মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলায় চর বাউশিয়া বড়কান্দি গ্রামে শিল্প-কারখানা স্থাপনের নামে তিন ফসলি জমি সরকারের অনুমতি ব্যতীত বালু দিয়ে ভরাট করে ফেলছে সাহারা ট্রেডিং লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান। স্থানীয়দের অভিযোগ, যেসব কৃষক প্রতিষ্ঠানটির কাছে জমি বিক্রি করতে চাইছে না জোরপূর্বক তাদের জমিতে বালু ফেলে ভরাট করে ফেলা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে একাধিক পরিবেশবাদী সংগঠন। স্থানীয়রা জানান, প্রভাবশালী একটি চক্রের সহযোগিতায় কোম্পানিটি প্রশাসনের নাকের ডগায় কৃষিজমি ভরাট করে ফেলছে। নদীর জায়গা ও ব্যক্তি মালিকানাধীন জায়গা জোরপূর্বক ভরাট করে ফেলছে তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গজারিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের মাধ্যমে বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত হয়েছি। সরকারের অনুমতি ব্যতীত জমির শ্রেণি পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই। যদি প্রতিষ্ঠানটি কারও জমি জোরপূর্বক দখল করে তবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে কোম্পানি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে বালু ভরাটের সাইটে গেলে উপস্থিত একজন নিজেকে কোম্পানির কর্মকর্তা পরিচয় দেন। নিজের নাম-পদবি প্রকাশ না করলেও তিনি বলেন, সরকারের অনুমতি নিয়ে ও যথাযথ নিয়ম মেনেই আমরা এখানে বালু ভরাট করতে এসেছি। এখানে আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি।
এদিকে নদী, খাল ও পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের আহ্বায়ক শফিক ঢালী বলেন, গত এক দশকে গজারিয়ায় কৃষিজমি কমেছে কয়েক হাজার হেক্টরেরও বেশি। ফসলি জমি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার মূল ভিত্তি। এসব কৃষিজমি নষ্ট হলে শুধু কৃষক নয়, পুরো দেশের অর্থনীতি ও পরিবেশ ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়বে। এ বিষয়ে আমরা প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করি।
গজারিয়া উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, গত এক দশকে গজারিয়া উপজেলায় তিন ফসলি কৃষিজমির পরিমাণ কমেছে প্রায় ৫শ হেক্টর। তবে প্রান্তিক কৃষকদের দাবি, বাস্তবে এই চিত্র আরও ভয়াবহ। তাদের মতে, গত এক দশকে প্রায় এক হাজার হেক্টর জমিতে শিল্প-কারখানা স্থাপন করা হয়েছে।
শুক্রবার দুপুরে সরেজমিন ঘটনাস্থল চর বাউশিয়া বড়কান্দি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ফসলি জমির পাশে উঁচু করে ড্রেজার দিয়ে বালু ভরাট করা হচ্ছে। ফলে নিচু জমিগুলোতে পানি জমে কৃষিকাজ করার সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। কোথাও কোথাও নতুন করে ফসলি জমিতে বালু ভরাট করার জন্য জমির মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে কংক্রিটের পিলার।
ভুক্তভোগী কৃষকদের মধ্যে কয়েকজনের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, এসব জমিতে আগে ধান ও বিভিন্ন ধরনের সবজির আবাদ হতো। তবে এখন পাশের জমি ভরাটের কারণে বালু-পানি আটকে থাকছে। পানি আর বালুর কারণে যেসব জমি কোম্পানিটি ক্রয় করেনি সেসব জমিতেও চাষাবাদ করা যাচ্ছে না। কোম্পানিটি এমন একটি অবস্থা করেছে যেন কৃষকরা বাধ্য হয়ে তাদের কাছে জমি বিক্রি করে দেয়।
স্থানীয় কৃষক মজিবুর রহমান বলেন, এই জমিই ছিল আমাদের সংসারের একমাত্র ভরসা। কোম্পানি জমি ভরাট করে আমাদের সব শেষ করে দিয়েছে। চারদিক দিয়ে বালু ফেলে আমাদের ঘিরে ফেলেছে। অবস্থা এরকম দাঁড়িয়েছে যে, তাদের কাছে জমি বিক্রি করা ছাড়া আমাদের কোনো পথ নেই।
স্থানীয় বাসিন্দা ফাতেমা বেগম বলেন, আমাদের জমির পাশের জমিটি কোম্পানি ক্রয় করেছে। কিন্তু আমরা কোনো জমি বিক্রি করিনি। পাশের জমিতে বালু ফেলার কারণে আমাদের জমির প্রায় অর্ধেক বালু দিয়ে ভরাট হয়ে গেছে। আমরা কার কাছে যাব? কোথায় এর প্রতিকার পাব?
এএডি/