ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকালাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে গ্রেফতার করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ডেলটা ফোর্স। আজ শনিবার ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসসহ অন্যান্য জায়গায় ব্যাপক হামলা চালিয়ে তাদের আটক করে বিমানে দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। মাদুরোকে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে এ পর্যন্ত তিন রাষ্ট্রপ্রধানকে গ্রেফতারের নজির স্থাপন করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
নিকালাস মাদুরোকে আটকের খবরে আরও একবার বিষ্মিত হলো বিশ্ব। এর আগে দায়িত্বরত পানামার প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল নোরিয়েগা ও ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে গ্রেফতারের নজির দেখিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। এই দুই রাষ্ট্রপ্রধানের একজন মার্কিন আইনে দোষী সাব্যস্ত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারে মারা যান, আরেকজন নিজ দেশের আইনে দোষী সাব্যস্ত হয়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হন। এখন বিশ্বমহলে প্রশ্ন উঠছে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোর কপালেও কী একই ভাগ্য অপেক্ষা করছে?
পানামায় হামলা চালিয়ে নোরিয়েগাকে আটক
তখন ১৯৮৯ সাল, লাতিন আমেরিকার দেশ পানামার প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল নোরিয়েগা। সেসময় দেশটিতে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রে আটক করে নিয়ে যায় দেশটির প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকে।
পানামায় থাকা মার্কিনিদের নিরাপত্তার অজুহাতে দেশটিতে হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। হামলার আগে ১৯৮৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র মিয়ামির একটি আদালতে ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকে মাদক চোরাচালানে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। যেমনটি করা হয়েছে ভেনেজুয়েলার মাদুরোর ক্ষেত্রেও।
ম্যানুয়েল নোরিয়েগা পানামার ক্ষমতায় আসেন ১৯৮৫ সালে। পেশায় তিনি ছিলেন একজন সেনা কর্মকর্তা। ওই সময় নোরিয়েগা প্রেসিডেন্ট আরদিতো বারলেত্তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন। তিনি ১৯৮৯ সালের নির্বাচন বাতিল করেন এবং পানামায় যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী যে মনোভাব ছিল সেটিকে সমর্থন জানান। এরপরই মূলত নোরিয়েগাকে আটক করতে পানামায় হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র।
পানামার প্রেসিডেন্টকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ২০১০ সাল পর্যন্ত কারাগারে বন্দি ছিলেন তিনি। এরপর আরেকটি মামলায় বিচারের মুখোমুখি করতে তাকে ফ্রান্সে পাঠানো হয়। কিন্তু এক বছর পর ফ্রান্স তাকে পানামায় ফেরত পাঠায়। ২০১৭ সালে পানামার কারাগারে তার মৃত্যু হয়।
ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের ভাগ্যে কী জুটেছিল?
২০০৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা। এর ৯ মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে হামলা চালায়। মূলত ইরাকের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র আছে এমন অজুহাতে দেশটিতে সেনা পাঠায় যুক্তরাষ্ট্র।
পানামার প্রেসিডেন্টের মতো সাদ্দাম হোসেনও এক সময় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ছিলেন। বিশেষ করে ১৯৮০ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়। ওই যুদ্ধে প্রায় ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।
কোনো প্রমাণ ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র এক সময় দাবি করতে থাকে সাদ্দাম হোসেনের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র আছে। এছাড়া আল-কায়েদাকে তিনি সহায়তা করেন এমন অভিযোগও তোলে তারা। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের হাতে কোনো প্রমাণ ছিল না।
সাদ্দাম হোসেনকে ইরাকের তিকরিত শহরের একটি গুহা থেকে আটক করে মার্কিন সেনারা।
তাকে ইরাকের একটি আদালতে বিচারের মুখোমুখি করা হয় এবং মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এরপর ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ফাঁসিতে ঝোলানো হয় সাদ্দাম হোসেনকে।
হুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজকে আটক
কিছু পর্যবেক্ষক ও পরামর্শকের মত হলো, হন্ডুরাসের হার্নান্দেজের ঘটনাটি প্রমাণ করে যে এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছু না।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন এজেন্ট এবং হন্ডুরাস বাহিনীর একটি যৌথ অভিযানে টেগুসিগালপায় নিজ বাড়ি থেকে আটক করা হয়েছিল হার্নান্দেজকে। তাও তার দেশের রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়ার মাত্র কয়েক দিন পরে।
এরপর এপ্রিলে দুর্নীতি এবং অবৈধ মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগে তাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ করা হয়েছিল এবং একই বছরের জুনে তাকে ৪৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
যাহোক, হার্নান্দেজকে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ১ ডিসেম্বর বিশেষ ক্ষমতাবলে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন।
এর কয়েকদিন পরে, হন্ডুরাসের শীর্ষ প্রসিকিউটর হার্নান্দেজের জন্য একটি আন্তর্জাতিক গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। এ ঘটনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার কয়েক দিন পরে সাবেক এই নেতাকে ঘিরে আইনি ও রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও তীব্র আকার পায়।
মাদুরোর কী হবে?
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে ‘মাদক-সন্ত্রাসবাদ, কোকেন আমদানি, মেশিনগান ও ধ্বংসাত্মক ডিভাইস রাখা এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মেশিনগান ও ধ্বংসাত্মক ডিভাইস রাখার ষড়যন্ত্রের’ অভিযোগ আনা হয়েছে। তকে শিগগিরই আদালতে আমেরিকান বিচারের আওতায় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো একজন অপরাধী।
আজ শনিবার সকালে ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর সহযোগিতায় গ্রেফতার করা হয়েছে। পরে এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে।
মাদুরোকে গ্রেফতারের পর যুক্তরাষ্ট্রের ইউটাহ অঙ্গরাজ্যের রিপাবলিকান দলের সিনেটর মাইক লি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ লিখেছেন, রুবিও আমাকে জানিয়েছেন, মার্কিন বাহিনী নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেফতার করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ফৌজদারি অপরাধের মামলায় তার বিচার করা হবে। আজ রাতে আমরা যে সামরিক অভিযান দেখেছি, তা মূলত এই গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকর করতে চালানো হয়েছিল।
সূত্র : বিবিসি, সিএনএন, আলজাজিরা
সময়ের আলো/ এসকে/