এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহে বাজারে যে ঘাটতি দেখা দিয়েছে তা শিগগিরই কমছে না। জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে সরবরাহ কিছুটা বাড়তে পারে। ফলে চলতি মাসজুড়ে সিলিন্ডার কিনতে ভোক্তার পকেট থেকে বেশি টাকা বের হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর কারণ হিসেবে এলপিজি ব্যবসায়ীরা বলছেন, চাহিদার চেয়ে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। তারা যে সোর্স থেকে এলপিজি কিনতেন সেখানে সেভাবে পাওয়া যাচ্ছে না, অন্যদিকে এলপিজি পাওয়া গেলেও তা আনার জন্য জাহাজও সহজলভ্য নয়।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বলছে, প্রতি শীতে এলপিজির চাহিদা ও দাম কিছুটা বাড়ে। নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি করা অপরাধ। সেটা ঠেকাতে ভোক্তা অধিকার অভিযান পরিচালনা করছে। তারা নিজেরাও চেষ্টা করবে।
বিইআরসির একার পক্ষে সারা দেশ মনিটরিং করা সম্ভব নয় বলেও উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। ভোক্তা অধিকার বলছে, তারা স্ব-উদ্যোগে সারা দেশে অভিযান পরিচালনা করছেন। আদালত থেকে তাদের কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। বিইআরসিও তাদের কিছু জানায়নি। বিইআরসি শক্ত না হওয়ায় ভোক্তারা নির্ধারিত দামে এলপিজি পাচ্ছে না।
প্রতি মাসে আন্তর্জাতিক বাজারের দরের সঙ্গে সমন্বয় করে দেশে পেট্রোলিয়ামজাত জ্বালানি তেল ও এলপিজির দাম নির্ধারণ করা হয়। জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করে জ্বালানি বিভাগ আর এলপিজির দাম নির্ধারণ করে বিইআরসি। তবে জ্বালানি তেল বাজারজাত করে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা। বিপরীতে এলপিজির বাজার প্রায় পুরোপুরি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের দখলে রয়েছে। জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে নির্ধারিত দামে বিক্রি নিশ্চিত হলেও এলপিজির খুচরা বাজার চলে পুরোপুরি নিজস্ব নিয়মে। বাস্তবে নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রতিটি ১২ কেজির সিলিন্ডার ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হওয়াই যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। গত দুই সপ্তাহে এই ব্যবধান আরও বেড়েছে। বর্তমানে নির্ধারিত দামের চেয়ে ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা বেশি খরচ করতে হচ্ছে ভোক্তাকে। আবার কোথাও কোথাও এলপিজি মিলছেই না। অনেককেই হোটেল থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন গ্রাহকরা। অনেকে বাধ্য হয়ে বাড়তি খরচ করে ইলেকট্রিক চুলা কিনে রান্নার কাজ সারছেন।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশ সাধারণত ওমান, কাতার, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এলপিজি আমদানি করে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র এলপিজি পরিবহনকারী কয়েকটি জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় পরিবহন সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে কিছু কোম্পানি এলপিজি আমদানি করতে পারছে না, যা বাজারে ঘাটতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা চলতি মাসের শেষ ভাগে এই সংকট কাটার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, চলতি মাসে সংকট পুরোপুরি কাটবে না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিইআরসির ম্যাজিস্ট্রেট আছে, ফোর্স আছে, কিন্তু তারা কোনো দায়িত্ব নিতে চান না। বাজারে বেশি দামে বিক্রি হলেও তাদের গা-ছাড়া ভাব। তারা হাত গুটিয়ে বসে আছে। যেন মূল্য নির্ধারণ করাই তাদের কাজ। আর কোনো কাজ নেই।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক ফারুক আহম্মেদ সময়ের আলোকে বলেন, আমদানি কম হচ্ছে। আমাদের চাহিদা ১ লাখ ৩০ হাজার সিলিন্ডার। কিন্তু চাহিদার চেয়ে ৩০ শতাংশ কম আমদানি হচ্ছে। এই সুযোগে মজুদকারীরা মজুদ করে বেশি দামে বিক্রি করছে। আমরা কয়েকটি মজুদকারীর গোডাউনে অভিযান চালিয়েছি সিলগালা করা হয়েছে। রোববার শুনানি আছে। আমাদের সীমিত রিসোর্স দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
তিনি বলেন, বিইআরসির কাছে আমদানিকারকদের লাইসেন্স আছে। তারা কিছু ডিলারশিপ বাতিল করুক। কিছু মামলা করুন, কিছু গ্রেফতার করুক তা হলেই তো হয়ে যায়। গ্রেফতার করা মামলা করার ক্ষমতা তো আমাদের নেই। রেগুলেটরি বডিকে শক্ত হতে হবে। তা হলে বাজার ভোক্তাদের পক্ষে চলে আসবে।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ সময়ের আলোকে বলেন, অ্যাসোসিয়েশন বলছে, বাজারে এলপিজির চাহিদা দেড় লাখ টন। বাজারে এলপিজি সিলিন্ডারের ঘাটতি আছে। ডিসেম্বরে আমদানি কম হয়েছে। জানুয়ারিতেই এই সংকট কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি বলেন, সংকট হয়েছে মূলত জাহাজের অভাবে। গত ১৫ দিন ধরে এই সংকট চলছে। যুক্তরাষ্ট্র ২৯টি জাহাজকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে, সেগুলো দিয়ে এলপিজি আসত। এটার রিপ্লেস হতে সময় লাগছে। ১ থেকে ২ সপ্তাহের মধ্যে সমাধান হয়ে যাবে।
বিইআরসি চেয়ারম্যান বলেন, রেডি থাকলেও জাহাজের অভাবে এলপিজি পাঠাতে পারছে না। আবার যেই জাহাজ পাওয়া যাচ্ছে সেগুলোর ভাড়াও প্রায় দ্বিগুণ। ব্যবসায়ীরা চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, শীতে এলপিজির চাহিদা বাড়ে। প্রতি বছর এই সময়ে ইউরোপেও চাহিদা বাড়ে। এই সময়ে এলপিজির দাম একটু একটু বাড়তে থাকে।
জালাল আহমেদ বলেন, নির্ধারিত দামে যেন ভোক্তারা কিনতে পারে সে জন্য ভোক্তা অধিকার অভিযান পরিচালনা করছে। তাদের সঙ্গে কথা বলব। সকাল থেকে জেলাগুলোর সঙ্গে কথা বলব। অ্যাসোসিয়েশন বলছে প্রডিউসাররা নির্ধারিত দামে বিক্রি করছে। কিন্তু ডিস্ট্রিবিউটররা বলছে, তারা নির্ধারিত দামে পাচ্ছে না। এই বিষয়টাও চেক করতে হবে। টাকাতে ব্যাংকে লেনদেন হচ্ছে। সেটাও আমরা দেখার চেষ্টা করব।
এলপিজি বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকদের সমিতি লোয়াবের (এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের) সহ-সভাপতি হুমায়ুন রশিদ বলেন, চাহিদার চেয়ে বাজারে এলপিজির ঘাটতি রয়েছে। আমাদের মূল সমস্যা দুটি একদিকে সোর্স থেকে এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না, অন্যদিকে জাহাজও মিলছে না।
তিনি জানান, বিকল্প উৎস থেকে এলপিজি আনার পাশাপাশি জাহাজ খোঁজার চেষ্টাও চলছে।
তার আশা, চলতি মাসের মধ্যেই পরিস্থিতির উন্নতি হবে।