গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে একটি ঔষধ কোম্পানি অর্থ উপদেষ্টার কাছে আবেদন করেছিল। সচিবালয়ে উপদেষ্টার দফতরে সেই চিঠিটি গ্রহণ করা হয় গত ২১ ডিসেম্বর। বিষয় বিবেচনায় চিঠিটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে যাওয়ার কথা। অর্থ উপদেষ্টার ডাক ফাইলে বহুদিন পড়ে থাকার পর চিঠিটি গত ৫ জানুয়ারি রাজস্ব বোর্ডে পৌঁছেছে বলে অর্থ-উপদেষ্টার দফতর থেকে জানা গেছে।
এমন ধীরগতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়েও। এখানকার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কে কোথায় থাকেন তা কেউ নির্দিষ্ট করে বলতে পারেন না। দেখা করতে গেলেই শোনা যায়, তারা বৈঠকে আছেন। প্রতিদিন এই মন্ত্রণালয়ে দূর-দূরান্তের স্কুল থেকে শুরু করে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এসে বসে থাকেন বারন্দায় রাখা সোফায়। কেউ কেউ আবার নির্দিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করার জন্য হন্যে হয়ে ঘোরেন। তবে বেশিরভাগ সময়ই কারও কোনো পাত্তা পাওয়া যায় না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অফিস সহকারী সময়ের আলোকে বলেন, সকালে এসেই কে যে কোথায় যায় হদিস পাওয়া কষ্টকর। আবার প্রতিদিন অনেক বৈঠক চলে।
সচিবালয়ে একাধিক মন্ত্রণালয় ও বিভাগে ঘুরে দেখা যায়, তাদের ডাক ফাইলে কাগজের স্তূপ। কোনো কোনো ফাইলে ধুলার আস্তরণ পড়ে গেছে। অথচ অনেকে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আবেদন করেন, চিঠি লেখেন। কিন্তু এসব চিঠি আদৌ মনোযোগ দিয়ে পড়া হয় কি না, তা নিয়েও সন্দেহ ঘনীভূত হয়েছে।
জানা গেছে, প্রতিটি মন্ত্রণালয়েই গ্রহণ-প্রেরণ শাখা রয়েছে। তবে এসব শাখায় কর্মরতদের বেশিরভাগকেই অনেক সময় খুঁজে পাওয়া যায় না। আবার সচিবালয়ে যারা প্রবেশ করতে পারেন না, তারা সচিবালয়ে প্রবেশপথে গ্রহণ শাখা থেকে চিঠি নিয়ে আসেন। প্রতিদিন কত চিঠি আসে; এমন প্রশ্নে কর্তব্যরত এক কর্মকর্তা জানান, হিসাব রাখা দায়। তবে প্রতিদিন প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের অসংখ্য চিঠি আসে। এসব চিঠি আবার প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারী বা কর্মকর্তা গেটে এসে নিয়ে যান।
সচিবালয়ে বাইরে থেকে আসা কিংবা এক মন্ত্রণালয় থেকে অন্য মন্ত্রণালয়ে যাওয়া চিঠির ঠাঁই হয় ডাক ফাইলে। ডাক ফাইলে থাকা চিঠি পুঙ্খানুপুঙ্খুভাবে খুঁটিয়ে দেখার সময় পান না উপদেষ্টা কিংবা সচিবরা। একটি টিক মার্ক দিয়ে সংশ্লিষ্ট দফতরে কর্মরত কর্মকর্তার কাছে পাঠিয়ে দেন। আবার কখনো কখনো এই ডাক ফাইল তাদের একান্ত সচিবের কাছে আসে। অনেকে সময়মতো দেখেন। আবার দিনের পর দিন ডাক ফাইল নিজের টেবিলে ফেলে রাখেন। কোনটা গুরুত্বপূর্ণ তা অনেক সময় ঠাহর করতে পারেন না।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ডাক ফাইল শুধু সচিবের কছে পড়ে থাকে না। শাখা অনুযায়ী চিঠি অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব ও উপসচিবের রুমেও পড়ে থাকে। এতে যে অনেক সময়ক্ষেপণ হয়, তা অনেকেই বুঝতে পারেন না।
এদিকে নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, সরকারি কাজের সর্বত্র গা-ছাড়া ভাব তত বাড়ছে। ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার ডিসি অফিসে এই দৃশ্য চোখে পড়ার মতো। এই যেমন ঢাকা ডিসি অফিসের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিঠি স্বাক্ষর হয়েছে ১ জানুয়ারি। অথচ এই চিঠি ডিসি অফিস থেকে অন্যত্র পাঠাতে সময় লেগেছে ৫ দিন।
সরকারের বিভিন্ন দফতরে চেইন অব কমান্ড অনেকাংশে ভেঙে গেছে। এমনকি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে গুরুত্বর্পূণ বিষয়ে টেলিফোন করা হলেও তা অনেকের কাছে খুব একটা গুরুত্ব পাচ্ছে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জানিয়েছেন, নির্বাচন নিয়ে জেলার প্রশাসকরা খুবই ব্যস্ত। তাদের ব্যস্ততার সুযোগটি অনেকে অন্যভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন। আবার অনেকে মনে করছেন, নতুন সরকার এলে তো এই কর্মকর্তাদের অনেকেই বহাল থাকবেন না; যে কারণে অনেক কর্মকর্তার টেলিফোন তাদের কাছে গুরুত্ব হারিয়েছে।
জানা গেছে, অর্থ উপদেষ্টার শুধু মার্ক করা চিঠি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান তেমন গুরুত্ব দেন না। আবার অনেক সময় তিনি চিঠির আদ্যোপান্ত পড়ে দেখেন না। যে কারণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু চাপা পড়ে থাকছে ডাক ফাইলে।