সেন্ট জ্যাকবস মার্কেটে একদিন

তাহমিনা কোরাইশী

পিয়াসি মন খোঁজে বেঁচে থাকার খোরাক। পেটের চাহিদার মতো মনের চাহিদায় বুঁদ হয়ে থাকি। সব রহস্যের উদঘাটনে যেমন মানুষ তেমনি

2026-01-02T05:25:19+00:00
2026-01-02T05:25:19+00:00
 
  শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬,
১৯ আষাঢ় ১৪৩৩
শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬
সেন্ট জ্যাকবস মার্কেটে একদিন
তাহমিনা কোরাইশী
প্রকাশ: শুক্রবার, ২ জানুয়ারি, ২০২৬, ৫:২৫ এএম 
কানাডার সেন্ট জ্যাকবস মার্কেট। ছবি : সংগৃহীত
পিয়াসি মন খোঁজে বেঁচে থাকার খোরাক। পেটের চাহিদার মতো মনের চাহিদায় বুঁদ হয়ে থাকি। সব রহস্যের উদঘাটনে যেমন মানুষ তেমনি তাবদ বিষয়েই প্রতিটি কর্মে সে-ই। জানা-বোঝার আবিষ্কারের সব দায় এবং আনন্দ তারই। তীব্র উৎসাহ-উদ্দীপনায় থাকি আমরাই। সুযোগ পেলেই তার সদ্ব্যবহার করি। প্রায়ই কোথায় না কোথাও সফরে যেতে হয় আটপৌরে বেড়ানোই বলা যায়। তেমনি এক অসাধারণ একটি সময়কে ধারণ করতে পেরেছিলাম। তার ভেতরে এখন আবার ঘুরে আসি।

টরন্টো শহরের মিসিসাওগা থেকে প্রায় দুই-আড়াই ঘণ্টার দূরত্ব। সেখানে আমার ছোট ছেলের বাড়ি, ছোট বোনদের বাড়ি। ওইসব দেশে দূরত্ব আমাদের দেশের সঙ্গে মেলানো যাবে না। আমাদের যানজটের শহরে আধা ঘণ্টার রাস্তা পেরোতে হয় প্রায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টায়। 

বাইরের দেশে গাড়ির স্পিড ১শর ওপরে থাকে তেমন প্রশস্ত রাস্তা। ৭০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়া যায় অল্প সময়ে। সময় বাঁচে কী পরিমাণ! আমাদের দেশের কথা মনে হলেই কষ্ট হয়। পদে পদে মনে হয় কেন এতটা পিছিয়ে আমরা? কিন্তু এখন এ দেশের পিছিয়ে থাকার গল্পটি বলি। এমন যান্ত্রিকতা সেই সমাজের একশ্রেণির মানুষের পছন্দ নয়। তারা চলতে চায় আগের যুগের ধ্যান-ধারণায়। নিবিড়-নীরবতায় প্রকৃতির সান্নিধ্যে প্রকৃতির সন্তান হয়ে।

টরন্টো থেকে মাত্র অল্প দূরে, ওয়াটারলু অঞ্চলের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত, সেন্ট জ্যাকবস মার্কেট ডিস্ট্রিক্ট হল মেনোনাইট ঐতিহ্যে পরিপূর্ণ একটি প্রাণবন্ত স্থান। যেখানে সম্প্রদায় এবং কারুশিল্পের গভীরে প্রোথিত সংস্কৃতি বিকশিত হচ্ছে।

মার্কেট ডিস্ট্রিক্টের প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে আইকনিক সেন্ট জ্যাকবস ফার্মার্স মার্কেট- কানাডার সর্ববৃহৎ বছরব্যাপী বাজার। তিনটি বড় ভবন এবং একটি সুন্দর বহিরাঙ্গন বাজার। এটি শত শত স্থানীয় বিক্রেতাদের আবাসস্থল যারা খামারের তাজা পণ্য, শিল্পজাত খাবার, হস্তশিল্পের পণ্য এবং অনন্য হাতে তৈরি জিনিস সরবরাহ করে। সেখানে ঘুরে বেড়াতে যেমন স্বাচ্ছন্দ্য, তেমনি কেনাকাটায় বেশ আনন্দের। হোলসেলে পাওয়া যায়। অল্প সামান্য কিছুও কেনাকাটা করা যায়। বিশেষ করে খাঁটি স্থানীয় স্বাদ আর সঙ্গে আছে তাদের আন্তরিক পরিবেশে।

সেন্ট জ্যাকবস ফার্মার্স মার্কেটে কেনাকাটার আনন্দ যেমন তেমনি ফ্রেস অর্গানিক পণ্য পাওয়া যায়। শুধু অসাধারণ খাবার এবং কারুশিল্পের চেয়েও বেশি, এটি দেখার, স্বাদ নেওয়ার, গন্ধ নেওয়ার মতো জিনিসপত্রের অফারে মজাও আছে। সবার জন্য এটি উৎসবের আমেজ, তাদের প্রিয় বিক্রেতাদের সঙ্গে দেখা করা এবং তাদের খাবার কোথা থেকে আসে তা জানা যা সাপ্তাহিক বাজারে ভ্রমণকে এত উপভোগ্য করে তোলে। কানাডার বৃহত্তম বছরব্যাপী কৃষক বাজার এবং ফ্রি মার্কেট হিসেবে পরিচিত, তিনটি প্রধান ভবনের ভেতরে এবং একটি বহিরাঙ্গন এলাকায় শত শত স্থানীয় বিক্রেতাদের খুঁজে পাওয়া যায়। যে ঋতুতে যে ফসল তেমনি পণ্য পাওয়া যায়। 

বছরজুড়ে তারা তাই নিয়ে হাজির হয়। কিছু পণ্য ট্রাকবোঝাই করে বাজারে আনা হয়। অন্যগুলো স্থানীয় ওল্ড অর্ডার মেনোনাইট ফার্ম থেকে ঘোড়া এবং বগিতে করে আসে। তাজা স্থানীয় ফল এবং শাকসবজি, উন্নতমানের মাংস এবং পনির, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ম্যাপেল সিরাপ, মধু, সংরক্ষণ, বেকিং, বিভিন্ন খাঁটি খাবার, আমদানি করা পণ্য, ভেজালমুক্ত খাবার এবং  স্থানীয় কারুশিল্প, গৃহস্থালির জিনিসপত্র, পরিধেয় জিনিসপত্র এবং আরও অনেক কিছু।

এটি কানাডার বৃহত্তম বছরব্যাপী কৃষক বাজার এবং শহর এবং নিকটবর্তী সম্প্রদায়ের বাসিন্দাদের পাশাপাশি কানাডা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের পর্যটকদের কাছে এটি একটি জনপ্রিয় জায়গা। এটি বছরে প্রায় ১০ লাখ দর্শনার্থীকে আকর্ষণ করে।

এটি ১৯৭৫ সালের এপ্রিলে প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০১৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর আগুনে বাজারের মূল ভবনটি ধ্বংস হয়ে যায়। বাজারটি পুনর্নির্মাণ করা হয় এবং ২০১৫ সালের ১১ জুন পুনরায় খোলা হয়। কৃষকদের বাজার সারা বছর ধরে বৃহস্পতি এবং শনিবার খোলা থাকে। সেই সঙ্গে জুন থেকে আগস্টের মধ্যে মঙ্গলবারও খোলা থাকে।

সেন্ট জ্যাকবস গ্রামে অন্টারিওর মেনোনাইটের সেন্ট জ্যাকবস কানাডার বৃহত্তম ওল্ড অর্ডার মেনোনাইট সম্প্রদায়ের আবাসস্থল, যাদের আঠারো শতক থেকে একটি শক্তিশালী ঐতিহাসিক উপস্থিতি রয়েছে। এই সম্প্রদায়গুলো তাদের ঐতিহ্যবাহী কৃষিকাজ জীবনধারা, ঘোড়ায় টানা বগি এবং উনিশ শতকের রীতিনীতির প্রতি প্রতিশ্রুতির জন্য পরিচিত, একই সঙ্গে কারিগরি পণ্য এবং সেন্ট জ্যাকবস কৃষক বাজারের মতো জিনিসপত্রের মাধ্যমে স্থানীয় সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করে। দর্শনার্থীরা বাজার, খামার ভ্রমণ এবং দ্য মেনোনাইট স্টোরির মতো জাদুঘরের মাধ্যমে এই ঐতিহ্য অনুভব করতে পারেন। ইতিহাস এবং জীবনধারা বসতি  আঠারো শতক থেকে শুরু করে অনেক ওল্ড অর্ডার মেনোনাইট এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে, যাদের অনেকেই পেনসিলভানিয়া থেকে আসেন। তারা একটি ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা বজায় রেখে চলেছে, যার মধ্যে প্রায়শই

কৃষিকাজ এবং ঘোড়ায় টানা বগি ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত থাকে এবং উনিশ শতকের অনেক রীতিনীতি সংরক্ষণ করেছে।

ওল্ড মেনোনাইটরা হল রক্ষণশীল গোষ্ঠী যারা সীমিত প্রযুক্তি এবং ঐতিহ্যবাহী উপাসনা অনুশীলনের মাধ্যমে একটি সহজ জীবনযাপন বজায় রাখে। 

তারা অ্যানাব্যাপ্টিস্ট বিশ্বাসের একটি শাখা এবং অর্ডনাং নামক নিয়মের একটি সেট দ্বারা পরিচালিত একটি শক্তিশালী সম্প্রদায় জীবনের ওপর জোর দেয়। তারা তাদের সাদামাটা পোশাক এবং টেলিভিশন, রেডিও এবং ইন্টারনেটের মতো আধুনিক প্রযুক্তি প্রত্যাখ্যানের জন্য পরিচিত। জীবনধারা এবং অনুশীলন প্রযুক্তি- ওল্ড অর্ডার মেনোনাইটরা অনেক আধুনিক প্রযুক্তি প্রত্যাখ্যান করে, যদিও এর পরিমাণ গোষ্ঠী অনুসারে পরিবর্তিত হয়। অনেক গোষ্ঠী রেডিও, টেলিভিশন বা ইন্টারনেট ব্যবহার করে না, তবে বিদ্যুৎ এবং টেলিফোন গ্রহণ করতে পারে, কখনো কখনো সীমাবদ্ধতার সঙ্গে। পরিবহন- কিছু গোষ্ঠী এখনও ঘোড়া এবং বগি ব্যবহার করে, আবার অন্যরা গাড়ি ব্যবহার করে। পোশাক- তারা সাধারণ, রক্ষণশীল পোশাক পরে, সাধারণত গাঢ় রঙের। 

সম্প্রদায়- তারা ব্যক্তির চেয়ে সম্প্রদায়ের ওপর জোর দেয় এবং তাদের জীবনযাত্রার পছন্দের জন্য গির্জার নির্দেশিকা মেনে চলে। উপাসনা- তারা ঐতিহ্যবাহী উপাসনা এবং বাপ্তিস্মের অনুশীলন বজায় রাখে এবং উপাসনার পুরোনো ধরনগুলো মেনে চলতে পছন্দ করে। তাই ধরে রেখেছে।

আসলে সত্যি তো আমরাও যখন যান্ত্রিকতায় শব্দদূষণে যখন বিধ্বস্ত হয়ে পড়ি, খুঁজি নিবিড় নীরবতায়- জলের ধ্বনি, পাখির কলকাকলি, ফুলের ঘ্রাণ, ছায়া সুনিবিড় প্রশান্তির এক টুকরো স্থান। লোকালয় থেকে দূরে অন্য কোথাও অন্য কোনো খানে।

সময়ের আলো/এসকে/ 



  বিষয়:   সেন্ট জ্যাকব মার্কেট  টরন্টো 


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: