প্রকাশ: সোমবার, ৫ জানুয়ারি, ২০২৬, ৩:২২ এএম (ভিজিট : ১৮০)
সংগৃহীত ছবিভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান এবং প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি ‘ব্যাড নেইবার’ নীতি এবং মনরো ডকট্রিনের পুনরায় প্রয়োগের প্রকাশ্য রূপ, যা পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন আধিপত্যকে পুনঃস্থাপন করছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্প ‘মনরো মতবাদ’কে নতুন করে ‘ডনরো মতবাদ’ নামে প্রতিষ্ঠিত করতে চাচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ লাতিন আমেরিকার জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক তিয়াগো রোজেরো দ্য গার্ডিয়ানে লিখেছেন ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের বোমাবর্ষণ ও প্রেসিডেন্টকে আটক করার ঘটনা দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকায় দুই শতাব্দীর মার্কিন হস্তক্ষেপের ধারাবাহিকতা। কিন্তু এটি নজিরবিহীন কারণ এটি প্রথম সরাসরি দক্ষিণ আমেরিকান রাষ্ট্রে হামলা।
আলজাজিরার বিশ্লেষক রাফায়েল সাভক্কো গার্সিয়া মন্তব্য করেছেন যদি যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রে হঠাৎ হামলা চালাতে পারে তবে আন্তর্জাতিক আইন অর্থহীন হয়ে যাবে। ভেনেজুয়েলার ঘটনা একটি সতর্কবার্তা। আর জেফ্রি সোমার্স কাউন্টারপাঞ্চে লিখেছেন এটি মনরো ডকট্রিনের নতুন যুগের প্রকাশ। মার্কিন আধিপত্য এবং অঞ্চলীয় প্রভাব প্রকাশ্য প্রয়োগ করা হচ্ছে।
ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের অভিযান : ২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে মার্কিন বিশেষ বাহিনী প্রবেশ করে। তাদের লক্ষ্য ছিল প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার পরিবার। ট্রাম্প সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আমেরিকার আধিপত্য পশ্চিম গোলার্ধে আর কখনো প্রশ্নাতীত হবে না। ভেনেজুয়েলার সঠিক ট্রানজিশন না হওয়া পর্যন্ত আমরা দেশ পরিচালনা করব।
প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে অভিযান চলাকালে প্রায় ২০০-৫০০ সাধারণ নাগরিক এবং প্রায় ৩০০ ভেনেজুয়েলার সৈন্য নিহত হয়।
রোজেরো লিখেছেন, এটি কেবল সামরিক হস্তক্ষেপ নয় এটি রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের একটি সরাসরি প্রমাণ। এতদিন যুক্তরাষ্ট্র গোপন কৌশল ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ব্যবহার করলেও এবার আড়াল সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
গার্সিয়া সতর্ক করে বলেন, মাদুরোর আটক দেখাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পশ্চিম গোলার্ধে সার্বভৌমত্বের কোনো সীমা নেই। এটি ভবিষ্যতে লাতিন আমেরিকান দেশগুলোর জন্য একটি শীতল বার্তা।
মনরো ডকট্রিন ইতিহাস ও প্রয়োগ : মনরো ডকট্রিন ১৮২৩ সালে প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো দ্বারা ঘোষণা করা হয়। যার মূল নীতি ছিল পশ্চিম গোলার্ধে ইউরোপীয় শক্তি হস্তক্ষেপ করবে না এবং যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে অঞ্চলীয় প্রভাব বলয় হিসেবে দেখাবে। এটি ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ প্রতিরোধের উদ্দেশ্যেই তৈরি হয়েছিল কিন্তু পরবর্তী সময়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের যুক্তি হয়ে ওঠে।
বিশ্লেষক সোমার্স লিখেছেন, মনরো ডকট্রিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্মলগ্ন থেকে চলতে থাকা দখল ও সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ধারাবাহিকতা। ১৮২৩ সালে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল পুরো পশ্চিম গোলার্ধ যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বলয়ের অংশ।
রোজেরো মন্তব্য করেছেন, ভেনেজুয়েলার ঘটনা দেখাচ্ছে, মনরো ডকট্রিনের আধুনিক পুনঃপ্রকাশ ঘটেছে। ৩ জানুয়ারি মাদুরোকে সরাসরি আটক করা হয়েছে। এটি মনরো নীতির প্রকাশ্য রূপ।
নগ্ন সাম্রাজ্যবাদ ও যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস : ‘নগ্ন সাম্রাজ্যবাদ’ হলো সেই অবস্থার ধারণা যেখানে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র সরাসরি সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব প্রয়োগ করে কোনো নৈতিক আচ্ছাদন ছাড়া। এটি সাধারণত অর্থনৈতিক প্রভাব, কূটনৈতিক চাপ এবং সামরিক হুমকির সমন্বয়ে পরিচালিত হয়।
গার্সিয়া লিখেছেন, ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ শতাব্দী প্রাচীন সেই হস্তক্ষেপের ধারাবাহিকতা, যা লাতিন আমেরিকাকে বারবার ক্ষতবিক্ষত করেছে। এটি শুধু এক দেশ নয়, এটি একটি ভূ-রাজনৈতিক বার্তা।
পূর্ববর্তী হস্তক্ষেপের উদাহরণ : ১৮৪৭-৪৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র মেক্সিকোর রাজধানী দখল করে, ৫৫ শতাংশ এলাকা অধিকার করে। ১৮৯৮-১৯০২ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় মার্কিন সাহায্য করে পরবর্তী সময়ে দখল করে। ১৯১৫-১৯৩৪ সালে হাইতিতে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার অজুহাতে মার্কিন বাহিনী দেশ দখল করে। ১৯৮৯ সালে পানামায় ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে আটক করতে পূর্ণ সামরিক অভিযান করে যুক্তরাষ্ট। ১৯৬৪ সালে ব্রাজিলে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জোয়াও গোলার্টের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিল দেশটি। ১৯৭৩ সালে সিআইএ সামরিক অভ্যুত্থান সমর্থন করে, অগুস্তো পিনোচেতকে ক্ষমতায় আনা হয়।
ব্যাড নেইবার নীতি : ‘ব্যাড নেইবার’ নীতি হলো সেই সময়ের ধারণা যেখানে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবেশী দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে, প্রয়োজনে সেনা হুমকি দেখায়। ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট ‘গুড নেইবার পলিসি’ চালু করেন। সোমার্স লিখেছেন, ‘ব্যাড নেইবার’ নীতি ২০ শতকের শুরুর দিকে এতই স্পষ্ট ছিল যে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবেশী দেশগুলোর রাজনৈতিক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে হস্তক্ষেপ করত। ভেনেজুয়েলার ঘটনা স্পষ্ট করে দেখিয়েছে, এই নীতি এখনও কার্যকর।
রাজনৈতিক বিরোধ ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা : ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে অস্থির। মাদুরো প্রশাসন প্রায় এক দশক ধরে নির্বাচিত হলেও বহু বিরোধীকে দমন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ এখন এই অস্থিরতাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
গার্সিয়া আলজাজিরায় লিখেছেন, মাদুরোর পতন শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, এটি রাজনৈতিক বিরোধীদের কার্যক্ষমতাকে দুর্বল করার প্রক্রিয়া। নতুন ক্ষমতাসীনরা বিদেশি প্রভাবের ছায়ায় কাজ করতে বাধ্য হবে।
যদিও কিছু ভেনেজুয়েলীয় জনগণ মাদুরোর পতনে আনন্দিত, হস্তক্ষেপের ফলস্বরূপ স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলো এখন ‘বিদেশি দালাল’ হিসেবে চিহ্নিত হবে। রোজেরো মন্তব্য করেছেন এটি স্থানীয় রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করে কারণ জনগণ বিরোধীকে বিদেশি হস্তক্ষেপের সহযোগী হিসেবে দেখবে।
অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে। মাদুরোর পতন শুধু রাজনৈতিক প্রভাবই নয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটও বৃদ্ধি করবে। লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশ যেমন কলম্বিয়া ও ব্রাজিল ভেনেজুয়েলার শরণার্থী সংকটের প্রভাবে নতুন চাপের মুখোমুখি হবে। ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপ এই সংকটকে দীর্ঘমেয়াদি করবে।
আন্তর্জাতিক আইন ও সার্বভৌমত্ব : গার্সিয়া আলজাজিরায় লিখেছেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছামতো কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রে হামলা চালায়, আন্তর্জাতিক আইন অর্থহীন হয়ে যায়। এটি অন্য রাষ্ট্রগুলোকে শেখায় যে শক্তি আইনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ভেনেজুয়েলার ঘটনা আন্তর্জাতিক আইনকে চ্যালেঞ্জ করেছে। জাতিসংঘের চার্টার আর্টিকেল ২(৪) স্পষ্টভাবে নিষেধ করে অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক সমাজে দ্বন্দ্ব এবং সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
এ ছাড়া মাদুরো ও তার পরিবারকে যুক্তরাষ্ট্রে আনা এবং নর্কোটেররিজম অভিযোগে বিচার শুরু করা, স্থানীয় আইন এবং আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়ার ওপর চাপ তৈরি করেছে। সোমার্স মন্তব্য করেছেন, এটি স্পষ্ট যে যুক্তরাষ্ট্র শুধু সামরিক পদক্ষেপ করছে না বরং আইনি ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণও প্রয়োগ করছে।
ভূ-রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া : মনরো ডকট্রিনের পুনঃপ্রয়োগের ফলে বিশ্ব শক্তি চক্রে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। চীন ইতিমধ্যেই ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
সোমার্স লিখেছেন, চীন এবং রাশিয়া এখন যুক্তরাষ্ট্রকে আক্রমণাত্মক রাষ্ট্র হিসেবে দেখছে। চীন সম্ভবত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বাড়াবে এবং তাইওয়ান সম্পর্কেও সতর্ক হবে। রাশিয়া পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন হস্তক্ষেপকে গুরুত্বসহকারে দেখছে। গার্সিয়া বলেন, রাশিয়া আশা করছে যে যুক্তরাষ্ট্র কোনো ‘প্রান্তিক’ অঞ্চলে কার্যকলাপ চালালে তাদেরও প্রভাবশালী ভূমিকা রাখতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ শুধু লাতিন আমেরিকার জন্য নয়, বৈশ্বিক রাজনীতিতেও প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে। ব্রিকস এবং ইউরোপীয় শক্তি গোষ্ঠীগুলোর দৃষ্টি ভেনেজুয়েলার দিকে।
ভবিষ্যৎ রাজনীতি ও গণতন্ত্র : রোজেরো লিখেছেন, লাতিন আমেরিকায় মার্কিন হস্তক্ষেপ খুব কম ক্ষেত্রেই স্থায়ী শান্তি বা গণতন্ত্র এনেছে বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার জন্ম দেয়। মাদুরো পতনের পর সম্ভাব্য নতুন প্রশাসনও মার্কিন চাপের মুখে থাকবে। গণতন্ত্রের বিকাশ স্থানীয় উদ্যোগ ছাড়া অসম্ভব। আন্তর্জাতিক সাহায্য প্রয়োজন হলেও বিদেশি সেনা হস্তক্ষেপে তা স্থায়ী হয় না।
সময়ের আলো/এআর