নতুন পাঠ্যবইয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান যুক্ত, ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি বাদ

বিশেষ প্রতিবেদক

শিক্ষা

গত ১ জানুয়ারি শুরু হওয়া নতুন শিক্ষাবর্ষে বিনা মূল্যের নতুন পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। ইতিহাসের অংশ হিসেবে নতুন

2026-01-05T19:25:37+00:00
2026-01-05T19:25:37+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
শিক্ষা
নতুন পাঠ্যবইয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান যুক্ত, ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি বাদ
বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশ: সোমবার, ৫ জানুয়ারি, ২০২৬, ৭:২৫ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
গত ১ জানুয়ারি শুরু হওয়া নতুন শিক্ষাবর্ষে বিনা মূল্যের নতুন পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। ইতিহাসের অংশ হিসেবে নতুন পাঠ্যবইয়ে যুক্ত হলো জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিষয়বস্তু। একই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান নিয়েও লেখা। ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম ও নবম-দশম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে মূলত এসব বিষয় নতুন করে যুক্ত করা হয়েছে। এর পাশাপাশি আগে থাকা ইতিহাসবিষয়ক বিভিন্ন লেখায় কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে। 

বিভিন্ন শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে অধিকাংশ জায়গা থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে কিছু কিছু জায়গায় উপাধি রাখা হয়েছে।

জানা গেছে, অষ্টম শ্রেণির সাহিত্য-কণিকা বই থেকে ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ গদ্যটি বাদ দেওয়া হয়েছে। এই গদ্যে বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ ছিল। সদ্য শেষ হওয়া বছরে অষ্টম শ্রেণির ওই পাঠ্যবইয়ে গদ্যটি ছিল। এবার এটি বাদ দেওয়ায় এ বইয়ে একটি গদ্য কমে মোট গদ্য হয়েছে ১১টি।

নতুন শিক্ষাবর্ষে বিনা মূল্যে বিতরণের জন্য মাধ্যমিক স্তরে (ইবতেদায়ি স্তরসহ) ২১ কোটি ৪৩ লাখের বেশি কপি পাঠ্যবই ছাপানো হচ্ছে। 

এনসিটিবি জানিয়েছে, ৩ জানুয়ারি পর্যন্ত মাধ্যমিকে ৭৮ দশমিক ৬৯ শতাংশ বই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৮৫ শতাংশের বেশি, সপ্তম শ্রেণিতে ৬৮ দশমিক ৬৯ শতাংশ এবং অষ্টম শ্রেণির প্রায় ৫৫ শতাংশ এবং নবম শ্রেণিতে প্রায় ৮৮ শতাংশ ও ইবতেদায়ি স্তরে ৯৬ শতাংশের বেশি বই সরবরাহ করা হয়েছে। তবে ছাপা হয়েছে আরও বেশি। অন্যদিকে প্রাথমিক স্তরে মোট ৮ কোটি ৫৯ লাখের বেশি বইয়ের মধ্যে সব বই সরবরাহ করা হয়েছে। যদিও মাধ্যমিক স্তরে এখনো বিপুলসংখ্যক বই সরবরাহ করতে পারেনি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। ফলে বছরের শুরুতেই মাধ্যমিকের সব শিক্ষার্থী সব বিষয়ের বই হাতে পায়নি।

গণঅভ্যুত্থান যেসব বইয়ে যুক্ত হয়েছে
২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন শিক্ষাক্রম বাদ দিয়ে ২০১২ সালে প্রণীত পুরোনো শিক্ষাক্রমের আলোকে পাঠ্যবই পরিমার্জন করে। এরই ধারাবাহিকতায় বিদায়ী বছর পঞ্চম শ্রেণি থেকে নবম-দশম শ্রেণির বাংলা ও ইংরেজি বিষয়ের বইয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিষয়বস্তু নিয়ে কবিতা, প্রবন্ধ, গদ্য ও গ্রাফিতি যুক্ত করা হয়েছিল। তবে এগুলো ছিল সাহিত্যের অংশ।

এবার ইতিহাসের অংশ হিসেবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিষয়বস্তু ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম এবং নবম-দশম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় পাঠ্যবইয়ের অধ্যায়ে যুক্ত করা হয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণির নতুন পাঠ্যবইয়ে দ্বিতীয় অধ্যায়ে আছে ‘বাংলাদেশের ইতিহাস’। এই অধ্যায়ের শেষাংশে ‘স্বাধীন বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থান’ নামের একটি আলাদা পাঠ রাখা হয়েছে। এতে নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের ছোট বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। একই পাঠে গণআন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের বিবরণ ও আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলা হয়, ‘এই গণআন্দোলনকে “জুলাই গণঅভ্যুত্থান” নামে অভিহিত করা হয়। এই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা, ঐক্য এবং সাহসের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।’

এই পাঠে দুটি ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। একটি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে শহিদ নূর হোসেনের এবং অন্যটি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহিদ আবু সাঈদের।

শিক্ষার্থীদের বয়স বিবেচনায় বিষয়বস্তুর পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে বলে এনসিটিবি কর্মকর্তারা জানান। ষষ্ঠ শ্রেণিতে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা থাকলেও পর্যায়ক্রমে সপ্তম, অষ্টম ও নবম-দশম শ্রেণির বইয়ে তা বাড়ানো হয়েছে। সপ্তম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ের ‘বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ও গণআন্দোলন’ শীর্ষক অধ্যায়ে ‘বাংলাদেশে গণআন্দোলন ও চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ নামে নতুন পাঠ যুক্ত করা হয়েছে। এখানেও ১৯৯০ ও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের বর্ণনা রয়েছে। এই অধ্যায়েও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহিদ আবু সাঈদের ছবি দেওয়া হয়েছে।


অষ্টম শ্রেণির ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম’ শীর্ষক অধ্যায়ে ‘বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় গণঅভ্যুত্থান’ শিরোনামে আলাদা পাঠ যুক্ত করা হয়েছে। সেখানেও নব্বই ও চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এখানেও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহিদ আবু সাঈদের ছবি রয়েছে। আর ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর ঢাকা অবরোধের গণসমাবেশের একটি ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।

নবম-দশম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ের ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা’ শীর্ষক অধ্যায়ে ‘স্বাধীন বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থান’ বিষয়ে একটি অংশ যুক্ত করা হয়েছে। সেখানে ১৯৯০ ও ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে; যা তুলনামূলকভাবে আগের তিনটি বইয়ের চেয়ে বেশি বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহিদ ও আহত হওয়ার ঘটনা নিয়ে জাতিসংঘের তদন্ত দলের প্রতিবেদনের তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে এই বইয়ে। এ বিষয়ে বলা হয়, ‘জাতিসংঘ গঠিত একটি তদন্ত দলের রিপোর্টমতে, এই আন্দোলনের উত্তাল ৩৬ দিনে প্রায় দেড় হাজার মানুষ শাহাদাতবরণ করেন। এর মধ্যে ১২ থেকে ১৩ শতাংশ শিশু।’

এভাবে আরও ঘটনা ও প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে বলা হয়, ‘২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান নিছক কোনো সামাজিক-রাজনৈতিক ঘটনা নয়; বরং এটি বাংলাদেশিদের জাতীয় জীবনে নতুন নাগরিক চেতনার উন্মেষ। এই চেতনার সারমর্ম হলো গণতন্ত্র, সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা। এর মধ্য দিয়ে জনগণের এমন এক দুর্দমনীয় আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে, যার মাধ্যমে মানুষ জানিয়ে দিয়েছে যে তারা আর কখনোই স্বৈরাচার, দুঃশাসন, জুলুম এবং নিপীড়নের কাছে পরাভব মানবে না।’

এনসিটিবির একটি সূত্র জানিয়েছে, জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসিসি) সিদ্ধান্ত ও সরকারের সিদ্ধান্তের আলোকেই এবারের পাঠ্যবইয়ে পরিবর্তন করা হয়েছে। এ কাজে এনসিটিবিও যুক্ত ছিল। তবে কোনো কোনো বিষয় পরিবর্তন করা নিয়ে মতপার্থক্য ছিল।

এনসিসিসি মন্ত্রণালয় পর্যায়ের একটি কমিটি। এখানে বাইরের শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞরাও অন্তর্ভুক্ত থাকেন। এবারের পরিবর্তনে এনসিসিসির কয়েকজন বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

গত বছর জানুয়ারিতে পাঠ্যবই বিতরণের সময়ে এনসিটিবির চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন এ কে এম রিয়াজুল হাসান। এখন তিনি অবসরে। তিনি বলেন, বিদায়ী বছরের বাংলা-ইংরেজি বইয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে গল্প ও কবিতা যুক্ত করা হয়েছিল। এ ছাড়া বিভিন্ন বইয়ে গ্রাফিতিও যুক্ত করা হয়েছিল। তখনই ইতিহাসের অংশ হিসেবে তা যুক্ত করার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু সময় কম থাকায় সম্ভব হয়নি। তারই ধারাবাহিকতায় এবার ইতিহাসের অংশ হিসেবে গণঅভ্যুত্থানের বিষয়বস্তু যাচ্ছে।

তিনি বলেন, এটি ভালো সিদ্ধান্ত। তবে তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা যেন সঠিক থাকে। কেউ যেন আপত্তি তুলতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

আরআর



Loading...
Loading...
শিক্ষা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: