নড়াইল জেলায় মাছের ঘেরের পাড়ে পতিত জমিতে লাউ চাষে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। একসময়ের অবহেলায় পড়ে থাকা ঘেরের পাড় এখন হয়ে উঠেছে অর্থকরী ফসল উৎপাদনের কেন্দ্রবিন্দু। আধুনিক জাতের লাউ চাষ করে জেলাজুড়ে কৃষকদের ভাগ্য বদলের এই নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন নড়াইল সদর উপজেলার সিঙ্গাশোলপুর ইউনিয়নের গোবরা গ্রামের বিকাশ চন্দ্র মিশ্র। লাউ চাষে বিকাশের অভাবনীয় সাফল্য দেখে এলাকার অন্য কৃষকরাও এখন ঘেরের পাড়ে সবজি চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।
বিকাশ চন্দ্র মিশ্র জীবনের দীর্ঘসময় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু নাড়ির টান আর কৃষির প্রতি ভালোবাসা থেকে অবসর জীবনের পর ফিরে আসেন গ্রামে। নিজের পাঁচ একর আয়তনের মাছের ঘেরের পাড়কে কাজে লাগিয়ে শুরু করেন বাণিজ্যিক লাউ চাষ। বর্তমানে তার খামারে হীরা, মেরিনা ও গ্রিন সুপারসহ বিভিন্ন উন্নত জাতের লাউয়ের সমারোহ।
সরেজমিন নড়াইল সদর উপজেলার সিঙ্গাশোলপুর ইউনিয়নের গোবরা গ্রামে বিকাশ চন্দ্র মিশ্রর লাউ বাগানে গিয়ে দেখা যায়, দিগন্তজোড়া সবুজ মাচায় দুলছে শত শত কচি লাউ।
নিজের এই উদ্যোগ সম্পর্কে বিকাশ চন্দ্র মিশ্র বলেন, আমি দীর্ঘদিন ব্র্যাকে ম্যানেজারি করেছি। কিন্তু এখন এই ঘেরের পাড়ে লাউ চাষ করে যে মানসিক তৃপ্তি আর আর্থিক সচ্ছলতা পাচ্ছি, তা চাকরির চেয়ে অনেক বেশি। পরিকল্পিতভাবে চাষ করলে কৃষিই হতে পারে সেরা ক্যারিয়ার বলেও মন্তব্য করেন সফল এই উদ্যোক্তা।
নড়াইল সদর উপজেলা কৃষি বিভাগ বলছে, ঘেরের পাড়ে লাউ চাষের এই মডেল এখন জেলাজুড়ে জনপ্রিয় হচ্ছে। শিক্ষিত তরুণদের আধুনিক ও উচ্চমূল্যের সবজি চাষে উদ্বুদ্ধ করতে সব ধরনের কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে কৃষি বিভাগ।
এ বিষয়ে জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে নড়াইল সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রোকনুজ্জামান বলেন, আমরা কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও উন্নত জাতের বীজ সরবরাহ করছি। বিশেষ করে শিক্ষিত যুবকরা যাতে আধুনিক কৃষিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন সে জন্য আমরা মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত পরামর্শ ও সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছি।
বিকাশের খামার থেকে প্রতিদিন গড়ে ১৫০ থেকে ২০০টি লাউ স্থানীয় বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে। পাইকারি দরে প্রতিটি লাউ ২৫ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। উৎপাদন খরচ বাদে প্রতি মাসেই মোটা অঙ্কের মুনাফা ঘরে তুলছেন তিনি। তার এই উদ্যোগ কেবল তাকেই স্বাবলম্বী করেনি, সৃষ্টি করেছে স্থানীয়দের জন্য কর্মসংস্থান। খামারে কর্মরত এক শ্রমিক জানান, আগে কাজ পাওয়া কঠিন ছিল। এখন এই সবজি খামারে কাজ করে তার সংসার ভালো চলছে।
স্থানীয়রা বলছেন, পতিত জমিকে কাজে লাগিয়ে লাভের মুখ দেখা এবং চাকরি ছেড়ে কৃষিতে সফল হওয়া বিকাশ চন্দ্র মিশ্র এখন নড়াইলের তরুণ প্রজন্মের কাছে এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা। তার এই উদ্যোগ প্রমাণ করেছে, সঠিক পরিকল্পনা ও পরিশ্রম থাকলে নিজ ভূমিতেই সোনার ফসল ফলানো সম্ভব।