ভারতের নুমালীগড় রিফাইনারি লিমিটেড (এনআরএল) থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে ১ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিকটন ডিজেল আমদানি করবে সরকার। এতে খরচ হবে ১ হাজার ৪৬১ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। মঙ্গলবার সচিবালয়ে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে এই তেল আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে ভারতের নুমালীগড় রিফাইনারি থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরে ১ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিকটন ডিজেল আমদানির প্রস্তাব নিয়ে আসা হয়। উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করে অনুমোদন দিয়েছে।
জানা গেছে, বিপিসির ২০২৬ সালের পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির প্রস্তাব ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় নীতিগতভাবে অনুমোদিত হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর মেয়াদি চুক্তির আওতায় ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান নুমালীগড় রিফাইনারি সঙ্গে নেগোসিয়েশনের ভিত্তিতে মূল্য নির্ধারণ করে ১ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিকটন ডিজেল (০.০০৫ শতাংশ সালফার) ১১ কোটি ৯১ লাখ ৩৩ হাজার ২১৬ মার্কিন ডলারে আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বাংলাদেশের মুদ্রায় এর পরিমাণ ১ হাজার ৪৬১ কোটি ৭৬ লাখ টাকা।
জানা গেছে, প্রতি ব্যারেল ডিজেল (প্রিমিয়াম) ৫.৫০ মার্কিন ডলার ও রেফারেন্স প্রাইজ ৮৩.২২ মার্কিন ডলার। ১৫ বছর মেয়াদি চুক্তির আওতায় ২০১৬ থেকে ডিজেল আমদানি করছে বাংলাদেশ। ২০২৩ সালের ১৮ মার্চ থেকে ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইনের মাধ্যমে ভারত থেকে ডিজেল আমদানি করা হচ্ছে।
থাইল্যান্ড থেকে কেনা হবে ১ কোটি ৩৫ লাখ লিটার সয়াবিন তেল : এদিকে আসন্ন রোজায় ভোজ্য তেলের কৃত্রিম সংকট ঠেকাতে থাইল্যান্ড থেকে ১ কোটি ৩৫ লাখ ৭৫ হাজার লিটার সয়াবিন তেল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এই তেল আন্তর্জাতিকভাবে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) কেনা হচ্ছে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) গুদাম পর্যন্ত সব খরচ যোগ করে প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম পড়বে ১৬২ টাকা ৬৩ পয়সা। টিসিবির ভর্তুকিমূল্যে এসব তেল বিক্রি করবে।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় রমজান মাসে তেলের সরবরাহ বাড়ানো ও দাম স্থিতিশীল রাখতে জরুরি ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তেল কেনার প্রস্তাব তোলে। পরে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি (টিইসি) যাচাই-বাছাই শেষে থাইল্যান্ডের প্রাইম কর্প ওয়ার্ল্ড কোম্পানি লিমিটেডকে যোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন করে। সব প্রক্রিয়া শেষে প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে ১৭৮ কোটি ৪৭ লাখ ৩৯ হাজার ১৮৭ টাকা ব্যয়ে এই সয়াবিন তেল কেনার সিদ্ধান্ত হয়।
দুই লিটার পেট বোতলে চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম ধরা হয়েছে ১৩১ টাকা ৪৭ পয়সা। পরিবহন ও অন্যান্য খরচ যোগ করে টিসিবির গুদাম পর্যন্ত দাম দাঁড়াচ্ছে ১৬২ টাকা ৬৩ পয়সা। এই তেল খোলাবাজারে বর্তমানে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কম দামে বিক্রি করা হবে, তবে কেনা দামের চেয়ে বেশি দামে। ফলে এতে সরকারের কোনো ভর্তুকি লাগবে না।
এদিকে একই বৈঠকে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ভর্তুকিমূল্যে বিক্রির লক্ষ্যে ১০ হাজার মেট্রিকটন মসুর ডাল কেনারও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে ব্যয় হবে ৭১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।
কেনা হবে ৬১০ কোটি টাকার টিকা : সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় ইউনিসেফের মাধ্যমে ৬১০ কোটি টাকার টিকা কিনছে সরকার। নিরবচ্ছিন্ন এ কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে সব রুটিন ইপিআই টিকা কেনা হবে। বৈঠকে উপস্থাপিত স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের এ সংক্রান্ত প্রস্তাবে বলা হয়- বাংলাদেশে ইপিআই কার্যক্রম শুরু থেকে ব্যবহৃত সব ভ্যাকসিন ইউনিসেফের মাধ্যমে ক্রয় বা সংগ্রহ করা হয়। ইপিআই কার্যক্রমে ব্যবহৃত সব ভ্যাকসিন অত্যন্ত তাপ-সংবেদনশীল ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মান নিয়ন্ত্রণ হওয়া আবশ্যক।
ইউনিসেফের মাধ্যমে ক্রয় বা সংগ্রহীত সব ভ্যাকসিনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মান নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে এবং ক্রয় করা ভ্যাকসিনের ক্রয়মূল্য তুলনামূলকভাবে কম। এমন তথ্য তুলে ধরে মাঠপর্যায়ে ইপিআই কার্যক্রম চলমান রাখতে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে সব রুটিন ইপিআই ভ্যাকসিন নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ইউনিসেফের মাধ্যমে কেনার নীতিগত অনুমোদন চাওয়ায় তাতে অনুমোদন দেওয়া হয়।
জ্বালানি তেল কেনা হবে ১৩ লাখ ৮০ হাজার টন : এ ছাড়া ছয় দেশের সাতটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান থেকে ১৩ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিকটন বিভিন্ন ধরনের পরিশোধিত জ্বালানি তেল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এতে ব্যয় হবে ১০ হাজার ৮২৬ কোটি ১১ লাখ টাকা। দেশগুলো হলোÑ চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারত, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া। সেখান থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুনে সরকারের সঙ্গে সরকারের (জিটুজি) মেয়াদি চুক্তির ভিত্তিতে এ তেল আমদানি করা হবে।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করে অনুমোদন দেয়।
এর আগে বিপিসির ২০২৬ সালের পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির প্রস্তাব ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় নীতিগতভাবে অনুমোদিত হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশে জ্বালানি তেলের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে মেয়াদি চুক্তির আওতায় জিটুজি ভিত্তিতে ১৩ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিকটন পরিশোধিত জ্বালানি তেল প্রিমিয়াম ও রেফারেন্স প্রাইসসহ ৮৮ কোটি ২৩ লাখ ২৩ হাজার ৫২০ মার্কিন ডলারে আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ১০ হাজার ৮২৬ কোটি ১১ লাখ টাকা। তেল সরবরাহ করবে চীনের পেট্রোচায়না ও ইউনিপেক, আরব আমিরাতের ইএনওসি, ভারতের আইওসিএল, থাইল্যান্ডের ওকিউটি, মালয়েশিয়ার পিটিএলসিএল এবং ইন্দোনেশিয়ার বিএসপি।
যে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করা হবে তার মধ্যে গ্যাস অয়েল ৮ লাখ ৯০ হাজার মেট্রিকটন, জেট এ-১ ফুয়েল ১ লাখ ৮৫ হাজার টন, গ্যাসোলিন ১ লাখ টন, ফার্নেস অয়েল ১ লাখ ৭৫ হাজার টন ও মেরিন ফুয়েল ৩০ হাজার টন রয়েছে।
১২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে দুই ভাগ হবে এনবিআর : অর্থ উপদেষ্টা
এদিকে বৈঠক শেষে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিলুপ্ত করে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নামের যে দুটি বিভাগ করা হয়েছে, তা আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কার্যকর করা হবে বলে।
অর্থ উপদেষ্টাকে প্রশ্ন করা হয় যে, ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে এনবিআর দুই ভাগ করার কথা ছিল। কিন্তু সেটি তো হয়নি। তা করতে না পারার কারণ কী? উত্তরে তিনি বলেন, হলো না। আপনি দেখেন ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখের মধ্যে হয় কি না।
ওইদিন জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে এবং এর মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা নেবে। তা হলে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই এনবিআরকে দুই ভাগ করা কার্যকর হবে? এমন পাল্টা প্রশ্ন করা হলে উপদেষ্টা বলেন, হ্যাঁ, সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন। ছোটখাটো একটা জিনিস আছে, হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই এটা হবে।
গত বছরের ১২ মে এনবিআর বিলুপ্ত করে ‘রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ-২০২৫’ জারি করে সরকার। এর প্রতিবাদে পরদিন থেকে আন্দোলনে নামেন এ সংস্থার কর্মীরা। অবস্থান ধর্মঘট, কলমবিরতিসহ নানা কর্মসূচি পালন করেন তারা।