২০২৫ সালের শেষ দিন, নতুন বছরের আগমনের আগে, বেলফাস্টের আকাশ আতশবাজির আলোয় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তবে শহরের রাস্তাগুলো শুধুমাত্র উৎসবের আওয়াজে ভরা ছিল না, ছিল এক গভীর প্রতিবাদও। শহরের নানা প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ একত্র হয়েছিল, ফিলিস্তিনিদের পক্ষে হাঙ্গার স্ট্রাইকে থাকা একদল তরুণ অ্যাকটিভিস্টদের সমর্থন জানাতে। তারা স্লোগান দিচ্ছিল ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ইসরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে।
বেলফাস্ট, একসময় আইরিশ রিপাবলিকানদের আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল, সেই শহরে আজও তার ইতিহাসের ছায়া রেখেছে। ফলস রোড, যেখানে একসময় আইরিশ স্বাধীনতার জন্য লড়াই করা রাজনৈতিক বন্দীদের ছবি ছিল, সেখানে এখন ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রামের ছবিরও স্থান হয়েছে। শহরের দেয়ালগুলো এখন শুধু স্থানীয় আন্দোলনের কাহিনি নয়, বিশ্বের এক গোষ্ঠী মানুষের সংগ্রাম, তাদের দুঃখ-কষ্টের গল্পও বলে, যেমন ফিলিস্তিনের মাটিরক্ষার সংগ্রামের চিহ্ন রয়েছে এ শহরের রাস্তার পরতে পরতে।
নতুন বছরের সন্ধ্যায়, শহরের ঐতিহ্যবাহী প্রতিবাদী দেয়ালগুলো এখন ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থনের চিহ্নে ভরে গেছে। কবি রেফাত আলিরের লেখা, যিনি ২০২৩ সালে ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হন, বেলফাস্টের দেওয়ালে আঁকা হয়েছে। শহরের বিভিন্ন গ্যালারিতে ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে আঁকা হয়েছে ছবি, আর প্রতিটি ছবি যেন এক স্বতন্ত্র প্রতিবাদ।
এই হাঙ্গার স্ট্রাইকাররা, যারা বর্তমানে যুক্তরাজ্যের জেলে রয়েছেন, তাদের একক সিদ্ধান্ত-বিশ্বের যেকোনো অমানবিক পরিস্থিতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে তারা নিজেদের শরীরের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে প্রতিবাদ জানাবে। বেলফাস্টে সেই প্রতিবাদী কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে। একজন স্থানীয় বক্তা, প্যাট্রিসিয়া ম্যাককিওন বলেছিলেন, এটি এমন একটি শহর, যেখানে কখনও আমাদের কণ্ঠকে স্তব্ধ করা সম্ভব হবে না। প্রতিবাদের অধিকার, মানুষের অধিকার, সেটা কখনো দমন করা যাবে না। আজ এই তরুণরা তাদের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে, তাদের সংকল্পের কথা জানাতে লড়াই করছেন। আর এই ফিলিস্তিনের জনগণের প্রতি আমাদের সহানুভূতি, আমাদের সমর্থন, সেটাই তো মানবিক দায়িত্ব, এটাই তো আমাদের তাদের প্রতি করণীয় হওয়া উচিত।
বেলফাস্টের এই প্রতিবাদ স্পষ্টভাবে বলে, যে যুদ্ধ কেবল ফিলিস্তিনের জনগণের একার নয়, যে সংগ্রাম কেবল আইরিশদের নয়-এটা মানবতার সংগ্রাম। যেখানে শোষিতদের জন্য, নিপীড়িতদের জন্য, স্বাধীনতার জন্য লড়াই করা হয়। বেলফাস্ট সেই শহর, যেখানে প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি চিত্র, প্রতিটি স্লোগান আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানবাধিকার, ন্যায্যতা আর স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম কতোটা জরুরি।
বেলফাস্টে হাঙ্গার স্ট্রাইকের প্রতিবাদ
বেলফাস্টে প্যালেস্টাইন অ্যাকশন গ্রুপের সদস্যদের হাঙ্গার স্ট্রাইক একটি আন্তর্জাতিক আন্দোলনের অংশ হয়ে উঠেছে, যা ব্রিটিশ সরকারের প্রতি চাপ সৃষ্টি করছে। এই আন্দোলনে চারজন বন্দির স্বাস্থ্য ক্রমশ খারাপ হয়ে পড়ছে এবং তারা ফিলিস্তিনি জনগণের মুক্তি চেয়ে হাঙ্গার স্ট্রাইক শুরু করেছেন। এই বন্দিরা প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের সাথে সম্পর্কিত এবং তারা এখনও বিচার প্রক্রিয়ায় রয়েছে, তবে ক্যাম্পেইনারদের দাবি, বিচার হতে দেরি হওয়া এবং সেই সাথে বিচার চলতে থাকলে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে তারা জেলখানায় আটক থাকবে। আইনি পদক্ষেপের সব পথ শেষ হয়ে যাওয়ায়, সমর্থকরা বলছেন, হাঙ্গার স্ট্রাইক এখন তাদের শেষ ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই বন্দিরা অভিযুক্ত হয়েছেন ব্রিস্টলের ফিলটনে এলবিট সিস্টেমসের একটি শাখায় ভাঙচুর এবং অক্সফোর্ডশায়ারের রয়্যাল এয়ার ফোর্স ঘাঁটিতে দুটি সামরিক বিমানকে লাল রঙের পেইন্ট দিয়ে আঁকানোর জন্য। তবে তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে চুরির এবং অশান্তির অভিযোগ আনা হয়েছে, যেগুলোও তারা নাকচ করেছেন।
বন্দিরা তাদের মুক্তি, চিঠিপত্র এবং পাঠ্যপুস্তক নিয়ে হস্তক্ষেপ বন্ধ করার দাবি করছেন, সেই সঙ্গে একটি সঠিক বিচার প্রক্রিয়া এবং প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে নিষিদ্ধ করার আইনকে 'অপসারণ' করার দাবি জানিয়েছেন। জুলাই মাসে, ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বে প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে একটি বিতর্কিত এন্টি-টেররিজম আইন এর অধীনে নিষিদ্ধ করা হয়।
হেবা মুরাইসি এখন ৬১ দিন ধরে একেবারে অনাহারে আছেন। টেউটা হক্সা ৫৫ দিন, কামরান আহমেদ ৫৪ দিন, এবং লুই চিয়ারামেল্লো ৪১ দিন ধরে খাবার গ্রহণ করছেন না। হক্সা এবং আহমেদ ইতোমধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ক্যাম্পেইনাররা বলছেন, এটি ১৯৮১ সালের পর ব্রিটেনে সবচেয়ে বড় হাঙ্গার স্ট্রাইকার, যা তারা বিশেষভাবে আইরিশ হাঙ্গার স্ট্রাইকের দ্বারা অনুপ্রাণিত।
১৯৮১ সালের আইরিশ হাঙ্গার স্ট্রাইক
১৯৮১ সালে, আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি (আইআরএ) এবং অন্যান্য রিপাবলিকান বন্দিরা উত্তর আয়ারল্যান্ডে হাঙ্গার স্ট্রাইক শুরু করেছিলেন, তাদের রাজনৈতিক মর্যাদা পুনরুদ্ধারের দাবিতে। সেই স্ট্রাইকে ১০ জন বন্দি মারা যান, যার মধ্যে ছিলেন তাদের নেতা ববি স্যান্ডস, যিনি স্ট্রাইকের সময় ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন, তবে পেছনে সরকারের আচরণ বদলাতে শুরু করেছিল এবং শেষ পর্যন্ত জনমত তার বিরুদ্ধে চলে যায়।
এই আন্দোলনে ২৯ বছর বয়সী মার্টিন হারসন ৪৬তম দিনে মারা যান। এরপর রেমন্ড ম্যাকক্রিস, ফ্রান্সিস হিউজ, মাইকেল ডেভিন এবং জো ম্যাকডোনেল মারা যান ৫৯ থেকে ৬১ দিনের মধ্যে। ববি স্যান্ডস মারা যান ৬৬ দিন পর।
স্যু পেন্টেল-এর স্মৃতি
স্যু পেন্টেল, জুডস ফর প্যালেস্টাইন আয়ারল্যান্ড এর সদস্য, সেই সময়টিকে এখনো স্পষ্টভাবে মনে করেন। তিনি বলেন, আমি তখন হাঙ্গার স্ট্রাইকের সময় এখানে ছিলাম। আমি এই হাঙ্গার স্ট্রাইকগুলোর মধ্য দিয়ে গিয়েছি, মিছিল করেছি, প্রতিবাদ জানিয়েছি, সভা-সমাবেশে অংশ নিয়েছি, তাই আমি মনে করি, ব্রিটিশ সরকারের নিষ্ঠুরতা-যেভাবে তারা ১০ জন হাঙ্গার স্ট্রাইকারকে মরতে দিল-তা এখনো আমাদের মনে গেঁথে রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ববি স্যান্ডসের কথা মনে পড়ে, আমাদের প্রতিশোধ হবে আমাদের সন্তানদের হাসির মধ্যে। আমরা এখানেই আমাদের পরিবার গড়ে তুলেছি এবং এই নতুন প্রজন্মেরই অংশ যারা এখন ফিলিস্তিনিদের পক্ষে একাত্মতা প্রকাশ করছে।
একটি ঐতিহাসিক লড়াইয়ের পুনরাবৃত্তি
আজ, বেলফাস্টের এই হাঙ্গার স্ট্রাইক শুধু একটি আইনি লড়াই বা রাজনৈতিক আন্দোলন নয়, এটি একটি দীর্ঘ ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। যেখানে ফিলিস্তিনিদের মুক্তি, মানবাধিকার এবং ন্যায্যতার দাবিতে প্রতিবাদ করা হচ্ছে। ইতিহাসের এই চিহ্নগুলি আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, একদিনের ক্ষুদ্র প্রতিরোধও হতে পারে একটি বৃহৎ পরিবর্তনের সূচনা।
‘যদি এটি চলতে থাকে, কিছু লোক মারা যাবে’
প্যাট শিহান, ১৯৮১ সালের হাঙ্গার স্ট্রাইকের একজন সদস্য, বেলফাস্টের এক দেয়ালের নিচে দাঁড়িয়ে ইতিহাসের ভয়াবহ পুনরাবৃত্তি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। সেই দেয়ালটিতে ছবির মধ্যে রয়েছে ববি স্যান্ডস-এর মুখ, যিনি একই বছর হাঙ্গার স্ট্রাইক চলাকালীন মারা যান।
তিনি বলেন, আমি ১৯৮১ সালে দীর্ঘতম সময় হাঙ্গার স্ট্রাইকে ছিলাম, যখন এ স্ট্রাইক বন্ধ করা হয় ৩ অক্টোবর। সুতরাং তত্ত্বগতভাবে আমি পরবর্তী ব্যক্তি হতে পারতাম, যিনি মারা যেতেন।
এ সময়, শিহান জানান, তার লিভার (যকৃত) কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিল, দৃষ্টি শক্তি হারিয়ে গিয়েছিল এবং তিনি অবিরত পিত্তবমি করছিলেন।
এক দেশ এক ইতিহাস, এক লড়াই
প্যাট শিহানের কথায়, ফিলিস্তিন ও আয়ারল্যান্ডের লড়াই একে অপরের সাথে মিল রেখে চলে। গণহত্যা, উপনিবেশিক শোষণ এবং রাজনৈতিক বন্দিত্বের দীর্ঘ ইতিহাসের কারণে আইরিশ জনগণ ফিলিস্তিনিদের যন্ত্রণা গভীরভাবে অনুভব করতে পারে। বেলফাস্টের এই প্রতিবাদ এবং ইতিহাসের গভীরে আছড়ে পড়া প্রতিবাদী গর্জন প্রমাণ করে যে, এককভাবে একটি জাতির সংগ্রাম একে অপরকে সমর্থন দিতে পারে।
ফিলিস্তিনিদের পক্ষে কার্যকরী পদক্ষেপ
আয়ারল্যান্ডে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতি কেবল কথায় সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা ক্রমশ রাজনৈতিক পদক্ষেপে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ সালে আয়ারল্যান্ড আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে যোগ দিয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গাজার গণহত্যার অভিযোগে মামলা করেছে, যদিও ইসরায়েল এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এছাড়াও, আয়ারল্যান্ডের সরকার ইসরায়েলি বন্ডের বিক্রি সীমিত করার জন্য পদক্ষেপ নিয়েছে এবং ইউরোভিশন সঙ্গীত প্রতিযোগিতা বয়কট করেছে ইসরায়েলের অংশগ্রহণের প্রতিবাদে। আয়ারল্যান্ডের জাতীয় ফুটবল দলও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণে নিষিদ্ধ করার দাবি উঠেছে।
গাজার গণহত্যা এবং বেলফাস্টের প্রতিবাদ
গাজার গণহত্যা অনেক সময় পুরনো ধর্মীয় ও সেক্টেরিয়ান বিভাজনের মাধ্যমে নতুন করে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে বেলফাস্টের রাস্তায় প্রতিবাদীরা দৃঢ়ভাবে দাবি করছেন যে, তাদের সমর্থন কোনো জাতীয় পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি মানবতার প্রতি তাদের একটি মৌলিক দায়বদ্ধতা।
একাত্মতার অসীম শক্তি
এই প্রতিবাদী কর্মসূচির মাধ্যমে, বেলফাস্টে যারা একাত্মতা প্রকাশ করছেন, তারা বুঝিয়ে দিচ্ছেন যে, জাতীয় পরিচয় এবং ধর্মীয় বিভাজন সত্ত্বেও, গাজার জনগণের প্রতি সহানুভূতির কোনো সীমা নেই। তাদের প্রতিবাদ শুধুমাত্র ফিলিস্তিনের জনগণের জন্য নয়, বরং পৃথিবীজুড়ে মানবাধিকার ও ন্যায্যতার দাবিতে একটি সংকটময় মুহূর্তে এক অন্য ধরনের প্রতিবাদ।
বেলফাস্টের রাস্তায় দাঁড়িয়ে, যেখানে বিভিন্ন ধর্ম, জাতি এবং রাজনৈতিক অবস্থান থেকে মানুষ এক হয়ে প্রতিবাদ করছেন, সেখানে এটি স্পষ্ট যে, মানবতার প্রতি সম্মান এবং সমর্থন একান্তভাবে প্রাধান্য পাচ্ছে।
/ইউএমএইচ