রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় আসন ঢাকা-১৩ বহু বছর ধরেই পরিচিত অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে। মোহাম্মদপুর, আদাবর ও শেরেবাংলা নগরের একাংশ নিয়ে গঠিত এই আসনে নাগরিক নিরাপত্তাহীনতা এবারের নির্বাচনে ভোটারদের সিদ্ধান্তের প্রধান নিয়ামক হয়ে উঠেছে। এমন প্রেক্ষাপটে ঢাকা-১৩ আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সহমর্মিতা ও ইসলামপন্থিদের সমর্থনে এগিয়ে আছেন রিকশা প্রতীকের মাওলানা মামুনুল হক। অন্যদিকে ধানের শীষ প্রতীক থাকায় বাড়তি সুবিধায় রয়েছেন বিএনপি-সমর্থিত জোটপ্রার্থী ববি হাজ্জাজ। স্থানীয়দের ধারণা, মাঠে আরও পাঁচজন প্রার্থী থাকলেও মূল লড়াই গড়াবে এই দুই প্রার্থীর মধ্যেই।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৮, ২৯, ৩০, ৩১, ৩২, ৩৩ ও ৩৪ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৩ আসনের মধ্যে রয়েছে লালমাটিয়া, মোহাম্মদপুর, আদাবর, শ্যামলী, আসাদগেট, বেড়িবাঁধ, ঢাকা উদ্যান, বসিলা, ইউল্যাব ইউনিভার্সিটি এলাকা, বেতার ভবন, নিউরোসায়েন্স হাসপাতাল, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও পাসপোর্ট অফিসসংলগ্ন অঞ্চল। এই বিস্তীর্ণ এলাকায় বসবাস করেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও সম্প্রদায়ের মানুষ।
এই আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৮ হাজার ৭৯১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৯ হাজার ৮১২ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ৯৮ হাজার ৯৭১ জন এবং হিজড়া ভোটার ৮ জন। শিয়া, সুন্নি, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানসহ নানা ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস রয়েছে এখানে। বিশেষ করে মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে প্রায় ৩০ হাজার অবাঙালি ভোটার এবং আশপাশের এলাকায় আরও প্রায় ২০ হাজার বিহারি ভোটার রয়েছেন। নির্বাচনি হিসাব-নিকাশে এই ভোটারদের বড় ফ্যাক্টর হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক নারী ভোটারকে অনেকে এই আসনের ‘ট্রাম্প কার্ড’ বলেও বিবেচনা করছেন।
প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই ভোটের মাঠে সরব বিএনপি মনোনীত জোটের প্রার্থী জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম) সাবেক চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ। ধানের শীষ প্রতীকে তার প্রচার তুলনামূলকভাবে দৃশ্যমান। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে আছেন জামায়াত-নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মো. মামুনুল হক, যার প্রতীক রিকশা। এ ছাড়া আপেল প্রতীকে ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের ফাতেমা আক্তার মুনিয়া, ট্রাক প্রতীকে গণঅধিকার পরিষদের মিজানুর রহমান, মই প্রতীকে বাসদের মো. খালেকুজ্জামান, রকেট প্রতীকে বাংলাদেশ মাইনোরিটি জনতা পার্টির মো. শাহাবুদ্দিন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঘুড়ি প্রতীকে শেখ মো. রবিউল ইসলাম ও কলস প্রতীকে সোহেল রানাও রয়েছেন।
স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ মো. রবিউল ইসলামের ঘুড়ি মার্কা ও বাসদের প্রার্থী মো. খালেকুজ্জামানের মই মার্কার কিছু ব্যানার-ফেস্টুন চোখে পড়লেও অন্য প্রার্থীদের তেমন একটা দেখা যায়নি। এ ছাড়া গত বুধবার নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন হারিকেন প্রতীকের বাংলাদেশ মুসলিম লীগের শাহরিয়ার ইফতেখার।
