শীতের ডায়েরি

জাকির উসমান

সাহিত্য

চা খুব খাই। সারা বছরই। বেলা-অবেলায়। শীত এলে চা খাওয়াটা আর ‘খাওয়া’ থাকে না, কিছুটা ‘ভোগ’ হয়ে ওঠে। খুব আরাম

2026-01-07T22:31:22+00:00
2026-01-10T20:32:29+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
সাহিত্য
শীতের ডায়েরি
জাকির উসমান
প্রকাশ: বুধবার, ৭ জানুয়ারি, ২০২৬, ১০:৩১ পিএম  আপডেট: ১০.০১.২০২৬ ৮:৩২ পিএম  (ভিজিট : ৩২৩)
গ্রাফিক : সময়ের আলো
চা খুব খাই। সারা বছরই। বেলা-অবেলায়। শীত এলে চা খাওয়াটা আর ‘খাওয়া’ থাকে না, কিছুটা ‘ভোগ’ হয়ে ওঠে। খুব আরাম করে বাড়ির বারান্দায় বা বেঞ্চিঅলা দোকানে বসে চা খাওয়াটা শীতে একটা উদযাপনও। বেঞ্চিটা আবার নড়বড়ে হতে হয়। অথবা বারান্দাটা আলো-বাতাসে-ভরা—না হলে এই আত্মীয়তায় কোথায় যেন একটা গোলমালের মতো লাগে।

শীতে ঠকঠক করে শরীর কাঁপছে। হাতে ধোঁয়া-ওঠা চায়ের পেয়ালা। এরপর আরাম করে ধীরে ধীরে চুমুক। আলতো করে গিলছি। আবার চুমুক। এই আনন্দ শীতের প্রতিটি দিন আমায় অন্য এক জীবন দান করে। মনে হয়, অনেকগুলো প্রাণের তুমুল উচ্ছ্বাস একটি প্রাণের হয়ে আমার ভেতর হল্লা করে ওঠে।

বইয়ে পড়েছিলাম চীনের টি-স্টল থিয়েটারের কথা। সংগীত, চিত্রকলা ও মার্শাল আর্টের মতো চীনের থিয়েটারও বেশ সমৃদ্ধ। চীনে এ ধরনের টি-হাউসগুলো পর্যটকদের কাছে ভারি জনপ্রিয়, কারণ এগুলো চীনের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও শিল্পকলাকে একটি আরামদায়ক ও ঐতিহ্যবাহী পরিবেশে উপভোগ করার সুযোগ করে দেয়। বছর দশেক আগে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে এক বক্তৃতায়ও টি-স্টল থিয়েটারের গল্প শুনেছিলাম। বৌদ্ধধর্মগুরু অতীশ দীপঙ্কর ১০৪২ সালে তিব্বত ভ্রমণে গিয়ে চা পান করেছিলেন। তিনি সে সময় চা খেতে খেতে থিয়েটার দেখেছিলেন কী না জানা যায় না। তবে আমার খুব মন চায়, চীনে গিয়ে একবার চা খেতে খেতে থিয়েটার দেখে আসি। 

এ প্রসঙ্গে আরেকজনের কথা মনে পড়ল। তিনি শরচ্চন্দ্র দাস। শিক্ষক শরচ্চন্দ্র একইসঙ্গে নিষিদ্ধ তিব্বতে প্রথম বাঙালি অভিযাত্রী, গবেষক, অভিধানকার, ব্যাকরণবিদ ও ব্রিটিশ গুপ্তচর। তার ‘Journey to Lhasa and Central Tibet’ বইয়ে আছে তিব্বতিদের মাখন ও লবণ মিশ্রিত বিচিত্র চা পানের কথা। শরচ্চন্দ্র যে দুবার ( (১৮৭৯ ও ১৮৮১) তিব্বত গেছেন, দুবারই তিনি গভীরভাবে পরখ করে এসেছেন তিব্বতিদের কাছে আমাদের বিক্রমপুরের সন্তান অতীশ দীপঙ্করের আকাশচুম্বী সম্মান ও মর্যাদার বিস্তৃত জমিন।

চা নিয়ে আমার খানিকটা প্রেম আছে। প্রেমের কারণেই বোধ হয় চা নিয়ে জানাশোনা করার একটা আলাদা আগ্রহ আমি লালন করি। চা নিয়ে কেউ কথা কইলে উৎসাহবোধ করি। কুটুম এলো, কিন্তু চা সেধে জানলাম তিনি চা খান না। তখন তাকে কিছুটা বেরসিক মনে হয় আমার।

চায়ের প্রতি প্রেমের কথা বলেছি। এই প্রেম থাকার যথেষ্ট কারণও আছে। গ্রিকদেবী থিয়ার নাম থেকে ইংরেজিতে টি। সেই টি চীনে গিয়ে হয়ে গেল চি। এরপর চি থেকে চা। অবশ্য চায়ের আদিবাড়ি এই চীনেই। যদি ভুল না করি, খ্রিস্ট-পূর্ব দশম শতাব্দীতে। এই যে ‘দেবী’ থেকে চায়ের নাম, এই শব্দটা আমরা কখন উচ্চারণ করি। যখন কাউকে খুব ভালোবাসি। কারও প্রতি যখন মমতা বা প্রেমটা প্রগাঢ় হয়ে ওঠে, তাই তো! চা যখন খাচ্ছি, তখন কি দেবীকে ছুঁয়ে উঠছি না খানিকটা! 

আরেকটা কারণ এর নাম—চা-গাছের বৈজ্ঞানিক নামটিও আমার কাছে খুব রূপবতী কোনো মেয়ের নামের মতো—ক্যামেলিয়া সাইনেনসিস। এই নামও আমার মধ্যে প্রবল প্রেমবোধ জাগায়। কিন্তু এতসব ভেবে যে চায়ের প্রেমে পড়িনি, সে বলাই বাহুল্য। 

ইতিহাসের পথ ধরে চায়ের যাত্রাপথটাও ঘুরে আসতে ভালো লাগছে। আজ থেকে প্রায় ৬ হাজার বছর আগে চীনে চায়ের চাষ শুরু হয়েছিল। তবে সে যুগে চা কিন্তু পানীয় হিসেবে পান করা হত না; চা-পাতাকে শাক হিসেবে খাওয়া হত! আমার খুব ইচ্ছা, শ্রীমঙ্গল বা পঞ্চগড় গিয়ে একবার চা-পাতা তুলে শাক খাব। 

চা-কে পানীয় হিসেবে গ্রহণ করা শুরু হয় দেড় হাজার বছর আগে, এবং সেটা চীনেই। পঞ্চম শতকের দিকে চীনারা উপলব্ধি করে, চা-পাতা গরম করে পানিতে মিশিয়ে নিলে চমৎকার এক পানীয় তৈরি হয়। চীনারা এই পানীয়ের নাম দেয় ‘মৌচা’। 

এরপরের ইতিহাস আরও চমৎকার। পানীয় হিসেবে এই মৌচা দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, যার প্রভাব পড়ে চীনের পাশের দেশ জাপানেও। বলা হয়, নবম শতকে টাং সাম্রাজ্যের সময় একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু প্রথম চীন থেকে চা-গাছ নিয়ে জাপানে গেলে সেখানে চা খাওয়ার সংস্কৃতি চালু হয়। 

আমাদের এই ভূখণ্ডে চা এলো আরও পরে। তবে একেবারে সরাসরি না। প্রথমে ষোড়শ শতাব্দীর শুরুতে ওলন্দাজ বণিকেরা চীন থেকে ইউরোপে পাঠাল চা। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাজ্যের রাজদরবার হয়ে সেনাছাউনিগুলোতে পানীয় হিসেবে চায়ের প্রবেশ ঘটল। 

তারপরের অঙ্কটা সহজে সমাধান করা যায়; যুক্তরাজ্যের সেনাদের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন বা নানা ভূখণ্ড দখলের সঙ্গে সঙ্গে চা পৌঁছে যেতে থাকল পৃথিবীর সেসব দখলকৃত প্রান্তেও। এই পথ ধরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বা ইংরেজ শাসনামলে চা এলো আমাদের দুয়ারেও। বয়ান-বিজ্ঞাপন আর খবর রটতে রটতে আমাদের অভ্যস্ত হতে সময় লাগল বটে। তবে তারপর থেকে চা আমাদের ঠিকই নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠল। কারও কারও কাছে তো এক কাপ চা অবসরে মুখোমুখি বসে থাকা ‘বনলতা সেন’ বা সুন্দরী কোনো নারীর সঙ্গে একাত্ম হয়ে আড্ডা।

ডায়েরি শেষ করি। চা-গাছ চিরহরিৎ বৃক্ষ। হঠাৎ কৌতূহল হলো—চিরহরিৎ ব্যাপারটা কী! পৃষ্ঠা উল্টালাম, অভিধান বলছে : ‘বরাবর সবুজ থাকে এমন’। এই প্রেমও বরাবর সবুজ থাকুক।

জেডও/



Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: