ভিনদেশি ধার ধারব না

বাসুদেব খাস্তগীর

সুকুমার বড়ুয়া বাংলা সাহিত্যের এক কিংবদন্তি ছড়াকারের নাম। তার ছড়া শিশুকিশোরসহ আবালবৃদ্ধবনিতা সবারই প্রিয়। ছন্দের গাঁথুনি শব্দচয়ন বিষয় বৈচিত্র্যের অভিনব

2026-01-09T15:54:58+00:00
2026-01-09T15:54:58+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
ভিনদেশি ধার ধারব না
সুকুমার বড়ুয়া
বাসুদেব খাস্তগীর
প্রকাশ: শুক্রবার, ৯ জানুয়ারি, ২০২৬, ৩:৫৪ পিএম   (ভিজিট : ৯১)
বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়া। সংগৃহীত ছবি
সুকুমার বড়ুয়া বাংলা সাহিত্যের এক কিংবদন্তি ছড়াকারের নাম। তার ছড়া শিশুকিশোরসহ আবালবৃদ্ধবনিতা সবারই প্রিয়। ছন্দের গাঁথুনি শব্দচয়ন বিষয় বৈচিত্র্যের অভিনব উপস্থাপনার কারণে সব শ্রেণির পাঠকের কাছে সমাদৃত এক ছড়াকারের নাম সুকুমার বড়ুয়া। বাংলা সাহিত্যে আরেক সুকুমার আছেন, তিনি হলেন সুকুমার রায়। ছড়ার প্রসঙ্গ এলেই এই দুই সুকুমারের নাম প্রথমেই চলে আসে। সুকুমার বড়ুয়া চট্টগ্রামেরই সন্তান। চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার মধ্যম বিনাজুরি গ্রামে ১৯৩৮ সালের ৫ জানুয়ারি তার জন্ম। একেবারে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সুনিবিড় আলো-বাতাসে তার বেড়ে ওঠা। জীবনের নানা দুঃখ-কষ্ট জয় করে বাংলা সাহিত্যে একজন সুকুমার বড়ুয়া হয়ে ওঠা সহজ কথা নয়। নিবিড় চর্চা আর প্রতিভার সমন্বয়ে তিনি ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছেন বাংলা সাহিত্যে ছড়ার কিংবদন্তি। 

আজকাল শিশুসাহিত্য বলতে আমরা যা বুঝি তা হলো শিশুতোষ ছড়ার পাশাপাশি কিশোর কবিতা, শিশুতোষ প্রবন্ধ, কিশোর গল্প, কিশোর উপন্যাস, সায়েন্স ফিকশন, রূপকথার গল্প, ছড়াগানসহ বহুমুখী বিচিত্র সম্ভারের সমাহার। মোটামুটি সব ক্ষেত্রে একজন লেখকের মুন্সিয়ানা থাকতে হয়। তবে তাকেই শিশুসাহিত্যে পুরস্কার বা সম্মাননার জন্য বিবেচনা করা হয়। সুকুমার বড়ুয়া হচ্ছে এমন একজন ছড়াকার যিনি একমাত্র ছড়ার মানদণ্ডে শিশুসাহিত্যের সব পুরস্কারই অর্জন করেছেন। এটি একটি বিরল উদাহরণ। সুকুমার বড়ুয়ার সারাজীবন নানা সংকটে অতিবাহিত হলেও তিনি ছড়াকে জীবনের আষ্ঠেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছেন। ছড়াই হচ্ছে তার জীবনের ধ্যানজ্ঞান। সে জন্য তার ছড়া হয়ে উঠেছে একেবারে মনে দাগ কেটে যাওয়ার মতো। ছড়া শুধু যে অন্ত্যমিল প্রধান নয়, সেটা সুকুমার বড়ুয়ার ছড়া পড়লেই বোধগম্য হবে। সুকুমার বড়ুয়ার ছড়া সম্পর্কে এক প্রবন্ধে বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক কবি ও সাংবাদিক রাশেদ রউফ ‘জাতীয় ছড়া দিবস ও জীবন্ত কিংবদন্তি সুকুমার বড়ুয়া’ শীর্ষক লেখা প্রবন্ধে বলেন, সুকুমার বড়ুয়ার ছড়ার প্রধান আকর্ষণীয় দিক ‘ছন্দ’। ছন্দের ঝংকারে তার ছড়ার প্রতিটি শব্দ যেন নেচে ওঠে। সুরের মোহজালে আটকে পড়া ছড়াগুলো শোনামাত্রই তুষ্ট হয় আমাদের কান, উচ্ছ্বাসে ভরে ওঠে মন। মিটে যায় কৌতূহল ও কল্পনার উৎসুকতার দাবি। তার ছড়ার মন্ত্রমুগ্ধ ছন্দে-চপল নৃত্যে-নিটোল সুরে দোলে হয় আমাদের মন। আমরা মাতাল হই তার ছন্দে, নেচে উঠি তার ঝংকারে। আমরা আপ্লুত হই তার বক্তব্যে, অভিভূত হই তার অভিনবত্বে। সত্যিকার অর্থে সুকুমার বড়ুয়া বাংলা ছড়া সাহিত্যে নিজেই নিজের তুলনা। বৈচিত্র্যময় বিষয়কে চমৎকার ছন্দে তুলে অভিনব কায়দায় পাঠকের কাছে তুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে তার জুড়ি নেই। অন্ত্যমিলেরও অভিনব কারিগর তিনি। তার ছড়া পড়লেই পাঠক বুঝতে পারেন তার টানটান ছন্দের অভিনবত্ব। অথচ সহজ-সরল কী দারুণ প্রাঞ্জল ভাষা। তার তেমন কিছু উল্লেখযোগ্য ছড়ার প্রথমাংশ এখানে উপস্থাপন করা হলো। 

পাঠক পড়ামাত্রই বিষয়টি অনুধাবন করতে পারবেন। ‘অসময়ে মেহমান/ ঘরে ঢুকে বসে যান/ বোঝালাম ঝামেলার/ যতগুলো দিক আছে/ তিনি হেসে বললেন/ ঠিক আছে ঠিক আছে।’ (ছড়া : ঠিক আছে) ‘পুঁইয়ের ডাঁটা লাউয়ের ডাঁটা/ বায়োডাটার ঝোল/ ডাটা প্রসেস করতে হলে/ কম্পিউটার খোল।’ (ছড়া : ডাটা সংবাদ) ‘দিনদুপুরে ঘর-ডাকাতি/ পানি তোলার লোটাও নেই/ সর্ষে-তেলের বোতল গায়েব/ তেল তাতে এক ফোঁটাও নেই।’ ‘সব দেশে যা করতে পারে/ আমরা কেন পারব না? এখন থেকে শপথ নেব/ ভিনদেশি ধার ধারব না।’ (ছড়া : দেশের গান)। ‘হাঁস যায় বাঁশ যায়/ ছাগলের ঘাস যায়/ গলা কাটা লাশ যায়/ শাক মাছ আলু কচু/ ফল যায় পাকা/ঢাকা-ঢাকা-ঢাকা...। (ছড়া : ঢাকা যাত্রা) ‘ছোট ছোট বানরের/ বড় বড় পেট/ বাদাবনে বসিয়েছে/ ইন্টারনেট/ কোন দেশে কোন মাসে/কী কী ফল পায়/ ফ্যাক্সের মাধ্যমে/ সব জানা যায়।’ (ছড়া : বুদ্ধি) এ ছড়াগুলো পড়ামাত্রই পাঠক বুঝতে পারেন তিনি কেন আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তার একজন ছড়াকার। এ রকম আরও অনেক মজাদার ছড়ার উদাহরণ টানা যায়। কোনো চরিত্রকে ব্যঙ্গভাবে উপস্থাপন করতে, কোনো একটা বিষয় হয়তো বিশেষ অর্থ বহন করে না কিন্তু শব্দচয়ন ও অন্ত্যমিলের দারুণ ব্যঞ্জনায় বারবার পড়তে ইচ্ছা হয় এবং সুকুমার বড়ুয়ার ছড়া এভাবেই সর্বজনীন হয়ে উঠেছে। ওপরের ছড়াগুলোতে ছড়ার লৌকিক দিক, শিক্ষার প্রতি প্রবল বাসনা, সমাজ সচেতনতা, আঙ্গিকগত নতুনত্ব, ছড়াকে রসাত্মকভাবে উপস্থাপন, প্রযুক্তির এ যুগে ভবিষ্যৎ দূরদর্শিতাসহ অনেক বিষয়কে তিনি ছড়ার বিষয়বস্তুতে টেনে এনেছেন। পাঠকের অনুসন্ধিৎসু মন ছড়াতে নিবিষ্ট হলেই বিষয়গুলো সহজেই দৃষ্টিগোচর হবে। আবার আমাদের যাপিত জীবনের অনেক বিষয় তার ছড়াতে উঠে এসেছে। তার ছড়া পেয়েছে বিপুল পাঠকের জনপ্রিয়তা। সুকুমার বড়ুয়া আজীবন ছড়াকে ধ্যানজ্ঞান মেনে ছড়াতেই জীবন কাটিয়ে দিলেন। কঠিন অনেক বিষয়কেও তিনি সাবলীয় ভাষায় ছন্দের দ্যোতনা সৃষ্টি করে পাঠকের কাছে যেভাবে তুলে ধরেন তা এক বিস্ময়ের ব্যাপারই বটে। তার ছড়া শব্দচয়নে মজা, অন্ত্যমিলের চমৎকারিত্ব, ছড়ার প্রতিটি লাইনে অদ্ভুত এক ভাবনা যেন ঘিরে থাকে। তার ছড়া পড়ে অনেকেই হেসে ওঠে, অনেকেই অবাক হয়। হাসি-কান্না সমাজের নানা অসংগতিগুলো আনন্দময় করে তোলার ক্ষেত্রে সুকুমার বড়ুয়া অদ্বিতীয়। 

বিশিষ্ট কলামিস্ট ও ছড়াকার অজয় দাশগুপ্ত তার ‘সুকুমার বড়ুয়া : ছড়া ও ছন্দের বাংলাদেশি জাদুকর’ শীর্ষক প্রবন্ধের শুরুতেই বলেন, সুকুমার দা না জন্মালে নিজেদের ছড়াকার বলতে কত সময় লাগত বলা মুশকিল। শুধু ছড়া লিখে নির্ভেজাল একুশে পদক পাওয়া এটাও কল্পনাতীত। বাংলা ছড়া সাহিত্যে দুজন সুকুমার। দুজনের পিতৃভূমি, মাতৃভূমি বা আবাস বাংলাদেশে। অগ্রজজন আমাদের দেশের হলেও দেশভাগের পরে ভারতীয়। বাকিজন খাঁটি চাটগাইয়া। এ জন্য তার বিচিত্রমুখী ছড়ার পাশাপাশি চাটগাইয়া ছড়াও বেশ চমৎকার। পড়লেই যেন হাসির রোল পড়ে যায়। এটা সুকুমার বড়ুয়ার মতো খাঁটি ছড়াকারের পক্ষেই একমাত্র সম্ভব। তেমন কিছু চাটগাইয়া ছড়ার উদাহরণ এখানে টানা হলো- ‘লালমিয়া তো বিরাট নেতা/ রাস্তাঘাডে ফাল মারে/ দিনত বড় ভালা মানুষ/ রাইত দুপুরে জাল মারে/ গরিবরলাই কাঁদি কাঁদি/ টেঁয়া-পইসার টাল মারে।’ (ছড়া : নেতা) ‘এত বড় অসৎ/ টেঁয়া খাইয়ে ছশত/ মরা মাছি ধরা খাইয়ে/রসগোল্লার রসত।’ (ছড়া : অসৎ) ‘পরর মালে ঘর ভরায়/ মরার আগে লরখরায়/ হাঁচা মিছা চেক গরিবা/ কর্ম দোষে কি ফল পায়। (ছড়া : কর্মদোষ) ‘কুয়াত নাই পানি/ ডুয়াত নাই বাঁশ/মাইয়ালার চিক্কারে/ ঘরবাড়ি নাশ/ মালাবদল না/ গলার ফাঁস (ছড়া : ফাঁস)। চাটগাইয়া এসব ছড়া বেশ মজাদার এবং শব্দচয়নে নান্দনিকতা অসাধারণ। মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির জন্য অত্যন্ত গৌরবের অধ্যায়। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমাদের স্বাধীন-সার্বভৌম একটি দেশের পাশাপাশি আমাদের সাহিত্যের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, ছড়া, চিত্রকলার মতো সীমাহীন প্রাচুর্যময় সম্পদও আমরা পেয়েছি। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের আবেগের একটি জায়গা। যে আবেগ নিয়ে বাংলাদেশের জনগণ মুক্তিযুদ্ধে ঝঁাঁপিয়ে পড়েছিল, তারা তো আমাদের কাছে চিরস্মরণীয়। তারা আমাদের দেশের অহংকার। তাদের নিয়ে আমাদের ছড়াকারদের লেখা অনেক ছড়া আমাদের অনুপ্রাণিত করে। 

ছড়ার জাদুকর সুকুমার বড়ুয়া বাংলা ছড়াসাহিত্যে অনিবার্য একটি নাম। নিরন্তর সাধনায় ছড়া তার হাতে শিল্প হয়ে উঠেছে। ছড়ার সৌন্দর্যের যে মানদণ্ড সে মানদণ্ডে সুকুমার বড়ুয়ার ছড়া অবশ্যই শিল্পোত্তীর্ণ এবং সময়ের বিবেচনায় কালোত্তীর্ণ। ছন্দের সাবলীল গতিতে তার ছড়ার পথচলা একেবারে মসৃণ। 

কৃত্রিমতা বর্জিত তার ছড়া সবসময় পাঠকের কাছে সুখপাঠ্য। ছড়াকে অনেকেই যেখানে সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখার ক্ষেত্রে কার্পণ্য দেখান সেখানে সুকুমার বড়ুয়ার জীবনঘনিষ্ঠ ছড়াগুলোর উজ্জ্বল আলোয় আমাদের সামনে ভেসে আসে। ছড়ার রূপ-রসকে তিনি তার নিজের মুন্সিয়ানায় যেভাবে আমাদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছেন বাংলাসাহিত্যে তিনি তাই আপন মহিমায় সমুজ্জ্বল। 

আমাদের ছড়ার আকাশের এই উজ্জ্বল ধ্রুব তারাটি ঝরে গেল ২০২৬ সালের ২ জানুয়ারি। এ প্রয়াণ যেন একটি বাংলা ছড়ার ইতিহাসের পরিসমাপ্তি। 

সময়ের আলো/এনএ 

  বিষয়:   ভিনদেশি  ধার ধারব না  সুকুমার বড়ুয়া 


Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: