নীরবতার আড়ালে ইতিহাস

ফাইয়াজ উদ্দিন স্মরণ ঢাবি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্য থেকে কলা ভবনের মূল গেটের দিকে দুই-তিন মিনিট হাঁটলেই হাতের ডানদিকে দেখা মিলে এক উঁচু সাদা

2026-01-03T05:30:36+00:00
2026-01-03T05:30:36+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
নীরবতার আড়ালে ইতিহাস
ঢাকার গুরুদুয়ারা নানকশাহী
ফাইয়াজ উদ্দিন স্মরণ ঢাবি
প্রকাশ: শনিবার, ৩ জানুয়ারি, ২০২৬, ৫:৩০ এএম 
ঢাকার গুরুদুয়ারা নানকশাহী। ছবি : সংগৃহীত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্য থেকে কলা ভবনের মূল গেটের দিকে দুই-তিন মিনিট হাঁটলেই হাতের ডানদিকে দেখা মিলে এক উঁচু সাদা প্রাচীরের। কৌতূহল নিয়ে ভেতরে ঢুকতেই মনে হয়-  এ যেন ঢাকার ভেতর এক টুকরো পাঞ্জাব। যেখানে প্রতিধ্বনিত হয় মানবতার বাণী। ঢাকা শহরের কোলাহলের ভেতর নীরবে দাঁড়িয়ে আছে এক স্মৃতিধারক গুরুদুয়ারা নানকশাহী যা শিখ ধর্মের একটি উপাসনালয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবন ঘেঁষে এটি অবস্থিত। বাংলাদেশে পাঁচটি গুরুদুয়ারা আছে যার প্রধানতমটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। স্থানটিকে ঘিরে প্রচলিত আছে এক গভীর ধর্মীয় আখ্যানের।

নিয়ম অনুযায়ী এখানে ঢুকতেই সবাইকে গেরুয়া রুমাল দেওয়া হয় যা মাথায় বেঁধে দরবারে প্রবেশ করতে হয়। ভেতরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে বিস্তৃত সবুজ লন। শহরের কোলাহলকে পেছনে ফেলে এই লন যেন দর্শনার্থীকে ধীরে ধীরে নিয়ে যায় এক শান্ত, আধ্যাত্মিক জগতে। লনের বাম পাশে অবস্থিত শিখ রিসার্চ সেন্টার জ্ঞানচর্চা ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের নীরব এক কেন্দ্র, ডানদিকে দাঁড়িয়ে থাকা দোতলা দরবার হল।

সামনে উঁচু করে টাঙানো পতাকা স্ট্যান্ড দূর থেকেই জানান দেয় এটি শিখদের পবিত্র উপাসনালয়। গুরুদুয়ারা নানকশাহী নির্মিত হয়েছে শিখদের নিজস্ব স্থাপত্যরীতিতে। এর নকশায় ধর্মীয় দর্শনের প্রতিফলন স্পষ্ট। উপাসনালয়ের ছাদের ওপর পৃথিবী আকৃতির একটি কাঠামো নির্মিত হয়েছে, যার চারদিকে শোভা পাচ্ছে শিখ ধর্মীয় চিহ্ন ‘খাণ্ডা’। সর্বোচ্চ শিখরে রয়েছে ছাত্রা যা শিখ উপাসনালয়ের চিহ্ন।

উপাসনালয়ের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত একটি প্রশস্ত কক্ষ। এই কক্ষের কেন্দ্রস্থলে কাঠের তৈরি একটি বেদির ওপর স্থাপিত রয়েছে শিখ ধর্মগ্রন্থ গ্রন্থসাহেব। এই পবিত্র স্থানটি পরিচিত ‘শ্রী দরবার সাহিব’ নামে। বেদির সামনেই একটি কাচের বাক্সে যত্নসহকারে সংরক্ষিত রয়েছে নবম শিখ গুরু তেগ বাহাদুর সিংয়ের ব্যবহৃত একজোড়া খড়ম। কক্ষের মেঝেতে পাতা লাল রংয়ের কার্পেটে বসে ভক্তরা মনোযোগ সহকারে গ্রন্থসাহেবের পাঠ শোনেন।

দায়িত্বরতদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গুরু নানকশাহীতে প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা দুবার গ্রন্থসাহেব পাঠ ও প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয়। শুক্রবার এটি যেন এক ভিন্ন চেহারা পায়। শুধু শিখ সম্প্রদায়ের নয়, সব ধর্মের মানুষ ভিড় জমান এখানে। শিখ ধর্ম অসাম্প্রদায়িকতা, মানবসেবা, সহিষ্ণুতা ও ভ্রাতৃত্বে বিশ্বাসী। তাই জাতি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যে কেউ এই প্রার্থনায় অংশগ্রহণ করতে পারে। কেউ এখানে আসেন শান্তি খুঁজতে, কেউ প্রার্থনা করতে আবার কেউ বা কৌতূহল মেটাতে। শুক্রবার দুপুর ১২টা থেকে শুরু হয় সাপ্তাহিক জমায়েত ও প্রার্থনা। পুরোহিত গ্রন্থসাহেব পাঠ ও কীর্তন করেন। গুরুদুয়ারার এই কীর্তন ভক্তদের আকুল করে তোলে। প্রার্থনা শেষে প্রসাদ বিতরণ করা হয়। এখানে প্রাতঃভোজেরও ব্যবস্থা আছে, সে জন্য রয়েছে একটি ‘গুরুকা লঙ্গর’ বা ভোজনালয়। এই ‘গুরুকা লঙ্গর’ শিখ ধর্মের সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধের অন্যতম প্রতীক। এখানে ধনী-গরিব, ধর্ম-বর্ণের কোনো ভেদাভেদ নেই। একই কাতারে বসে সবাই গ্রহণ করেন প্রাতঃভোজ।

কথিত আছে, ষোড়শ শতকে শিখ ধর্মের প্রবর্তক গুরু নানক দেবজি স্বল্প সময়ের জন্য এই স্থানে অবস্থান করেছিলেন। সেই সময় তিনি মানুষের মধ্যে একেশ্বরবাদ, মানবিক সমতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের বাণী ছড়িয়ে দেন। ধর্মীয় আচার-অনুশীলনের পাশাপাশি নৈতিক জীবনবোধের যে শিক্ষা তিনি দিয়েছিলেন, তারই স্মৃতিবাহী হয়ে আছে এই ভূমি।

পরবর্তীকালে শিখ ধর্মের ষষ্ঠ গুরু, গুরু হরগোবিন্দ সিংয়ের সময়কালে (১৫৯৫-১৬৪৪ খ্রি.) ভাইনাথ নামে এক শিখ ধর্মপ্রচারক (মতান্তরে যিনি আলমাস্ত নামে পরিচিত) এই স্থানে আগমন করেন। গুরু নানকের স্মৃতিকে স্থায়ী রূপ দিতে তিনি এখানে একটি গুরুদুয়ারা নির্মাণের উদ্যোগ নেন। দীর্ঘ সময় ধরে চলা সেই নির্মাণকাজ শেষ পর্যন্ত ১৮৩০ সালে সম্পন্ন হয়।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে গুরুদুয়ারাটি অবহেলা ও অযত্নের এক দীর্ঘ পর্ব অতিক্রম করে। তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ইতিহাসের এই নিদর্শন আবারও মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে আসে। ১৯৭১-৭২ সালে জরুরি ভিত্তিতে কিছু মেরামত কাজ করা হয়। এরপর ১৯৮৮-৮৯ সালে ব্যাপক সংস্কারের মাধ্যমে ভবনটিকে নতুনভাবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেসময় গুরুদুয়ারার চারপাশে একটি করিডোর নির্মাণ করা হয়, যা এর স্থাপত্যিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি সুরক্ষাও নিশ্চিত করে।

একসময় গুরুদুয়ারা নানকশাহী ছিল বিস্তৃত ভূসম্পত্তির অধিকারী একটি ধর্মীয় প্রাঙ্গণ। তখনকার দিনে উপাসনালয়টি আজকের মতো জাঁকজমকপূর্ণ না হলেও এর পরিসর ছিল অনেক বড়। উত্তর দিকে ছিল প্রধান প্রবেশদ্বার, দক্ষিণ পাশে একটি কূপ ও সমাধিস্থল, আর পশ্চিম দিকে শান বাঁধানো একটি পুকুর। মূল উপাসনালয়ের পাশাপাশি ভক্তদের জন্য থাকার কক্ষও ছিল। সময়ের ব্যবধানে এসব স্থাপনার আর কোনো চিহ্ন অবশিষ্ট নেই। বর্তমানে সীমিত জায়গার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা গুরুদুয়ারা নানকশাহী একাধিক সংস্কারের মধ্য দিয়ে তার বর্তমান রূপ ধারণ করেছে।

এএডি/


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: