অ্যাডিসের চেয়েও ভয়ংকর হয়ে আসছে কিউলেক্স মশা

সমীরণ রায়

রাজধানীসহ সারা দেশেই অ্যাডিস মশার উপদ্রব যেন কোনোভাবেই থামছে না। এরই মধ্যে ভয়ংকর রূপ নিতে যাচ্ছে কিউলেক্স মশা। রাজধানীবাসীর জন্য

2026-01-10T02:59:16+00:00
2026-01-10T02:59:16+00:00
 
  শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২৬,
২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২৬
অ্যাডিসের চেয়েও ভয়ংকর হয়ে আসছে কিউলেক্স মশা
সমীরণ রায়
প্রকাশ: শনিবার, ১০ জানুয়ারি, ২০২৬, ২:৫৯ এএম 
ফাইল ছবি
রাজধানীসহ সারা দেশেই অ্যাডিস মশার উপদ্রব যেন কোনোভাবেই থামছে না। এরই মধ্যে ভয়ংকর রূপ নিতে যাচ্ছে কিউলেক্স মশা। রাজধানীবাসীর জন্য এখন আতঙ্কের আরেক নাম কিউলেক্স। ক্ষেত্র বিশেষে এটিকে অ্যাডিসের চেয়েও ভয়ংকর হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। গত ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে ঢাকায় সংগৃহীত প্রাপ্তবয়স্ক মশার প্রায় ৮৫ শতাংশই ছিল কিউলেক্স প্রজাতির। এতে করে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হতে পারে ঢাকাবাসীকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুবাহী অ্যাডিস মশার উপস্থিতি শীত মৌসুম থাকায় কিছুটা কমলেও কিউলেক্স মশার সংখ্যা কিন্তু বেড়েছে। ফলে শীত মৌসুম চলে গেলে আগামী ফেব্রুয়ারির শেষ ও মার্চের প্রথমার্ধেই ভয়ংকর রূপ নিতে পারে কিউলেক্স মশা। ফলে ডেঙ্গুবাহী অ্যাডিসের পাশাপাশি কিউলেক্স মশার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রস্তুতি নিতে হবে। সেটি না হলে চলতি বছরজুড়ে রাজধানীবাসীকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হতে পারে। মশা পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব না হলেও নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে কিউলেক্স ও অ্যাডিস মশার উপদ্রব মোকাবিলায় জনস্বাস্থ্য, নগর ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক সক্ষমতার বড় পরীক্ষায় পরিণত হবে বলেও মনে করেন তারা।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অ্যাডিস মশার চেয়েও ভবিষ্যতে কিউলেক্স মশা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। এর মূল কারণ হলো অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বছরের পর বছর পরিষ্কার না হওয়ায় নালা-নর্দমা, জলাবদ্ধ বেসমেন্ট ও পার্কিং এলাকা। এগুলো ঢাকাকে কিউলেক্সের আদর্শ প্রজনন ক্ষেত্রে পরিণত করেছে। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ফেব্রুয়ারির শেষ ও মার্চের প্রথমার্ধেই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। 

কিউলেক্স মশা পাখি, মানুষ ও বিভিন্ন প্রাণীর জন্য বিভিন্ন রোগের বাহক। এই মশা যে রোগগুলো ছড়ায় তার মধ্যে রয়েছে আর্বোভাইরাস সংক্রমণ (যেমন ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস, জাপানি এনসেফালাইটিস বা সেন্ট লুইস এনসেফালাইটিস), গোদ রোগ, ফাইলেরিয়া এবং অ্যাভিয়ান ম্যালেরিয়া। শুধু অ্যাডিস মশা থেকেই ডেঙ্গু হয় না। কিউলেক্সের মধ্যে ১ হাজারটিরও বেশি প্রজাতি রয়েছে। এই মশার নতুন প্রজাতির নতুন নতুন বৈশিষ্ট্য। নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে এই মশা বেশি বংশবিস্তার করে। যেহেতু বাংলাদেশ নাতিশীতোষ্ণ সে কারণে এর বংশবিস্তার বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অবশ্য বিশ্বের যেকোনো দেশেই কিউলেক্স মশা রয়েছে। কিউলেক্স স্ত্রী মশা পানির ওপরে এক সঙ্গে ৩০০টি পর্যন্ত ডিম ছাড়ে। 

এদিকে ডেঙ্গুবাহী রোগ ছড়ানো অ্যাডিস ও কিউলেক্স মশা নিয়ন্ত্রণে যেন ঘুম ভাঙছে না ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি)। এই দুই সংস্থার মশা নিয়েও নেই কোনো গবেষণা। মশা নিয়ন্ত্রণে কীটনাশক ছিটানো হলে তা কার্যকর হচ্ছে কি না তা নিয়েও গবেষণার বালাই নেই। আর মশক নিধনে এই দুই সিটি করপোরেশনে নেই পর্যাপ্ত কর্মীর সংখ্যাও। মশক নিধনকর্মী না থাকায় অনেক ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত নিয়মিত ফগিং বা লার্ভিসাইডিং চালানো সম্ভব হয় না। আর যেসব কর্মী রয়েছেন, তাদের কাজও সঠিকভাবে তদারকি করা হয় না। মশার জীবনচক্রে চারটি ধাপ রয়েছেÑ প্রথমে ডিম, তারপর লার্ভা, পরে পিউপা, আর শেষে পূর্ণাঙ্গ মশা। এই পূর্ণাঙ্গ মশার কামড়েই ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়ার মতো রোগ ছড়ায়। এরই মধ্যে কিউলেক্স মশা যেন আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ দেশে মশা নিধন নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা নেই ডিএসসিসি ও ডিএনসিসির।

অবশ্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) বলছে, কিউলেক্স মশা রোগ ছড়ায় না ভেবে জনসচেতনতায় কিছুটা অবহেলা ছিল। তবে দুই সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কার্যক্রম চলমান। শীত মৌসুম হওয়ায় মশার উপদ্রব অনেকটা কম রয়েছে। কিন্তু মশার উপদ্রব কম থাকলেও মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম কিন্তু থমকে নেই। এই দুই সিটির মশক নিধন কার্যক্রমে জনবল কম থাকার পরও ওষুধ ছিটানোর কাজ চলমান। এই কার্যক্রম আরও বাড়ানো হবে। 

ডিএসসিসির সূত্রে জানা গেছে, সংস্থাটির আওতাধীন ১০টি অঞ্চলের মধ্যে ৭৫টি ওয়ার্ড। এখানে জনবল রয়েছে ১ হাজার ৫০ জন।

ডিএনসিসি সূত্রে জানা গেছে, সংস্থাটি মশা নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে অফিস ব্যবস্থাপনা, পুরো কাজের জন্য স্বল্পসংখ্যক জনবল রয়েছে। এই সীমিত লোকবল এবং যতটুকু সম্পদ আছে, তা দিয়ে কাজ করা অনেক কঠিন। ফলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে লোকবলের স্বল্পতা একটি বড় বাধা। তাই শুধু ডিএনসিসি একার পক্ষে পুরোপুরি মশক নিধন করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এখন আবার কিউলেক্স মশার উপদ্রব বেড়েছে। তারপরও কথা বিবেচনা করে মশক নিধন কার্যক্রম থেমে নেই। একই সঙ্গে প্রতিটি নাগরিকের নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন হতে হবে। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী জনস্বাস্থ্য রক্ষায় প্রতি হাজার বাসিন্দার জন্য ২ দশমিক ৩ জন কর্মীর প্রয়োজন। কিন্তু ডিএনসিসির রয়েছে প্রতি ১১ হাজারে একজন কর্মী, যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, পরিবেশগত কারণে কিউলেক্স মশার উপদ্রব বাড়ছে। আর অ্যাডিস মশার চরিত্রও বদলেছে, ডেঙ্গুর ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। এখন শুধু অ্যাডিস মশা নিয়ে ভাবলেই হবে না। কিউলেক্স মশা নিয়েও ভাবতে হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আমলে না নিলে রাজধানীবাসীর জন্য অশনিসংকেত। কিন্তু আমাদের দুটি সিটি করপোরেশন সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা ও মশা নিয়ন্ত্রণের যে চেষ্টা তা গতানুগতিক। 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, ঢাকার মশা সমস্যা আর মৌসুমি নয়, এটি একটি কাঠামোগত ও বৈজ্ঞানিক সংকটে রূপ নিয়েছে। গত ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে ঢাকায় সংগৃহীত প্রাপ্তবয়স্ক মশার প্রায় ৮৫ শতাংশই ছিল কিউলেক্স প্রজাতির। এটি নগর ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার প্রতিফলন। তবে নাগরিক অংশগ্রহণ ছাড়া ঢাকাকে মশামুক্ত করা অসম্ভব। প্রশাসনও তার দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারে না। বাড়ির ছাদে জমে থাকা পানি, অব্যবহৃত পাত্র, খোলা পানির ট্যাঙ্ক এসব ছোট অবহেলাই বড় বিপর্যয়ের জন্ম দেয়। ঢাকায় মশা মানেই জনস্বাস্থ্য, নগর ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক সক্ষমতার একটি বড় পরীক্ষা। রাজধানীতে কিউলেক্স মশা কার্যত নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়ছে। অন্যদিকে অ্যাডিস মশা আপাতত কমলেও এটি কোনো স্থায়ী নিরাপত্তার বার্তা নয়। এটি শীত মৌসুম বলে কিছুটা কমে। 

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, মশার সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে হলে সাময়িক নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ড্রেনেজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাই এই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে। জনসচেতনতা ছাড়া কোনো পরিকল্পনাই কার্যকর হবে না। রাজধানীতে ডেঙ্গুবাহী অ্যাডিস মশার সংখ্যা কিছুটা কমলেও কিউলেক্স মশার সংখ্যা কিন্তু বাড়ছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভীন বলেন, কিউলেক্স মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের একক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। নাগরিকদেরও বাসস্থান ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং সচেতনতা বাড়াতে হবে। এদিকে অ্যাডিস মশা তো রয়েছে। কিউলেক্স মশার বংশবিস্তার বাড়ছে। ইতিমধ্যে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া হয়েছে। সেইভাবে মশক নিধনে কার্যক্রম চলমান। শীতের মৌসুম হওয়ায় কিছুটা মশার উপদ্রব কমলেও সামনে আরও বাড়তে পারে। সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নিচ্ছি। এ ছাড়া ঢাকা দক্ষিণের কোনো এলাকায় যদি মশা বেশি দেখা যায়, সে ক্ষেত্রে কেউ অভিযোগ দিলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) উপ-প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. ইমদাদুল হক বলেন, শীত মৌসুম থাকায় মশার উপদ্রব কিছুটা কমছে। ডেঙ্গু পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে কিউলেক্স মশার বংশবিস্তার বাড়ছে এমন তথ্য রয়েছে। সম্ভাব্য কিউলেক্স বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ওয়ার্ডভিত্তিক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। আমার বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। বিশেষজ্ঞরা যে পরামর্শ দিয়েছেন, সেগুলো সারা বছর ধরে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হবে। ডিএনসিসির মশক নিধন কার্যক্রম চলমান। ইতিমধ্যে মশককর্মীদের কার্যক্রম তদারকির জন্য বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরিকে (বিএমটিএফ) যুক্ত করা হয়েছে।

এএডি/


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: