ঢাকার বল দিল্লি ছাড়িয়ে আইসিসির কোর্টে

মামুন হোসেন ও মেহেদী হাসান

ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) এক সিদ্ধান্ত থেকে শুরু হয়ে ঘটনাপ্রবাহ গড়িয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলে (আইসিসি)। মোস্তাফিজুর রহমানকে কলকাতা নাইট রাইডার্স

2026-01-06T01:42:03+00:00
2026-01-06T02:06:54+00:00
 
  মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬,
২৮ আশ্বিন ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকার বল দিল্লি ছাড়িয়ে আইসিসির কোর্টে
মামুন হোসেন ও মেহেদী হাসান
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারি, ২০২৬, ১:৪২ এএম  আপডেট: ০৬.০১.২০২৬ ২:০৬ এএম
ঢাকার বল দিল্লি ছাড়িয়ে আইসিসির কোর্টে
ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) এক সিদ্ধান্ত থেকে শুরু হয়ে ঘটনাপ্রবাহ গড়িয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলে (আইসিসি)। মোস্তাফিজুর রহমানকে কলকাতা নাইট রাইডার্স থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ শুধু একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি পরিবর্তনের গল্প নয়; এটি এখন নিরাপত্তা, কূটনীতি এবং বিশ্বকাপ আয়োজন ঘিরে বড় এক সংকেত। সেই বাস্তবতায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি), যার প্রভাব পড়তে পারে আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আয়োজনে এবং ভারতের মর্যাদাতেও।

ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) ফ্র্যাঞ্চাইজি কলকাতা নাইট রাইডার্সকে (কেকেআর) বাংলাদেশি পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেয় ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)। আসন্ন আইপিএল মৌসুমের আগে আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত নিলামে রেকর্ড ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে মোস্তাফিজকে দলে নেয় কলকাতা। কিন্তু নিলামের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নাটকীয়ভাবে বদলে যায় পরিস্থিতি।

২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ‘কথিত’ সংখ্যালঘু সহিংসতার অভিযোগ ঘিরে ভারতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় তীব্র প্রতিক্রিয়া। এর আঁচ লাগে কেকেআর ও দলটির সহ-মালিক শাহরুখ খানের দিকেও। সমালোচনা ও চাপের মুখে গত ৩ জানুয়ারি হস্তক্ষেপ করে ভারতের ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআই। 

বোর্ডের সচিব দেবজিৎ সাইকিয়া জানান, সাম্প্রতিক পরিস্থিতির কারণে কেকেআরকে বলা হয় মোস্তাফিজকে ছেড়ে দিতে। তবে সেই পরিস্থিতি কী, তা স্পষ্ট করা হয়নি। পরে কেকেআর জানায়, বিসিসিআইয়ের নির্দেশ মানা ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় ছিল না।

এই ঘটনার পরই কঠোর প্রতিক্রিয়া জানায় বিসিবি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলকে (আইসিসি) চিঠি দিয়ে বোর্ড জানায়, নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে বাংলাদেশ দলকে ভারতে পাঠানো হবে না। 

বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল সোমবার বলেন, আমরা এই মুহূর্তে সিকিউর ফিল করছি না আমাদের টিমটা ভারতে গিয়ে বিশ্বকাপ খেলুক। তো আমরা আইসিসিকে চিঠি লিখেছি এবং চিঠিতে আমরা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছি আমরা কী বলতে চাচ্ছি। কেননা আমাদের কাছে মনে হচ্ছে সিকিউরিটি একটা বড় কনসার্ন এবং সেটা ফলো করছি আমরা। আমরা আইসিসিকে মেইল পাঠিয়েছি এবং আমরা সঙ্গে সঙ্গে তাদের কাছ থেকে একটা মিটিং করার জন্য তারা আমাদের বলবে খুব তাড়াতাড়ি। সেখানে আমাদের কথাগুলো আমরা এক্সপ্রেস করব। কিন্তু যে ই-মেইলটা পাঠিয়েছি তার রিপ্লাইয়ের ওপর নির্ভর করছে আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ কী নেব।

আগামী মাসে ভারত-শ্রীলঙ্কায় যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। ৭ ফেব্রুয়ারি ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে মাঠে নামার কথা ছিল বাংলাদেশের। আইসিসির কাছে পাঠানো চিঠিতে বিসিবি স্পষ্ট করেছে তারা ভারতের মাটিতে খেলবে না। বিসিবির এমন সিদ্ধান্তে সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমী থেকে বোদ্ধামহল সবাই খুশি। অনেকের শঙ্কাও আছে। তবে সেই সংখ্যাটা কম। ভবিষ্যতে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সিরিজসহ অন্যান্য ইভেন্টে এর প্রভাব পড়বে কি না— এমন প্রশ্নে বিসিবির পরিচালক খালেদ মাসুদ পাইলট বলেছেন, আমার মনে হয় না ভবিষ্যতে এর প্রভাব পড়বে। তারা মোস্তাফিজের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে পুরো দলের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করবে। এই ঘটনার পর আইসিসির উচিত সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া। যেহেতু বিকল্প ভেন্যু শ্রীলঙ্কা রয়েছে, সেখানে ম্যাচ শিফট করতে পারে। পাকিস্তানও তো ভারতের মাটিতে খেলে না। এটা শুধু বিশ্বকাপ পর্যন্তই। ভবিষ্যতে আশা করি এর প্রভাব পড়বে না।

বিসিবির সিদ্ধান্তে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। 

বিএনপির ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক ও জাতীয় দলের সাবেক গোলরক্ষক আমিনুল হকের বরাতে জানা গেছে— আমি ইতিমধ্যে উনার (তারেক রহমান) সঙ্গে কথা বলেছি। মোস্তাফিজের ইস্যুতে আমাদের দেশের ক্রিকেটারদের হয়ে আমরা যাতে জোরালো প্রতিবাদ এবং ভয়েস রেইজ করি এবং আমরা চাই যে ষড়যন্ত্রকারীকে আইডেন্টিফাই করা। আমাদের খেলাধুলার সঙ্গে রাজনীতি বা অন্য কিছু টেনে এনে মোস্তাফিজের মতো একজন স্বনামধন্য ক্রিকেটার যাতে কখনোই এই ধরনের সমস্যার সম্মুখীন না হয় সে জন্য তারেক রহমান আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন এবং আমাদের দলের যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত রয়েছেন এবং আমাদের নেতৃবৃন্দ যারা বিশিষ্ট রয়েছেন তারা বিষয়টি তদন্ত করে দ্রুত সময়ের ভেতরে জাতির সামনে উপস্থাপন করবেন।

আমিনুল হক আরও বলেন, কারা ধর্মকে ব্যবহার করে এই ধরনের ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে মোস্তাফিজের মতো একজন জাতীয় দলের খেলাকে কলকাতা নাইট রাইডার্স রিলিজ দিয়েছে, কেন তিনি আইপিএল খেলতে পারবেন না। এ বিষয়টি যেহেতু তিনি বিগত সময়ে খেলেছেন, আজকে কেন নতুন করে এই সমস্যা তৈরি হয়েছে এবং এর পেছনে কারা রয়েছে সেটা অবশ্যই আমাদের বের করা উচিত।

বাংলাদেশের এই অবস্থানে ভারতের ভেতরেও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কংগ্রেস নেতা শশী থারুর মন্তব্য করেন, আমরা এই লজ্জা নিজেদের ওপর নিজেরাই ডেকে এনেছি। মোস্তাফিজ ইস্যুর পরিপ্রেক্ষিতে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, সেটিই আইসিসিকে লেখা চিঠিতে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে বিসিবি।

বাংলাদেশ দলের সাবেক প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীন নান্নুও বিসিবির সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন। 

তিনি বলেন, নিরাপত্তা না থাকলে খেলবে কীভাবে? মানসিক দিকটাও বড় বিষয়। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে দল পাঠানো সম্ভব নয়। এই সিদ্ধান্তটা এখন নেওয়া খুবই ভালো হয়েছে। ভবিষ্যতে এর প্রভাব পড়বে কি না, সে বিষয়ে নান্নু বলেন, আগাম বলাটা মুশকিল। কারণ আইসিসি এখনও কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি। যেহেতু আমাদের বোর্ড থেকে অলরেডি একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং আইসিসির কাছে একটা চিঠি পাঠানো হয়েছে। তো সবকিছু মিলিয়ে আমি বলব যে অপেক্ষা তো অবশ্যই করতে হবে আইসিসি থেকে রেসপন্সটা কী আসে। তারপর আমাদের বোর্ড কী সিদ্ধান্ত নেয় এটা আমাদের দেখতে হবে।

মোস্তাফিজ ইস্যুতে বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেন বলেন, প্রথমত বিসিবি যে কাজটি করেছে তারা একদম সঠিক কাজ করেছে। বিসিবি কোনো রাজনৈতিক সংগঠন নয়, তারা কেবল নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে যে চিঠিটি দিয়েছে সেখানে আমাদের খেলোয়াড়রা নিরাপদ নয়, সঠিক কাজটি করেছে বিসিবি এবং আজকে যে পদক্ষেপ সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে যে আইপিএল বাংলাদেশে যাতে সম্প্রচার না করা। যেহেতু বাংলাদেশ জাতীয় দলের খেলোয়াড় মোস্তাফিজ। সে শুধু বাংলাদেশ জাতীয় দলের খেলোয়াড় না, সে একজন ব্যক্তি মোস্তাফিজ না— হি ইজ রিপ্রেজেন্টিং বাংলাদেশ ইন দ্যা ইন্টারন্যাশনাল এরিনা। তো তার প্রতি যেকোনো ধরনের অসম্মান করা মানে বাংলাদেশের প্রতি অসম্মান করা। এক মোস্তাফিজকে অসম্মান, অপমান করতে গিয়ে ভারত এখন নিজেই ফাঁদে পড়েছে। 

বাংলাদেশ বিশ্বকাপে না খেললে আয়োজক হিসেবে ভারতের মর্যাদায় যেমন আঘাত আসবে, তেমনি আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনাও রয়েছে। গ্রুপপর্বে বাংলাদেশের তিনটি ম্যাচ হওয়ার কথা ছিল কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ইতালি ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। শেষ ম্যাচটি ছিল মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে নেপালের বিপক্ষে। চার ম্যাচ মিলিয়ে প্রায় ২ লাখ ২২ হাজার দর্শকের টিকেটের বাজার ছিল এই সূচিতে।

ইতিমধ্যে বিশ্বকাপের টিকেট বিক্রি শুরু করেছে আইসিসি। বাংলাদেশ-ইতালি ম্যাচের সর্বনিম্ন টিকেটের মূল্য ১০০ রুপি, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে ৩০০ রুপি এবং নেপালের বিপক্ষে ম্যাচে ২৫০ রুপি নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব ম্যাচ ভারত থেকে সরে গেলে বিপুল অঙ্কের আয় কমবে বিসিসিআইয়ের।

তবে টিকেট বিক্রির পুরো অর্থ বিসিসিআইয়ের কোষাগারে যায় না। আইসিসির সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী টিকেটের মালিকানা আইসিসি বিজনেস করপোরেশনের (আইবিসি)। বিসিসিআই মূলত স্থানীয় স্পনসরশিপ, হসপিটালিটি বক্স এবং ম্যাচ দিনের উদ্বৃত্ত আয় পেয়ে থাকে।

হিন্দুস্থান টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে— যদি বাংলাদেশের ম্যাচগুলো সরিয়ে নেওয়ার পর সেখানে নতুন ম্যাচ আয়োজন না করা হয়, তা হলে বিসিসিআইয়ের সম্ভাব্য লোকসান হতে পারে ৭ থেকে ৩০ কোটি রুপি। তবে অন্য ম্যাচ আয়োজন হলে ক্ষতি কমতেও পারে।

সব মিলিয়ে মোস্তাফিজ ইস্যু এখন আর একক কোনো খেলোয়াড় বা একটি লিগের গল্প নয়। এটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিরাপত্তা, রাজনীতি এবং বাণিজ্যের জটিল সমীকরণকে সামনে এনে দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত আইসিসির সিদ্ধান্তই বলে দেবেÑ এই সংকট কোন দিকে মোড় নেয়।

এফআর
  বিষয়:   আইপিএল  ঢাকার বল  দিল্লি ছাড়িয়ে  আইসিসির কোর্টে 


Advertisement
Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: