সুইজারল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনপ্রিয় ও বিলাসবহুল স্কি রিসোর্ট ক্র্যানস-মন্টানায় নববর্ষের রাতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১১৫-এরও বেশি মানুষ গুরুতর আহত হয়েছে। এই দুর্ঘটনা দেশজুড়ে শোকের ছায়া ফেলেছে এবং সাধারণত নিরাপদ দেশ হিসেবে পরিচিত সুইজারল্যান্ডকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে।
কীভাবে ঘটলো দুর্ঘটনা
পুলিশ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার ভোররাত ১টা ৩০ মিনিটে (জিএমটি অনুযায়ী ০০:৩০) শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত পরিচিত বার “লে কনস্টেলেশন”-এ হঠাৎ আগুন লাগে। ওই সময়ে বারে ১০০-এর বেশি মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, মুহূর্তের মধ্যেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পুলিশ মনে করছে, আগুনের সঙ্গে কিছু বিস্ফোরণও ঘটেছিল, যদিও এর সঠিক কারণ এখনো জানা যায়নি।
আগুনের সম্ভাব্য কারণ
ওয়ালিস ক্যান্টনের পুলিশ মুখপাত্র গায়েতাঁ লাথিয়োঁ জানিয়েছেন, এটি একটি অজানা উৎস থেকে সৃষ্ট বিস্ফোরণ বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানায়, সুইস কর্তৃপক্ষ এটিকে “embrasement généralisé” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ফরাসি অগ্নিনির্বাপণ পরিভাষায় এর অর্থ হলো-আগুনের তাপে দাহ্য গ্যাস বের হয়ে হঠাৎ প্রচণ্ডভাবে জ্বলে ওঠা। ইংরেজিতে এটিকে সাধারণত ফ্ল্যাশওভার বা ব্যাকড্রাফট বলা হয়।
পুলিশ এখনও বলেছে, অগ্নিসংযোগ বা হামলার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
নিহত ও আহতদের অবস্থা
ভ্যালাইস ক্যান্টনের পুলিশ কমান্ডার ফ্রেডেরিক গিসলার নিশ্চিত করেছেন, নিহতের সংখ্যা প্রায় ৪০ এবং আহতের সংখ্যা ১১৫-এর বেশি, যাদের মধ্যে বেশিরভাগ গুরুতরভাবে দগ্ধ।
ফরাসিভাষী সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন হাসপাতালের বার্ন ইউনিট ও আইসিইউ সম্পূর্ণভাবে ভর্তি। জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ১২ জন দগ্ধ রোগীর চিকিৎসা চলছে এবং লুসান বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ২২ জন রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, সর্বনিম্ন বয়স ১৬ বছর। ইতালির মিলানে অবস্থিত নিগার্দা হাসপাতালের মেজর বার্ন ইউনিটও সক্রিয় করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে অনেক বিদেশি নাগরিক থাকায় পরিচয় শনাক্ত করতে কিছু সময় লাগতে পারে।
পরিস্থিতি ও উদ্ধার কার্যক্রম
পুলিশ ও দমকল বাহিনী ঘটনাস্থল ঘিরে রেখে তদন্ত চালাচ্ছে। আগুনের প্রকৃত কারণ, বিস্ফোরণের উৎস এবং নিরাপত্তার ত্রুটি খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।
দুর্ঘটনার পর ১০টি হেলিকপ্টার, ৪০টি অ্যাম্বুলেন্স এবং ১৫০-এর বেশি উদ্ধারকর্মী ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। পুরো এলাকা ঘিরে ফেলা হয়েছে এবং আকাশে নো-ফ্লাই জোন ঘোষণা করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারদের সহায়তার জন্য একটি অভ্যর্থনা কেন্দ্র এবং হেল্পলাইন চালু করা হয়েছে। হেল্পলাইন: +৪১ ৮৪৮ ১১২ ১১৭
ভ্যালাইস ক্যান্টনের প্রসিকিউটর জেনারেল বিয়াট্রিস পিলাউড বলেছেন, এটি দুর্ঘটনাজনিত অগ্নিকাণ্ড, কোনো হামলা নয়।
জাতীয় প্রতিক্রিয়া
সুইস প্রেসিডেন্ট গাই পারমেলিন বলেন, বছরের প্রথম দিনেই ক্র্যানস-মন্টানায় যে ট্র্যাজেডি ঘটেছে, তা পুরো দেশ এবং দেশের বাইরে থেকেও মানুষকে শোকাহত করেছে।
সুইজারল্যান্ডে এ ধরনের ঘটনা বিরল
বিশেষজ্ঞরা বলেন, সুইজারল্যান্ডে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড বা বিস্ফোরণ অত্যন্ত বিরল। সাম্প্রতিক ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা খুব কম ঘটেছে। এর আগে ২০২৪ সালে একটি আবাসিক ভবনের পার্কিং গ্যারেজে বিস্ফোরণে ২ জন নিহত হয়েছিল। এছাড়া ১৯৪৭ সালের মিথলজ গোলাবারুদ ডিপোর বিস্ফোরণ এবং ১৯৭০ সালের সুইসএয়ার ফ্লাইটে বোমা বিস্ফোরণ উল্লেখযোগ্য। তবে বর্তমান ঘটনা প্রাণহানির দিক থেকে নজিরবিহীন।
/ইউএমএইচ