যশোরের অভয়নগর উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে ভৈরব নদ। একসময় প্রমত্ত থাকলেও এখন মৃতপ্রায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নদ। এতে হুমকির মুখে পড়েছে নওয়াপাড়া নদী-বন্দর। ব্যাহত হচ্ছে বন্দরের স্বাভাবিক বাণিজ্যিক কার্যক্রম। বন্দরের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব হারাবে সরকার। ভৈরব নদের তলদেশে পলি জমে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। নদের মাঝে চর জেগেছে আগেই, এখন দুই তীর ঘেঁষেও চর জাগতে শুরু করেছে। সব মিলিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের ব্যস্ততম নওয়াপাড়া নদী-বন্দরের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
নদী-বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, এই ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য দায়ী অপরিকল্পিত ব্রিজ নির্মাণ এবং ব্রিজ সংলগ্ন এলাকা ব্যাপক হারে দখল হয়ে যাওয়া। এ ছাড়া অব্যাহত দখল, দূষণ, অপরিকল্পিত ড্রেজিং এবং অপরিকল্পিত ঘাট নির্মাণের কারণেও থমকে যাচ্ছে নদীর স্বাভাবিক স্রোতধারা।
স্থানীয়রা বলছেন, অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে অচিরেই পায়ে হেঁটে পার হওয়া যাবে নওয়াপাড়া ভৈরব নদ। তেমনটি ঘটলে অকার্যকর হয়ে পড়বে নওয়াপাড়া নদী-বন্দর। বেকার হয়ে পড়বে হাজার হাজার হ্যান্ডলিং শ্রমিকসহ লাখো মানুষ। পথে বসবে শত শত ব্যবসায়ী। কেবল হ্যান্ডলিং শ্রমিক ও ব্যবসায়ী নয়, পরোক্ষভাবে নদী-বন্দরের সঙ্গে যুক্ত মোটর শ্রমিক ও ব্রোকার্স ইউনিয়নের শ্রমিকরাও চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। সেই সঙ্গে নদী-বন্দর অচল হলে সরকার হারাবে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব। এসব আশঙ্কা থেকে ভৈরব নদ বাঁচাতে কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। বছরের পর বছর এই দাবিতে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রাম চললেও অজ্ঞাত কারণে তা মাঝপথে গিয়ে থেমে যায়। পাশাপাশি দখলদারদের বিরুদ্ধে অদ্যাবধি কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় হতাশ হয়ে পড়েছেন স্থানীয়রা।
সরেজমিন দেখা গেছে, নওয়াপাড়া নদী-বন্দর ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় প্রায় আধা কিলোমিটারজুড়ে নদের দুই-তৃতীয়াংশ পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। এ ছাড়া নদী-বন্দরের নওয়াপাড়া জুট মিলস সংলগ্ন এলাকা, বেঙ্গল খেয়াঘাট থেকে নওয়াপাড়া গ্লোবঘাট ও তালতলা ঘাট সংলগ্ন এলাকায়ও পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। ফলে নদীতে ছোট-বড় কার্গো জাহাজ চলাচলে চরম বিড়ম্বনা দেখা দিয়েছে।
বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালের ২৪ জুলাই থেকে বিআইডব্লিউটিএর প্রকৌশল (সংস্কার) বিভাগের আওতায় ভৈরব নদ সংস্কার তথা ড্রেজিং শুরু হয়। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, এই ড্রেজিংয়ে বন্দরের তেমন কোনো উপকার হয়নি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নওয়াপাড়া নদী-বন্দরের সহকারী পরিচালক মো. মাসুদ পারভেজ বলেন, মূল চ্যানেলে জাহাজ চলাচলে জোয়ারের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। আধুনিক নৌবন্দর স্থাপন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এটা বাস্তবায়িত হলে স্থায়ীভাবে সমস্যার সমাধান হবে। নদীসংলগ্ন এলাকায় ড্রেজিংয়ের মাটি ও বালু ফেলার জায়গা নেই। এই সংকটের কারণে ড্রেজিং কাজে বিড়ম্বনা পোহাতে হচ্ছে। বিশেষ করে ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় অধিক চর পড়লেও জায়গা সংকটে ড্রেজিং করতে পারছি না আমরা। নদীসংলগ্ন এলাকায় জায়গা দখলের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা অভিযান চালিয়ে অনেক ঘাট ইতিমধ্যে দখলমুক্ত করেছি।
নওয়াপাড়া হ্যান্ডলিং শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মাসুদ রানা বলেন, ভৈরব নদ ঘিরে হ্যান্ডলিং শ্রমিক ইউনিয়ন, মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন ও ব্রোকার ইউনিয়নের ৪০ থেকে ৬০ হাজারের অধিক শ্রমিক ও তাদের পরিবার প্রত্যক্ষভাবে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। এ ছাড়া রয়েছে নদীনির্ভর শত শত ব্যবসায়ী ও তাদের পরিবার। তিনি অভিযোগ করে আরও বলেন, কিন্তু বিআইডব্লিউটিএ এই বন্দরের ক্ষেত্রে বরাবরই চরম উদাসীনতার পরিচয় দিয়ে আসছে।
নওয়াপাড়া সার ও খাদ্যশস্য ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহ জালাল হোসেন বলেন, এই মোকামে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পণ্য নিয়ে প্রতিদিন ছোট-বড় অনেক জাহাজ আসে। নদীতে সার, গম, ভুট্টা, সিমেন্ট, ভুসিমাল ও কয়লা নিয়ে জাহাজ নোঙর করে। ড্রেজার আছে, কিন্তু তারা যে কী করে তা সার ব্যবসায়ী সমিতির বোধগম্য নয়। ঠিকমতো ড্রেজিং না হওয়ায় এই বন্দরের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ বরাবরই দাবি করে আসছে যে, অপরিকল্পিত ব্রিজ নির্মাণের কারণে বেহাল দশায় পড়েছে ভৈরব নদের এই অংশ। তা ছাড়া বন্দর এলাকায় ড্রেজিং করে মাটি ও বালু ফেলার জায়গা সংকটেও বিড়ম্বনা পোহাতে হচ্ছে। বিশেষ করে ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় ব্যাপকহারে চর জাগলেও মাটি ও বালু ফেলার জায়গা না পাওয়ায় ড্রেজিং সম্পন্ন করা যাচ্ছে না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নদের দুই তীর ঘেঁষেই চর জাগতে শুরু করেছে। শিল্প-বাণিজ্য ও বন্দর নগরীর স্পন্দন ভৈরব নদের প্রাণ যায় যায় অবস্থা। সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে নদী খনন করতে হবে। অন্যথায় এখানকার ব্যবসা হুমকির মুখে পড়বে।
সময়ের আলো/এসকে/