সারা দেশে চলছে এলপি গ্যাসের তীব্র সংকট। চাহিদার ভরা মৌসুমে বন্ধ চট্টগ্রামে বৃহত্তম শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)। এটি বন্ধ হওয়ায় উপজাত জ্বালানি এলপিজি উৎপাদনও বন্ধ আছে। স্টোরেজ ট্যাঙ্কেও মজুদ নেই এলপিজি। ফলে সরকারি পর্যায়ে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এলপি গ্যাস লিমিটেডে সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।
অন্যদিকে এলপি গ্যাস লিমিটেডের প্লান্টে মজুদ আছে স্বল্প পরিমাণ এলপিজি। তা দিয়ে উৎপাদন হচ্ছে একেবারেই কম। এতে সরকারি এই প্রতিষ্ঠান থেকে বাজারে চাহিদা অনুযায়ী এলপিজি সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এলপি গ্যাস লিমিটেডের প্লান্টে আদৌ গ্যাস বোতলজাত করা হচ্ছে কি না তা নিয়ে আছে ধোঁয়াশা।
একেক কর্মকর্তা একেক ধরনের তথ্য দিচ্ছেন। ডিলারদের দাবি উৎপাদন হলেও বেশি দিন অব্যাহত রাখা কঠিন। ইআরএল চালু না হওয়া পর্যন্ত এলপি গ্যাস প্লান্টে পুরোদমে উৎপাদন শুরু করা যাবে না। তাদের মতে বেসরকারি পর্যায়ে গ্যাস সংকটের এ সময় সরকারি এই বোতলজাত প্রতিষ্ঠান কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। সারা দেশে চলমান এলপি গ্যাস সংকট আরও তীব্র করে তুলেছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান দেশের একমাত্র তেল শোধনাগার ইআরএল। বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য গত ২৫ ডিসেম্বর থেকে বন্ধ। আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি ইআরএল চালুর পরিকল্পনা আছে। ৪৫ দিনের জন্য শাটডাউন করা হলেও নির্ধারিত সময়ে চালু নিয়ে আছে শঙ্কা। এটি বন্ধ থাকায় উপজাত জ্বালানি এলপিজি উৎপাদনও বন্ধ। এতে এলপি গ্যাস লিমিটেডের প্লান্টে এলপিজি সরবরাহ হচ্ছে না। আগে সরবরাহ করা এলপিজি দিয়ে উৎপাদন হচ্ছে সর্বনিম্ন পর্যায়ে।
ইআরএল কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের ট্যাঙ্কে এলপিজি মজুদ নেই। যা আছে তা সব এলপিজির প্লান্টে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে এলপি গ্যাস লিমিটেডের কর্মকর্তারা বলছেন, ইআরএল থেকে সরবরাহ এখনও অব্যাহত। তবে তা একেবারে অপ্রতুল।
বিপিসির সংশ্লিষ্টরা জানান, মধ্যপ্রাচ্যের দুটি দেশ সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল (ক্রুড) আমদানি করা হয়। প্রতি মাসে দুটি দেশের একটি থেকে গড়ে ১ লাখ মেট্রিকটন ক্রুড আমদানি করা হয়।
বৃহদাকার অয়েল ট্যাঙ্কার থেকে খালাস করা ক্রুড পরিশোধন করা হয় ইআরএলে। কয়েক ধরনের মূল জ্বালানি উৎপাদন করা হয় ক্রুড থেকে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ পরিমাণে উৎপাদন করা হয় ডিজেল। এ ছাড়া পেট্রোল, ফার্নেস অয়েল, কেরোসিন, বিমানের জ্বালানি জেট ফুয়েল ও অকটেন উৎপাদন করা হয়। ক্রুড পরিশোধনের পর উপজাত জ্বালানি হিসেবে বিটুমিন, ন্যাফতার পাশাপাশি এলপিজি উৎপাদন করা হয়।
এলপিজির সব সরবরাহ করা হয় ইআরএলের কাছাকাছি এলপি গ্যাস লিমিটেডের প্লান্টে। সেখানে সাড়ে ১২ কেজি হারে বোতলজাত গ্যাস চার তেল কোম্পানির ডিলারের কাছে সরবরাহ করা হয়। চার কোম্পানি হচ্ছে পদ্মা, যমুনা, মেঘনা ও স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি লিমিটেড (এসএওসিএল)। চার কোম্পানিকে এলপিজির বোতল দেওয়া হয় আনুপাতিক হারে।
তেল কোম্পানির ডিলারদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ তারা চাহিদা অনুযায়ী এলপি গ্যাস সিলিন্ডার পান না। ৫০ বোতলের চাহিদা জানালে দেওয়া হয় ১০ বোতল বা ৫ বোতল। তেল কোম্পানি থেকে সরবরাহ কম পাওয়ায় গ্রাহকদের সরবরাহ করা যায় কম। এতে অনেকে ডিলারশিপ নিয়ে লোকসানের মুখে পড়েছেন। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানির ডিলারদের ব্যবসা চলে বেসরকারি পর্যায়ে আমদানি করা এলপি গ্যাস দিয়ে।
ইআরএলের উৎপাদনের সঙ্গে এলপি গ্যাস লিমিটেডের উৎপাদন নিবিড়ভাবে জড়িত। ইআরএল বন্ধ হলে বন্ধ থাকে এলপিজি উৎপাদন। আর এলপিজি উৎপাদন বন্ধ হলে এলপি গ্যাস লিমিটেডে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ না হলেও সরবরাহ নেমে আসে সর্বনিম্ন হারে।
এলপি গ্যাস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইউসুফ হোসেন ভুঁইয়া সময়ের আলোকে বলেন, ইআরএল বন্ধ থাকায় এলপিজি সরবরাহ কম। তাই এলপি গ্যাস লিমিটেডের প্লান্টে উৎপাদন কম হচ্ছে। তবে এখনও একেবারে উৎপাদন বন্ধ হয়নি।
ইআরএলের উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্ল্যানিং অ্যান্ড শিপিং) মোস্তাফিজুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, বার্ষিক ওভারহোলিং মেইনটেন্যান্সের জন্য গত ২৫ ডিসেম্বর থেকে ৪৫ দিনের জন্য শাটডাউন করা হয়েছে। মেরামত শেষে আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি ইআরএল চালু করার পরিকল্পনা আছে।
এলপি গ্যাস লিমিটেডে দৈনিক সরবরাহ কতটুকু হচ্ছে এ প্রশ্নে তিনি বলেন, আমাদের ক্রুড পরিশোধন করে যা এলপিজি ছিল বোতলজাতকারী প্রতিষ্ঠানকে সব দিয়ে দিয়েছি। ইআরএল চালু হলে কেবল নতুন করে সরবরাহ করা হবে এলপিজি। এই মুহূর্তে এলপিজি সরবরাহ করা সম্ভব নয়।
এলপি গ্যাস লিমিটেডের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী একেএম ফারুক ইকবাল বলেন, ইআরএল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এলপি গ্যাস লিমিটেডে এলপিজি সরবরাহ কমে গেছে। যখন থেকে এলপিজি সরবরাহ করা হয় তখন থেকে প্লান্টে বোতলজাত করা করা হয়। তবে আপাতত একেবারে উৎপাদন বন্ধ হয়নি। প্লান্টে সীমিতভাবে উৎপাদন হচ্ছে।
আগের চেয়ে উৎপাদন কতটুকু কমেছে এ প্রশ্নে তিনি বলেন, আগের চেয়ে দৈনিক উৎপাদন অর্ধেকে নেমে গেছে। স্বল্প পরিমাণ এলপিজি দিয়ে সক্ষমতার পুরো অংশ উৎপাদন অব্যাহত রাখা কঠিন।
এলপি গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন ডিলার অ্যাসোসিয়েশনের চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সভাপতি সাইফুল আলম সময়ের আলোকে বলেন, সরকারি এলপি গ্যাস পাই না আমরা। বেসরকারি এলপি গ্যাস গ্রাহক পর্যায় থেকে পাওয়া বোতল বিক্রি করে কোনোমতে টিকে আছি।
তিনি বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠান এলপি গ্যাস লিমিটেডে একজন ডিলারের চাহিদা ৩০০ বোতল হলেও সরবরাহ পায় ৫ থেকে ১০টি বোতল। এত কম বোতল দিয়ে গ্রাহকদের সরবরাহ করা কঠিন।
কেন সরবরাহ কম পান এ প্রশ্নে তিনি বলেন, এলপি গ্যাস লিমিটেড থেকে বোতলজাত গ্যাস সরবরাহ করা হয় চার তেল কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও এসএওসিএলের কাছে। চার তেল কোম্পানির তালিকাভুক্ত ডিলাররা সেই বোতলজাত গ্যাস পান রেশনিং হারে। ইআরএল বন্ধ হওয়ার পর থেকে আমাদের মতো সাধারণ ডিলাররা বোতলজাত এলপি গ্যাস পাচ্ছে না। অল্প পরিমাণ যা উৎপাদন হয় তা সরকারি প্রতিষ্ঠানকে সরবরাহ করা হচ্ছে।
আমরা এখন বেসরকারি খাত থেকেও সরবরাহ কম পাচ্ছি। গত ১৫ দিন ধরে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এলপি গ্যাস দিচ্ছে না। আমদানি বন্ধ থাকায় সরবরাহ করা যাচ্ছে না বলে প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের জানিয়েছে। আবার এলপি গ্যাস লিমিটেড থেকে একেবারেই পাচ্ছি না। সব মিলিয়ে চাহিদার ভরা মৌসুমে নাজুক অবস্থায় আছি। এ জন্য এলপি গ্যাসের বোতল চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে।
তেল কোম্পানির সংশ্লিষ্টরা জানান, চট্টগ্রাম মহানগর ও নগরীর বাইরে সব মিলিয়ে পাঁচ হাজার দোকানে বিক্রি হয় এলপি গ্যাস। প্রতিটি দোকানে দৈনিক গড়ে ১৫টি করে বোতলজাত গ্যাস বিক্রি করা হয়। দোকানগুলোতে গত ১৫ দিন ধরে বোতলজাত গ্যাসের সংকট চলছে। অনেক দোকানে গ্যাস পাওয়া গেলেও নেওয়া হয় চড়া দাম। সাড়ে ১২শ টাকার বোতল ২ হাজার টাকাও হাঁকা হচ্ছে। বিকল্প উৎস না থাকায় অনেকে চড়া দামে কিনতে বাধ্য হন। অনেকে বেশি দামেও পাচ্ছে না।
এলপি গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ স্থবির :১৯৭৭-৭৮ সালের দিকে চট্টগ্রাম নগরীর উত্তর পতেঙ্গা এলাকায় এলপিজি বোতলজাত করে গৃহস্থালি কাজে ব্যবহারের জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত যমুনা অয়েল কোম্পানি এলপিজি স্টোরেজ ও বটলিং বা বোতলজাত করার প্লান্ট নির্মাণ করেছে। প্লান্টটি থেকে শুরুর দিকে এলপি গ্যাসের বোতল সরবরাহ করা হতো।
পরে এ প্রকল্পটি ‘এলপি গ্যাস লিমিটেড’ নামে বিপিসির একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করে ১৯৮৩ সালের ৩ মার্চ। ১৯৮৮ সালে এ প্রতিষ্ঠানকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে রূপান্তরিত করা হয়। ১৯৯৫ সালে বিপিসি সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার কৈলাশটিলায় আরও একটি এলপিজি স্টোরেজ, বটলিং ও ডিস্ট্রিবিউশন প্রকল্প গ্রহণ করে।
প্রকল্পের কাজ শেষ হলে প্লান্ট থেকে উৎপাদন শুরু হয় ১৯৯৮ সালে। কৈলাশটিলা এলপি প্রকল্পটি ২০০৩ সালে এলপি গ্যাস লিমিটেড চট্টগ্রামের সঙ্গে একীভূত করা হয়। সরকারি এই প্রতিষ্ঠানের প্লান্ট থেকে বছরে ২০ হাজার মেট্রিকটন এলপি গ্যাস বোতলজাত করার টার্গেট ছিল। তবে ২০২২-২৩ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের পরিসংখ্যানে দেখা যায় কোনো অর্থবছরেই ১৫ হাজার মেট্রিকটনের বেশি এলপিজি উৎপাদন করতে পারেনি।
শুরুর দিকে এলপি গ্যাস লিমিটেডে স্টোরেজ ক্ষমতা ছিল ৩০০ মেট্রিকটন। এখনও ধারণক্ষমতা কিংবা বোতলজাত করার ক্ষমতা বাড়েনি। বিভিন্ন সময় বোতলজাত বৃদ্ধি করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও আলোর মুখ দেখেনি। অদৃশ্য কারণে সরকারি প্রতিষ্ঠানে বোতলজাত করার ক্ষমতা না বাড়লেও বেসরকারি খাতে বেড়েছে আমদানি। এলপি গ্যাসের চাহিদার বড় অংশ পূরণ করা হচ্ছে বেসরকারি পর্যায়ে আমদানি খাত থেকে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তেল কোম্পানি যমুনার এক কর্মকর্তা বলেন, ইআরএলে দ্বিতীয় ইউনিট চালু না হওয়ায় এলপিজি উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়েনি। ইআরএলের দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণ প্রকল্প সম্প্রতি একেনেকে পাস হলেও উৎপাদনে যেতে অনেক সময় ব্যয় হবে। এতে সরকারি পর্যায়ে এলপিজি উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ সহসা আলোর মুখ দেখবে না।
বেসরকারি পর্যায়ে আমদানিকারকদের একটি সিন্ডিকেট সরকারি পর্যায়ে উৎপাদন বৃদ্ধি চায় না মন্তব্য করে তিনি বলেন, এতে তাদের ব্যবসায় লস হবে। তাই সরকারি পর্যায়ে উৎপাদন বৃদ্ধি যত দেরি হবে তত বেশি লাভ তাদের।
সময়ের আলো/এআর