সরকার ১২ কেজি এলপি গ্যাসের দাম ১৩০৬ টাকা নির্ধারণ করে দিলেও দেশের কোথাও এই দামে তা মিলছে না। ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা বেশি দিয়ে কিনতে হচ্ছে ভোক্তাকে। অনেক স্থানে আবার টাকা দিয়েও মিলছে না এলপি গ্যাস।
আমদানি কম হওয়াকে ব্যবসায়ীরা দায়ী করলেও জ্বালানি বিভাগ বলছে, গত মাসের চেয়ে ডিসেম্বর মাসে বেশি আমদানি হয়েছে। দেশে গ্যাসের কোনো সংকট নেই।
অন্যদিকে খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, ডিলাররা বেশি দাম রাখায় তারা বেশি দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। জ্বালানি বিভাগ বলছে, গত নভেম্বরে দেশে এলপিজি আমদানির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫ হাজার টন। ডিসেম্বরে এ আমদানির পরিমাণ বেড়ে ১ লাখ ২৭ হাজার টন হয়েছে।
এই খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘ দিন ধরে আমদানি বাড়ানোর অনুমতি ঝুলে রয়েছে। শীতকালে ইউরোপে গ্যাসের চাহিদা বৃদ্ধি, বিশ্ববাজারে এলপিজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ও জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা, জাহাজের ভাড়া বৃদ্ধি, গ্যাস আমদানি বড় ৫টি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়া এবং কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আমদানি কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। সরকার চলতি মাসেই এই সংকট কাটিয়ে ওঠার কথা বলেছে। এর অংশ হিসেবে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ রান্নার কাজে ব্যবহৃত এলপি গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমদানিতে ভ্যাট ১০ শতাংশ নির্ধারণ এবং স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট-ট্যাক্স অব্যাহতির উদ্যোগ নিলেও শিগগিরই এই সুপারিশ করে। এরপরও শিগগিরই এই সংকট কাটছে না বলে মনে করেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, একদিকে আমদানিতে রয়েছে নানামুখী সংকট। অন্যদিকে এলপিজির বাজার প্রায় পুরোপুরি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের দখলে রয়েছে। জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে নির্ধারিত দামে বিক্রি নিশ্চিত হলেও এলপিজির খুচরা বাজার চলে পুরোপুরি নিজস্ব নিয়মে। এক শ্রেণির ব্যবসায়ী মজুদ থাকা সত্ত্বেও কৃত্রিম সংকট তৈরিতে কাজ করছে। খুচরা ব্যবসায়ীরাও এর সুযোগ নিচ্ছে। এ ছাড়া আমদানির অনুমতি বাড়ানো হলেও রাতারাতি গ্যাস চলে আসবে না। এলসি করার পর গ্যাস আসতে ৪৫ দিন সময় লাগে। সরকারের উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যবসায়ীরাও ইতিবাচক ভূমিকা না নিলে শিগগিরই এই সংকট কাটবে না।
এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) বলছে, মজুদ ও সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকার পরও মাঠ পর্যায়ে কিছু খুচরা বিক্রেতা সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি করছেন। এতে ভোক্তারা হয়রানির শিকার হচ্ছেন এবং বাজারে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। এ অবস্থায় অতিরিক্ত মূল্যে বিক্রি করা খুচরা বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
আমদানি ৫ প্রতিষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ : লোয়াব সূত্র বলছে, আমদানির জন্য ২৩টি কোম্পানির নিজস্ব টার্মিনাল আছে। গত ডিসেম্বরে আমদানি করেছে মাত্র ১০টি কোম্পানি- ফ্রেশ, ওমেরা, আই গ্যাস, যমুনা, পেট্রোম্যাক্স, বিএম এনার্জি, টোটাল গ্যাস, সেনাকল্যাণ, ডেল্টা ও লাফস। ব্যাংক লেনদেনজনিত জটিলতায় আমদানি করতে পারছে না ওরিয়ন, বেক্সিমকো, এনার্জিপ্যাকের জি-গ্যাস, নাভানা ও এস আলম গ্রুপের ইউনিগ্যাস।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, এক বছর আগেও দেশের অন্তত ২৭টি প্রতিষ্ঠান এলপিজি আমদানি করত। সেখানে বর্তমানে মূলত পাঁচটি অপারেটর এলপিজি আমদানি করছে। দেশের বাজারে সাড়ে ৫ কোটি সিলিন্ডার থাকলেও বর্তমানে রিফিল হচ্ছে মাত্র ১ কোটি ২৫ লাখের মতো। সমিতির দেওয়া হিসাব অনুযায়ী অন্তত ৪ কোটি ২৫ লাখ সিলিন্ডার অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। এ খালি সিলিন্ডারের বড় অংশ সেসব অপারেটরের- যারা আর এলপিজি আমদানি করছেন না। এসব কোম্পানির এলপিজি আমদানি বন্ধ করা এ খাতে সংকট তৈরির অন্যতম কারণ বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
গত মাসের চেয়ে আমদানি বেশি হয়েছে : জ্বালানি বিভাগ : চলমান পরিস্থিতি নিয়ে জ্বালানি বিভাগ বলছে, খুচরা পর্যায়ে এলপিজির বাজার স্বাভাবিকের চেয়ে ঊর্ধ্বমুখী। বর্তমানে এলপিজির পর্যাপ্ত মজুদ আছে। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নভেম্বরের চেয়ে ডিসেম্বরে এলপিজি আমদানি বেড়েছে। তাই এলপিজির সরবরাহ কমার যৌক্তিক কারণ নেই। এলপিজির দাম বাড়তে পারে, এটি জেনে খুচরা বিক্রেতারা এ সংকট তৈরি করেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে স্থানীয় প্রশাসনকে পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করা হয়েছে। এ ছাড়া ইতিমধ্যে এলসি সহজ করা ও ভ্যাট কমানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
আমদানি বৃদ্ধির অনুমতি চেয়েও পায়নি লোয়াব : সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এলপিজি আমদানি বাড়ানোর আবেদন অনুমোদন করতে জরুরি অনুরোধ জানিয়ে গত বছরের ২১ আগস্ট জ্বালানি বিভাগে সর্বশেষ চিঠি দেয় লোয়াব। তবে জ্বালানি বিভাগ এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর কিছু কোম্পানি একসঙ্গে এলপিজি আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে। এতে বাজারে সরবরাহ কমে গেছে। তাই যারা সক্রিয় আছে, তাদের আমদানি বাড়ানোর জরুরি অনুমতি দরকার, যাতে ভোক্তার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ অব্যাহত থাকে। তাই দ্রুত অনুমোদনের জন্য অনুরোধ করা হয় চিঠিতে।
লোয়াবের সেক্রেটারি জেনারেল আহসানুল জব্বার বলেন, যথাসময়ে অনুমতি পেলে আমদানি আরও বাড়ানো যেত। যদিও বেশ কিছু কারণে বর্তমানে সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে। আর খুচরা বিক্রেতারা এর সুযোগ নিচ্ছেন।
এলপিজি ব্যবসায়ীদের ধর্মঘট প্রত্যাহার : দেশজুড়ে অভিযান ও জরিমানার প্রেক্ষাপটে গত বুধবার রাতে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য সিলিন্ডার সরবরাহ ও বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দিয়ে বৃহস্পতিবার বিকালে বিইআরসি চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠকের পর দাবি পূরণের আশ্বাসে ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নিয়েছে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধ হয়ে গেলে যাদের গ্যাস শেষ হয়ে গিয়েছিল তারা পড়েন বিপাকে। ডিলার পয়েন্টগুলো খোলেনি। রাজধানীর অনেক বাসিন্দার বাসায় চুলা না জ্বলায় দোকান থেকে খাবার কিনে আনতে হয়।
জ্বালানি বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেছেন, এলপি গ্যাস সংকটের বিষয়টি নিয়ে আমরা লোয়াবের সঙ্গে বসেছিলাম। আমদানিতে তারা যেসব প্রতিবন্ধকতার কথা আমাদের জানিয়েছিলেন সেগুলো নিরসন করা হচ্ছে। এ ছাড়া ভ্যাট ও শুল্ক ১০ শতাংশ করতে এনবিআরকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। অপারেটররা এলপিজি সরবরাহের যে তথ্য দিয়েছেন, তাতে দেশে এ সংকট তৈরি হওয়ার কথা নয়। আমরা বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছি। যত দ্রুত সম্ভব এ সংকটের সমাধান করা হবে।
সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম আরও বলেন, শীত মৌসুমে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে গ্যাসের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ-সংক্রান্ত জটিলতার বিকল্প হিসেবে এলপি গ্যাসের ব্যবহার বেড়ে যাওয়া এবং বাজার থেকে অনেক অপারেটরের সরে যাওয়া এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী।
লোয়াবের সভাপতি ও ডেল্টা এলপি গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, এলপি গ্যাসের সংকট নেই বিষয়টি এমন নয়, সংকট আছে। তবে বেশি দামে বিক্রি করারও তো সুযোগ নেই। কিন্তু বাজারে তা হচ্ছে। সংকট কাটাতে জ্বালানি বিভাগ এলপি গ্যাস আমদানির সীমা তুলে দেওয়ার অনুমতি দিয়েছে। এটা আসতে অন্তত ৪৫ দিন সময় লাগে। এ মুহূর্তে জাহাজ সংকটের পাশাপাশি ভাড়াও অনেক বেশি। সরবরাহ ব্যবস্থাপনার বিষয়টিকেও ওই অর্থে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখতে সমস্যাগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হলে আজ এ পরিস্থিতি তৈরি হতো না।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ সময়ের আলোকে বলেন, নির্ধারিত দামে যেন ভোক্তারা কিনতে পারেন সে জন্য ভোক্তা অধিকার অভিযান পরিচালনা করছে।
এএডি/