কক্সবাজারের সীমান্ত উপজেলা টেকনাফে ইয়াবা কারবারিদের দৌরাত্ম্য নতুন রূপ নিয়েছে। মাদক কারবারের পাশাপাশি এবার তারা সরকারি পাহাড় দখল ও নির্বিচারে পাহাড় কাটার মহোৎসবে মেতেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ- প্রকাশ্যে কোনো বাধা ছাড়াই পাহাড় কেটে সাবাড় করছে বেপরোয়া মাদক কারবারিরা। হোয়াইক্যং ইউনিয়নে পাহাড় কাটা ও দখলের মূল হোতা হিসেবে উঠে এসেছে সৈয়দ নুর প্রকাশ নুরুল আমিন ওরফে ট্রলি আমিনের নাম। তিনি ওই এলাকার কবির আহমদের ছেলে এবং এলাকাজুড়ে একজন চিহ্নিত ইয়াবা কারবারি হিসেবে পরিচিত।
সরেজমিন দেখা যায়- টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের দক্ষিণ কানজর পাড়া এলাকার পশ্চিমে সরকারি মালিকানাধীন পাহাড় কেটে সাবাড় করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইন অনুযায়ী সরকারি পাহাড় কাটা ও বনভূমি ধ্বংস করা পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও বন আইনে গুরুতর অপরাধ। এসব অপরাধের জন্য কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে আইন প্রয়োগের দুর্বলতা অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে। এ বিষয়ে জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে পরিবেশ অধিদফতর, কক্সবাজারের অতিরিক্ত পরিচালক জমির উদ্দিন বলেন, কেউ পাহাড় কাটলে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট আইনে মামলা দেওয়া হবে।
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য অভিযুক্ত ট্রলি আমিনের বাড়িতে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। তার সঙ্গে মুঠোফোনেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), কক্সবাজারের জেলা সভাপতি এইচ এম এরশাদ বলেন, টেকনাফের পাহাড় কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অংশ নয়, এটি পুরো উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্যের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বাপা, কক্সবাজারের জেলা সভাপতি এইচ এম এরশাদ আরও বলেন, পাহাড় কেটে ফেললে ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ে, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয় এবং জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু এসব বিষয় উপেক্ষা করেই অব্যাহত রয়েছে পাহাড় ধ্বংসের এই মহোৎসব।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে আলাপকালে তারা অভিযোগ করেন, একাধিক মাদক মামলায় আসামি হয়েও প্রশাসনের চোখের সামনে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে প্রভাবশালী ইয়াবা কারবারিরা। অথচ দীর্ঘদিন চলমান এই অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো আইনি ব্যবস্থা নিতে দেখা যাচ্ছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। মাদকের ভয়ংকর বিস্তারের পর এবার মাদক কারবারিদের পাহাড় কাটার দৌরাত্ম্যে বিপন্ন হচ্ছে পরিবেশ, বাড়ছে ভূমিধসে প্রাণহানির শঙ্কা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এবং প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, ট্রলি আমিনের বিরুদ্ধে একাধিক মাদক মামলা রয়েছে। অতীতে কয়েকবার ইয়াবাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরাও পড়েছেন তিনি। তবে এসব মামলার পরও কীভাবে তিনি প্রকাশ্যে পাহাড় কাটার মতো গুরুতর অপরাধে যুক্ত হচ্ছেন তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। এই পাহাড়খেকো মাদক কারবারি পরিকল্পিতভাবে সরকারি পাহাড় দখল করে সেখানে শ্রমিক ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে দিনদুপুরে নির্বিচারে পাহাড়ের মাটি কেটে নিচ্ছে। পাহাড় কাটার পর সেই মাটি বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করা হচ্ছে। জমি ভরাটের কাজেও ব্যবহার করা হচ্ছে এসব মাটি। স্থানীয়দের অভিযোগ- পাহাড় কেটে মাটি বিক্রির টাকা আবার বিনিয়োগ করা হচ্ছে ইয়াবা কারবারে। ফলে একদিকে যেমন পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে, অন্যদিকে মাদকচক্র আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
এলাকাবাসীর ভাষ্য- পাহাড় কাটার ফলে শুধু প্রকৃতি নয়, সাধারণ মানুষের জীবনযাপনও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে- পাহাড় কেটে মানুষের চলাচলের পুরোনো পথও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে করে স্কুলগামী শিক্ষার্থী, নারী ও বৃদ্ধদের দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প পথে চলাচল করতে হচ্ছে। বর্ষা মৌসুম এলেই আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়। পাহাড় কেটে দুর্বল হয়ে পড়া মাটি যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে- এই আশঙ্কায় দিন কাটে স্থানীয় বাসিন্দাদের। তবুও পাহাড়খেকো বেপরোয়া ইয়াবা কারবারি ট্রলি আমিনের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস পান না স্থানীয়রা। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই পাহাড় কাটা কোনো গোপন কর্মকাণ্ড নয়। প্রকাশ্যে দিনের পর দিন এই কাজ চললেও স্থানীয় প্রশাসন, বন বিভাগ কিংবা পরিবেশ অধিদফতরের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এতে করে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা চরমে পৌঁছেছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, তবে কি টেকনাফে আইন শুধু দুর্বলদের জন্য? প্রভাবশালী মাদক কারবারিদের জন্য কি আইন অকার্যকর? নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, পাহাড় কাটা মানে শুধু মাটি কাটা নয়, এটা আমাদের ভবিষ্যৎ কাটা। কিন্তু এসব অনিয়ম দেখার যেন কেউ নেই। স্থানীয় আরেক বাসিন্দা বলেন, ট্রলি আমিন একজন পরিচিত ইয়াবা কারবারি। তার বিরুদ্ধে মামলা আছে। সে ইয়াবাসহ প্রশাসনের হাতে ধরাও পড়েছে একাধিকবার। কিন্তু এখন সে পাহাড় কেটে আমাদের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলছে। কেউ প্রতিবাদ করলে হুমকি দেয়। আমরা সাধারণ মানুষ। চুপ থাকা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই।
স্থানীয়দের দাবি- টেকনাফে মাদক কারবারিরা এখন বহুমুখী অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে। ইয়াবা কারবারের পাশাপাশি পাহাড় দখল, বন উজাড় ও ভূমিবাণিজ্যের মাধ্যমে তারা নিজেদের প্রভাব আরও বাড়াচ্ছে। এই চক্র ভাঙতে না পারলে টেকনাফ পুরোপুরি অপরাধ নিয়ন্ত্রিত এলাকায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রশাসনের নীরবতা এই অপরাধীদের জন্য কার্যত একটি নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করে দিচ্ছে। দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা না নিলে টেকনাফের পাহাড়, পরিবেশ ও জনজীবন ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। অবিলম্বে পাহাড় কাটা বন্ধ করে অভিযুক্ত ইয়াবা কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে এবং টেকনাফকে মাদক ও ভূমিদস্যুদের কবল থেকে রক্ষা করার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের জোর হস্তক্ষেপ খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। অন্যথায় ভবিষ্যতে টেকনাফ পাহাড়হীন ও আইনহীন এক জনপদে পরিণত হবে।
এএডি/