অতীতের নির্বাচনে ঢাকা-১৩ আসনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের আধিপত্য ছিল। এই আসনে বড় দুই দলের শক্ত ভোট ব্যাংক রয়েছে। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর বাসস্থানও এই এলাকায়। বিএনপির আরও একাধিক সিনিয়র নেতার রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র এই আসন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের নেতা ও খালেদা জিয়ার সাবেক উপদেষ্টা আতাউর রহমান ঢালী এখান থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। মাত্র ২৩ বছর বয়সে সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়া বিএনপি নেতা আহমেদ ইকবাল হাসানও এই এলাকার স্থানীয় নেতা। তাদের মধ্যে অতীতে মনোমালিন্য থাকলেও দল ও জোটের স্বার্থে শেষ পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে। এ অবস্থায় বিএনপির ভোটারদের বড় অংশ মনে করছে, ঐক্য ধরে রাখা গেলে ধানের শীষের বিজয় ঠেকানো কঠিন হবে।
তবে মসজিদ-মাদরাসাপূর্ণ এই আসনে মামুনুল হকের অবস্থানও শক্ত বলে দাবি স্থানীয়দের। তার বাবা প্রখ্যাত আলেম ও শায়খুল হাদিস আজিজুল হক মোহাম্মদপুরে জামিয়া রহমানিয়া আরাবিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং দীর্ঘদিন সেখানে শিক্ষকতা করেছেন। মামুনুল হকও সেখানকার শিক্ষক। ফলে এই এলাকায় তার অনুসারী, ভক্ত ও সাবেক শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ রয়েছে, যা তার অন্যতম শক্তি। জামায়াত-জোটের প্রার্থী হওয়ায় অবাঙালি ভোটের দিকেও তার নজর রয়েছে। তবে অবাঙালিদের বড় অংশ মাজারপন্থি হওয়ায় এবং মামুনুল হকের মাজারবিরোধী অবস্থানের কারণে তিনি তাদের কতটা আস্থা অর্জন করতে পারবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পাশাপাশি জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীক না থাকায় অবাঙালি ভোট বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কাও করছেন তার সমর্থকরা। এসব প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠতে পারলে মামুনুল হকের জয়ের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না তারা। সব মিলিয়ে দুই প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলেই ধারণা।
এলাকার বাসিন্দারা জানান, তাদের প্রধান সমস্যা কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, মাদক ও ছিনতাই। পাশাপাশি চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও ফুটপাথ দখল নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে। এসব সমস্যার সমাধান দিতে প্রার্থীরা কতটা সক্ষম, তা নিয়েও ভোটারদের মধ্যে সংশয় আছে।
মোহাম্মদপুর ইকবাল রোডের বাসিন্দা তাজিমা বেগম বলেন, দিনের বেলাতেই ছিনতাই ও রাহাজানির ঘটনা ঘটে। রাতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। ব্যবসা-বাণিজ্যেও চাঁদাবাজির আতঙ্ক। তিনি বলেন, এবার আমরা পরিবর্তন চাই। যারা সত্যিকারের শান্তি ফিরিয়ে আনবে, সবাইকে সমান চোখে দেখবে, ছিনতাই-চাঁদাবাজি বন্ধ করবে, তাদেরই ভোট দেব।
মোহাম্মদপুরের আরেক বাসিন্দা মো. জহিরের দোকান আছে টাউন হল মার্কেটে। নির্বাচন নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি বেশ হতাশাজনক। তিনি বলেন, বাংলাদেশে নির্বাচন মানেই প্রতারণা। প্রশাসন যার পক্ষে থাকবে, সে-ই জিতবে। এখানে মানুষের ভোটে সরকার হয় না। বরং যারা নির্বাচন আয়োজন করে তাদের ঘোষণাই সব।
টাউন হল মার্কেটের চাল ব্যবসায়ী মো. অহিদুল বলেন, মামুনুল হক এলাকার সন্তান হলেও ববি হাজ্জাজ বহিরাগত। তার দাবি, মামুনুল হকের পরিবার চার দশকের বেশি সময় ধরে এই এলাকায় বসবাস করছে এবং এলাকার প্রতিটি অলিগলি তিনি চেনেন। তাই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হলেও মামুনুল হকই জিতবেন বলে তিনি মনে করেন।
মোহাম্মদপুরের একটি ব্যস্ত এলাকা সাদেক খান রোড। এখানে সাদেক খান কৃষি মার্কেট থেকে শুরু করে রিকশা গ্যারেজ ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সাদেক খান রোড এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রউফ জানান, সেখানে আওয়ামী লীগের সমর্থক বেশি হলেও অনেকেই ভোট দিতে যাবেন না। যারা যাবেন, তাদের বড় অংশ ধানের শীষে ভোট দিতে পারেন বলে তার ধারণা। তার মতে, শেষ পর্যন্ত রিকশা ও ধানের শীষের মধ্যেই লড়াই সীমাবদ্ধ থাকবে।
জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দাদের প্রধান দাবি স্থায়ী পুনর্বাসন। ক্যাম্পের বাসিন্দা মো. শাকিল বলেন, দল আসে দল যায়, আমাদের অসুবিধা দূর হয় না। প্রতিটি দলই নির্বাচনের সময় আমাদের প্রলোভন দেখায়। কিন্তু নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়ার পর আর আমাদের কথা মনে থাকে না। তাই এবার বুঝে-শুনে ভোট দেব।
ক্যাম্পের আরেক বাসিন্দা আবিদ হোসেন বলেন, এখনও সিদ্ধান্ত নিইনি কাকে ভোট দেব। আগে আমরা সবসময় বিএনপিকেই ভোট দিতাম। তারপরে ২০-২৫ বছর ধরে কোনো ভোটই দিইনি। ভোটের আগে ও ভোটের দিন যদি মারামারি লাগে তা হলে মানুষ আতঙ্ক নিয়ে ভোট দিতে যাবে না।
হুমায়ুন রোডের সমাজসেবা কার্যালয়ের সামনে একজন সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, অনেকে মামুনুল হককে এই এলাকার সন্তান বললেও আসলে তিনি এই এলাকার ভোটারই না। ওনার জন্মও এখানে না। ববি হাজ্জাজও এই এলাকার সন্তান না। কিন্তু উনি ধানের শীষের প্রার্থী। আর ধানের শীষ পরিচিত ও জনপ্রিয় মার্কা। ফলে এই আসনে ববি হাজ্জাজের বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি দেখছেন তিনি।
মোহাম্মদপুরের ঐতিহ্যবাহী শিয়া মসজিদ এলাকাটি মূলত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত। এখানের বাসিন্দা সুস্মিতা রানী বলেন, আমরা এবার ভোট দিতে যাব। আবার কবে দিতে পারি, না পারি কে জানে। ভোটের পরিবেশ এখন পর্যন্ত ভালোই দেখছি, ঠিকঠাকই মনে হচ্ছে। বাকিটা ভোটের দিন বোঝা যাবে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত আদাবর ও শেখেরটেক এলাকায় পরিকল্পিত হাউজিং, নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল থাকলেও সেখানকার বাসিন্দারাও পরিবর্তনের কথা বলছেন। আদাবরের বাসিন্দা নুসরাত রীতা বলেন, বিএনপি-আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টিকে তো দেখেছি। এই আসনের হানাহানি, চাঁদাবাজি বন্ধ করতে এবার নতুন কেউ আসুক। এটাই আমি চাই।
শেখেরটেকের বাসিন্দা সম্রাট হোসেন বলেন, কে জিতবে বলা যাচ্ছে না। বাঘে-মহিষে লড়াই হচ্ছে। এখনও সিদ্ধান্ত নিইনি কাকে ভোট দেব। সব বিচার-বিশ্লেষণ করে ভোট দেব। মোহাম্মদপুর এলাকার পশ্চিমে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত বসিলা এবং ঢাকা উদ্যান বর্তমানে দ্রুত বর্ধনশীল আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকা। এটি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের আওতাধীন। সেখানকার বাসিন্দা নিপা আক্তার বলেন, নির্বাচনি প্রচার তেমন চোখে পড়েনি। ধানের শীষ আর রিকশার মধ্যে ভোট হবে। সম্ভবত ধানের শীষই জিতবে।
নির্বাচনি প্রচারের অংশ হিসেবে রিকশা প্রতীকের মামুনুল হক এলাকায় ‘জাগরণী পদযাত্রা’ করছেন। গত ৩০ জানুয়ারি জুমার নামাজের পর মামুনুল হকের নেতৃত্বে শেরেবাংলা নগর ও আদাবর হয়ে মোহাম্মদপুর পর্যন্ত এক বিশাল মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।
দীর্ঘ মিছিল শেষে আয়োজিত পথসভায় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে মামুনুল হক বলেন, রিকশা মার্কার গণজোয়ার দেখে অনেকেরই মাথা খারাপ হতে পারে। তারা নানাভাবে উসকানি দিয়ে আমাদেরও সীমা লঙ্ঘন করতে বাধ্য করতে চাইবে। মনে রাখতে হবে, আমরা দায়িত্বশীল মহল; আমরা কারও উসকানিতে পা দেব না।
ঢাকা-১৩ আসনটিতে জয়লাভের জন্য ববি হাজ্জাজও দিন-রাত এক করে দৌড়াচ্ছেন। মতবিনিময় সভা করছেন, বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছেন তিনি। গত ৩০ জানুয়ারি বিকালে নির্বাচনি প্রচারের অংশ হিসেবে এক বর্ণাঢ্য র্যালির আয়োজন করেন। র্যালিটি মোহাম্মদপুর শিয়া মসজিদ থেকে শুরু হয়ে মনসুরাবাদ ও নবোদয় হাউজিং এলাকা প্রদক্ষিণ করে আবার শিয়া মসজিদের সামনে এসে শেষ হয়।
র্যালি শেষে ববি হাজ্জাজ বলেন, মামুনুল হককে মামুনুল হকের রাজনীতি করতে দিন, আর আমাদের রাজনীতি করতে দিন। আমাদের রাজনীতি হলো এলাকার উন্নয়নের রাজনীতি, দেশ ও জাতির অগ্রগতির রাজনীতি।
এএডি/