মার্কিন মুল্লুকের চোখ পড়েছে ভেনেজুয়েলার তেলে। ক্ষমতা নিতেই ভেনেজুয়েলায় আগ্রাসন চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদ্রকসম্রাট মাদুরোকে গ্রেফতারের পর এমনসব গুঞ্জনে সয়লাব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। তবে নেপথ্যের মূল ঘটনা আসলে কী? কেন ভেনেজুয়েলায় হামলা চালালো যুক্তরাষ্ট্র, কী স্বার্থই বা আছে ট্রাম্পের? এসব প্রশ্নেই এখন ঘোলাটে হচ্ছে সমারঙ্গন।
শনিবার (৩ ডিসেম্বর) সূর্য ওঠার আগেই ভেনেজুয়েলার আকাশে দেখা দেয় আগুণের ঝলকানি, গোটে দেশে শুরু হয় যুদ্ধের দামামা। রাজধানী কারাকাস থেকে শুরু করে মিরান্ডা ও আরাগুয়া, প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পয়েন্টে বৃষ্টির মতো ঝরতে থাকে মার্কিন মিসাইল।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, অন্তত ৭টি জোরালো বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে গোটা শহর। এর পরপরই দক্ষিণ কারাকাসের প্রধান সামরিক ঘাঁটিসহ বিস্তীর্ণ এলাকা ডুবে যায় ঘোর অন্ধকার, অনিশ্চয়তা আর ধোঁয়াশায়।
ধোঁয়াশা কাটে যখন খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পই তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হুঙ্কার ছাড়েন। ট্রাম্পের দাবি, এক বিশেষ কমান্ডো অভিযানে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে তাদের নিজ বাসভবন থেকেই আটক করে অজ্ঞাত স্থানে সরিয়ে নিয়েছে মার্কিন বাহিনী। ট্রাম্প একে মাদক পাচার ও অবৈধ অভিবাসন দমনের মিশন হিসেবে তুলে ধরলেও, বিশ্লেষকরা দেখছেন ভিন্ন কিছু। তবে রহস্যের জন্ম দিয়েছে পেন্টাগন; হোয়াইট হাউস অভিযানের দাবি করলেও প্রতিরক্ষা দপ্তর এখনো বজায় রেখেছে গভীর নীরবতা।
সেসব আলোচনার বাইরে প্রশ্ন এসেছে, মাদকই কি নেপথ্যের একমাত্র কারণ? নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে ‘কালো সোনা’র মোহ? বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অভিযানের গভীরে তাকালে বোঝা যায়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ কেবল মাদক নির্মূল নয়, বরং এটি এক বৃহত্তর ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ মিশনের অংশ। ভেনেজুয়েলার বিশালাকার খনিজ সম্পদকে স্বৈরাচারী মাদুরো সরকারের অপশাসন থেকে মুক্ত করে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানোই ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য। ১৮২৩ সালের ঐতিহাসিক ‘মনরো নীতি’র আধুনিক প্রয়োগের মাধ্যমে ট্রাম্প স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, লাতিন আমেরিকায় চীন, রাশিয়া কিংবা ইরানের মতো বহিঃশক্তির কোনো স্থান নেই। ট্রাম্পের এই কৌশলগত দূরদর্শিতার অর্থ হলো, ভেনেজুয়েলার সম্পদকে কাজে লাগিয়ে একদিকে যেমন মাদুরোর মতো শাসককে হটানো, অন্যদিকে পুরো পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন আধিপত্য ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা।
মূলত, লাতিন আমেরিকাকে চীন ও রাশিয়ার মতো বহিঃশক্তির প্রভাবমুক্ত রাখতেই ট্রাম্পের এই কঠোর অবস্থান। মাদুরোর অপশাসন হটিয়ে ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদকে বৈশ্বিক বাজারের জন্য উন্মুক্ত করা এবং আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এই অভিযানের আসল সাফল্য। ট্রাম্পের এই কৌশলী চালের মাধ্যমে পুরো পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন আধিপত্য এখন অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সুসংহত।
মাদুরোর পতনের মধ্য দিয়ে ভেনেজুয়েলায় একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে স্থিতিশীলতা ফেরানোই এখন ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য। কারাকাসের এই যুদ্ধাবস্থা হয়তো সাময়িক, কিন্তু ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির এই বিজয় দীর্ঘমেয়াদে বদলে দেবে পুরো অঞ্চলের ভূ-রাজনীতি। এখন শুধু দেখার অপেক্ষা, ট্রাম্পের হাত ধরে কতটা দ্রুত সমৃদ্ধির পথে ফেরে খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ এই দেশটি।
সময়ের আলো/ এসকে/ এসআই/