অতিথি পাখিহীন হতে বসেছে জাবি

হাবিবুর রহমান সাগর (জাবি)

শীত এলেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) জলাশয়গুলো হয়ে উঠত জীবনের উচ্ছ্বাসে ভরা। ভোরের কুয়াশা ভেদ করে পাখির ডানার শব্দ, পানিতে ভাসমান

2026-01-03T03:13:00+00:00
2026-01-03T03:13:00+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
অতিথি পাখিহীন হতে বসেছে জাবি
হাবিবুর রহমান সাগর (জাবি)
প্রকাশ: শনিবার, ৩ জানুয়ারি, ২০২৬, ৩:১৩ এএম   (ভিজিট : ১২২)
ফাইল ছবি
শীত এলেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) জলাশয়গুলো হয়ে উঠত জীবনের উচ্ছ্বাসে ভরা। ভোরের কুয়াশা ভেদ করে পাখির ডানার শব্দ, পানিতে ভাসমান শাপলার ফাঁকে ফাঁকে হাঁসের দল- সব মিলিয়ে ক্যাম্পাস যেন রূপ নিত এক জীবন্ত জলচিত্রে। অথচ চলতি শীত মৌসুমে সেই চেনা দৃশ্য আর চোখে পড়ছে না। ভরা মৌসুমেও জাবির অধিকাংশ জলাশয় এখন নীরব, পরিযায়ী পাখির উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কোনো একক বছরের ঘটনা নয় বরং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও পরিবেশগত অবক্ষয়ের ফল। অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ, নির্বিচারে গাছ কাটা, জলাশয় সংস্কারে অনীহা এবং মাছ চাষের জন্য লেক ইজারা দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত পরিযায়ী পাখিদের নিরাপত্তা ও খাদ্যচক্র ভেঙে দিয়েছে।

একসময় ছিল নিরাপদ আশ্রয়, এখন অনিশ্চয়তা। প্রতি শীতেই তীব্র ঠাণ্ডা ও খাদ্য সংকট এড়াতে হাজার হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে সাইবেরিয়া ও মধ্য এশিয়া থেকে পরিযায়ী পাখিরা বাংলাদেশে আসে। একসময় জাবি ক্যাম্পাস ছিল তাদের অন্যতম নির্ভরযোগ্য আশ্রয়স্থল। ক্যাম্পাসের ছোট-বড় প্রায় ৩০টি জলাশয় তাদের জন্য খাদ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করত।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, নব্বইর দশকের শুরুতে জাবিতে পরিযায়ী পাখির নিয়মিত আগমন শুরু হয়। তখন প্রায় সব লেকেই পাখির দল দেখা যেত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস হওয়ায় সেই চিত্র বদলে যায়। বর্তমানে কেবল একটি সংরক্ষিত জলাশয় ছাড়া অন্য কোথাও নিয়মিত পাখির উপস্থিতি চোখে পড়ে না।

কোন পাখিরা আসত জাবিতে? প্রাণিবিদ্যা বিভাগের তথ্যানুসারে জাবিতে আগত পরিযায়ী পাখির বড় অংশ ছিল হাঁসজাতীয়। সরালি, গার্গেনি, পাতারি হাঁস, নর্দার্ন পিনটেইল, বামুনিয়া হাঁস, পচার্ডের পাশাপাশি জলচর ও ডুবুরি প্রজাতির পাখিও দেখা যেত। এ ছাড়া মানিকজোড়, জলপিপি, খঞ্জনা, রেড গুরগুটি ও সিকল-ক্রেস্টেডসহ নানা প্রজাতি ক্যাম্পাসের জীববৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করত।

কেন কমছে পাখি?
পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, পাখি কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। নিয়মিত লেক সংস্কার না হওয়ায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। পানি দূষণের ফলে প্ল্যাঙ্কটন, পোকামাকড় ও ছোট মাছের উৎপাদন কমে গেছে যা পাখিদের প্রধান খাদ্য। পাশাপাশি অতিরিক্ত পর্যটক, যানবাহনের শব্দ, আলো দূষণ ও মানুষের ভিড় পাখিদের নিরাপত্তাবোধ নষ্ট করছে।

পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আমীর হোসেন ভূঁইয়া বলেন, গত কয়েক বছর ধরে অতিরিক্ত পর্যটন জাবির জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। লেকের চারপাশে অটোরিকশা, মানুষের চিৎকার, ছবি তোলা কিংবা খাবার ও ঢিল ছোড়ার মতো আচরণ পাখিদের ভীত করে তুলছে। তিনি আরও বলেন, একসময় লেকের পানি স্বচ্ছ ছিল, সেখানে পাখির জন্য প্রাকৃতিক খাবার সহজলভ্য ছিল। এখন পানির গুণগত মান নষ্ট হয়েছে। এক লেকের সঙ্গে আরেক লেকের সংযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পানিতে অক্সিজেন কমে গেছে যা পুরো খাদ্যচক্র ধ্বংস করছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল জাবি নয় সারা দেশেই পরিযায়ী পাখির সংখ্যা কমছে। জলবায়ু পরিবর্তন, হাওড়-বিলে বাঁধ নির্মাণ, সেচ কার্যক্রম ও পানি সংকটের কারণে টাঙ্গুয়ার হাওড় বা হাকালুকি হাওরের মতো ঐতিহ্যবাহী এলাকাতেও পাখির আনাগোনা কমেছে। ফলে পরিযায়ী পাখিরা বাংলাদেশকে আগের মতো নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করছে না।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক বছর আগেও শীত মৌসুমে ক্যাম্পাসে প্রায় ৬-৭ হাজার পরিযায়ী পাখি দেখা যেত। গত তিন বছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজারে। চলতি বছরে সংখ্যাটি আরও নেমে ২ হাজারের কাছাকাছি। যেখানে একসময় ডব্লিউআরসি লেক, ট্রান্সপোর্ট চত্বর ও আল-বেরুনী হল সংলগ্ন লেকে পাখির ভিড় থাকত, এবার শেষের দুটি লেক পুরোপুরি ফাঁকা।

প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. কামরুল হাসান বলেন, করোনাকালীন নীরব সময়ে আমরা প্রায় ৬ হাজার পাখি গণনা করেছিলাম। এখন সামগ্রিকভাবে জাবি এক ধরনের বাস্তুতান্ত্রিক অবক্ষয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে পরিযায়ী পাখির ওপর।

ক্যাম্পাসে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য গড়ে তোলা ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন অ্যান্ড স্টাডি সেন্টারের (ডব্লিউআরসি) দায়িত্বে থাকা কেয়ারটেকার সানোয়ার হোসেন জানান, সংরক্ষিত এলাকা হওয়া সত্ত্বেও এখানে অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ বেড়েছে। ডব্লিউআরসি লেক পাখিদের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ হলেও মানুষের আনাগোনা বাড়ায় তারা এখানেও হুমকির মুখে।

করণীয় কী? বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি লেককে আলাদাভাবে বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ, শব্দ ও আলো দূষণ কমানো, পানি ও জলজ উদ্ভিদের সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত মনিটরিংয়ের মাধ্যমে পাখিবান্ধব পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট শাখার কর্মকর্তা আব্দুর রব বলেন, বাজেট সীমিত হলেও আমাদের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। সঠিক পরিকল্পনা ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করলে জাবির হারানো জীববৈচিত্র্য ধীরে ধীরে ফিরে আসতে পারে।

একসময় যে ক্যাম্পাস শীত এলেই পাখির কোলাহলে মুখর হয়ে উঠত, সেই জাহাঙ্গীরনগর আজ নীরবতার সাক্ষী। প্রশ্ন একটাইÑ এ নীরবতা কি স্থায়ী হবে নাকি সময় থাকতেই ফিরবে অতিথি পাখিদের চেনা ডানার ঝাপটানি?

এএডি/


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: