২৬ বছর ধরে হালদা নদীর মাঝি

এস এম আক্কাছ, ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম)

৮০ বছর বয়সি বৃদ্ধ দৌলত মুন্সি। হালদা নদীর এপার-ওপার করতে করতে কেটেছে দীর্ঘ ২৬টি বছর। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার রোসাংগিরি শীলের

2026-02-01T02:47:37+00:00
2026-02-01T02:47:37+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
২৬ বছর ধরে হালদা নদীর মাঝি
এস এম আক্কাছ, ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম)
প্রকাশ: রোববার, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২:৪৭ এএম 
ফটিকছড়িতে ২৬ বছর ধরে হালদা নদীতে নৌকা বাইছেন দৌলত মুন্সি। ছবি : সংগৃহীত
৮০ বছর বয়সি বৃদ্ধ দৌলত মুন্সি। হালদা নদীর এপার-ওপার করতে করতে কেটেছে দীর্ঘ ২৬টি বছর। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার রোসাংগিরি শীলের ঘাটে হালদা নদী পারাপারে নৌকার মাঝি তিনি। দীর্ঘদিন ধরে নৌকা টানেন। পারাপার করেন দিন-রাত শত শত নারী-পুরুষ। ঘাটের অল্প দূরত্বে হাটহাজারী উপজেলার বংশাল গ্রামের বাসিন্দা তিনি। পাঁচ কন্যা ও তিন পুত্রের জনক দৌলত মুন্সি সমানে পরিশ্রম করে হয়ে উঠেছেন আগ্রাসী হালদার এক অনন্য সাক্ষী।

সরেজমিন দেখা যায়, দৌলত মুন্সি হালদা নদীতে তার নৌকা দিয়ে মানুষ পারাপার করছেন। ছোট-বড় সবাই তাকে ‘বদ্দা’ বা ‘মুরুব্বি’ বলে ডাকছেন। একজন নদী পার হলে ১০ টাকা করে দিচ্ছেন। বিকালে লোকজন কম থাকায় কখনো কখনো ভাসমান নৌকায় অলস সময় পার করছেন তিনি। বর্তমানে বড় কষ্টের জীবন তার। এরপরেও মুখে যেন তার তৃপ্তির হাসি।

দৌলত মুন্সি জানান, হালদার এই ঘাটে তার ২৬ বছরের পথচলা মসৃণ ছিল না। পাকিস্তান আমলে ছিলেন দিনমজুর। দেশ স্বাধীনের পর ২৬ বছর আগে এক দিন এই খেয়া পারাপারে দুর্ঘটনায় নৌকাডুবিতে মানুষ মারা গেলে তখন স্থানীয় বাসিন্দারা আগের খেয়া মাঝিকে বিতাড়ন করেন। পরে তিনি সেখানে দায়িত্ব নিয়ে মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হন। 

শুরুতে লাভের মুখ দেখে একটি নৌকা নিয়ে আনন্দে কাজ শুরু করেন। বয়স যখন ৩৪ বছর তখন বাবা মারা যান। ২৬ বছর আগে সংসার ও ভাই-বোনদের মানুষ করতে ওই বয়সেই অভাবের সংসারের হাল ধরে পাঁচ পুত্র ও তিন কন্যাসন্তানদের পরিবার চালাতে থাকেন তিনি। তিনি আরও জানান, যখন মাঝি হিসেবে কাজ শুরু করি তখন একজন মানুষ পারাপার করলে দুই টাকা করে পেতাম। কয়েক বছর পর ৫ টাকা এবং এখন ১০ টাকা করে নদী পারাপার করি। 

প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা আয় করি। আবার কখনো বেশি-কম হয়ে থাকে। তা ছাড়া দুই পারের কিছু প্রাত্যহিক মানুষ বছরে ধান বা এক-দেড় হাজার টাকা দিয়ে সহযোগিতা করেন। অন্যদিকে আশপাশের এলাকার মানুষ মারা গেলে ঘাট পারাপারের কিছু মানত-হাদিয়া অর্থকড়ি পেয়েও সংসারের দুঃখের গ্লানি কিছুটা দূর করতে পারি। 

একসময় ২৫ হাজার টাকায় ইজারা হতো এই ঘাট। উন্নত যোগাযোগের কারণে যাতায়াতকারী কমে যাওয়ায় গত কয়েক বছর ধরে ইজারা নেই। পঞ্চান্ন হাজারে কেনা নৌকার মজুরিও তোলা অসম্ভব। প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত টানতে হয় নৌকা।

ইতিহাস টেনে দৌলত মুন্সি বলেন, একসময় চট্টগ্রাম নগর ও সদরঘাট থেকে এই নদীপথে পুরো উত্তরাঞ্চলের বাণিজ্যের ব্যবসাপাতির প্রসার হতো। আমিও ছিলাম সেই ইতিহাসের অংশ হয়ে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় এখন সেসব স্মৃতি অতীত। বাপ-দাদার কোনো জমিজমা না থাকায় তিনি স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে থাকতেন নদীর কাছে একটি ঘরে। তার আট সন্তানের একজন বাদে সবারই বিয়ে হয়েছে। অবিবাহিত এক সন্তান থাকে তার সঙ্গে। 

২৬ বছরের পথচলায় বেছে নেওয়া নৌকার মাঝির কাজে কোনোভাবে জীবন আর জীবিকা চালিয়ে এখন দিন কাটছে বৃদ্ধ দৌলত মুন্সির। কোনো রকমে করেছেন একটি পাকা ঘর। তবু যেন হাল ছাড়ার পাত্র নন তিনি। তাই এ বয়সে কষ্ট হলেও চালিয়ে যাওয়ার সংকল্প আছে তার। কখনো কেউ সহায়তা করেননি জানিয়ে আক্ষেপে তিনি জানান, কখনো সরকারি-বেসরকারি কোনো সাহায্য পাননি।

দৌলত মুন্সি বলেন, এখন আর পারি না। জীবনের শেষ বয়সে এসে নৌকা চালানো আমার পেশা। পেশাটাকে এতদিন অতি যত্নে আগলে রেখেছি। নৌকা চালাতে চালাতে কখন যে কেটে গেল জীবনের ২৬টি বছর; তা বুঝতেই পারিনি। আর দুই পারের মানুষগুলো পরম আপন হয়ে গেছে। 

তাই এ পেশা ও মানুষকে ভালোবেসে মাঝির পেশা আঁকড়ে ধরে আছি। সহজ-সরল দৌলত মুন্সি বলেন, এই হালদার অনেক আগ্রাসন দেখেছি। এপার ভেঙে ওপার গড়ার কত ইতিহাস আমার জানা আছে। এ ঘাটে বাজার, বিদ্যালয়, মাদরাসার শিক্ষার্থীসহ দুই পারের অনেকেই পারাপার হন। তাদের ছাড়া নদীর এ ঘাট বড় শূন্য লাগে। এলাকার মানুষ আমাকে অনেক ভালোবাসে।

সময়ের আলো/কেএইচও


  বিষয়:   ২৬ বছর  হালদা নদী  মাঝি 


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: