের কারণেও। তিনি সাদামাটা গল্প জমিয়ে বয়ান করতে পারতেন। সেই সঙ্গে ছিল তার চমৎকার এক গদ্যভাষা।ছোট ছোট বাক্যে তিনি অসাধারণ ছবি ফুটিয়ে তুলতে পারতেন। ফলে তার লেখা পাঠ করাটাও ছিল আনন্দের। 

জহির রায়হান ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি ঘাতকের হাতে প্রাণ না দিলে তার চলচ্চিত্র ‘স্টপ জেনেসাইড’-এর রিল সমূলে লোপাট করে না দিলে বাংলাদেশের ইতিহাস আরেকটু অন্যভাবে লেখা হতো কি না সেটি প্রশ্নসাপেক্ষ হলেও স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে জনপ্রিয় সাহিত্যের যে গদ্যশৈলী, তার পূর্বসূরি জহির রায়হান— গবেষকরা নিশ্চয় এক দিন তা প্রমাণ করবেন।

এফআর


  বিষয়:   জহির রায়হান  হাজার বছর ধরে  সংগ্রাম 


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: