আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দুর্নীতির মূলোৎপাটন ও নানাবিধ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণদের কর্মসংস্থান বাস্তবায়নসহ ২৯ দফার ভিত্তিতে নির্বাচনি ইশতেহার প্রণয়ন করতে যাচ্ছে বাম দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট। ইতিমধ্যে নির্বাচনি ইশতেহারের খসড়ার ওপর তৃণমূলের মতামত ও সুপারিশ নেওয়া হয়েছে। ইশতেহারের প্রস্তাবনায় মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত জনগণের গণতান্ত্রিক ও অধিকার আদায়ের
সংগ্রামের প্রেক্ষাপট ও ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। যা আগামী সপ্তাহের যেকোনো দিন জনগণের সম্মুখে ঘোষণা করা হবে।
গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট সূত্র জানায়, ইশতেহারের খসড়ায় ১৪৭ অঙ্গীকার ও ২৯ দফার ভিত্তিতে প্রণয়ন করা হচ্ছে। এতে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে ঘুষ-দুর্নীতি-লুটপাটের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন, দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ের মাধ্যমে মূলোৎপাটন, বেকার তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রাষ্ট্রীয় নীতি, সংবিধান, সুশাসন ব্যবস্থা, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সংবিধানে বর্ণিত চার মূলনীতির মর্মকথা সমুন্নত রাখা, অংশগ্রহণমূলক সুপ্রশাসন, অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের অধিকার বাস্তবায়ন, আদিবাসী ও অন্যান্য জাতিসত্তার মানুষের অধিকারের সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা, ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার ও সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রচার নিষিদ্ধ ও ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে পৃথক করা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত, মৌলিক মানবাধিকার পরিপন্থী আইনগুলো বাতিল, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, কালাকানুন বাতিল, বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করা, জনগণের প্রকৃত ক্ষমতায়ন, গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ ও স্বশাসিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠা, নির্বাচনব্যবস্থার আমূল সংস্কার, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান পুনঃপ্রবর্তন, সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা, ‘না’ ভোটের বিধান যুক্ত এবং যুদ্ধাপরাধী ও ঋণখেলাপিদের জাতীয় সংসদ অথবা অন্য কোনো নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য ঘোষণা, বিকল্প অর্থনৈতিক নীতি ও ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন ও বৈষম্য হ্রাস, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও খাদ্য নিরাপত্তা, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, দুর্বৃত্তায়ন ও মাফিয়াতন্ত্র নির্মূল করা, কৃষি, কৃষক ও মজুর এবং শ্রমিক-কর্মচারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও জীবনমান উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত, শিশু-কিশোর ও বৃদ্ধ-দুস্থদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, নারীর ক্ষমতায়ন ও অধিকার প্রতিষ্ঠা, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সমান মর্যাদা, পার্বত্য শান্তি চুক্তির পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন, বস্তিবাসী, হকার ও প্রতিবন্ধীদের অধিকার নিশ্চিত করা, তথ্যপ্রযুক্তি, টেলিযোগাযোগ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উন্নয়নে জাতীয় মহাপরিকল্পনা গ্রহণ, পরিবেশ ও জলবায়ু সংরক্ষণ, বিকল্প জ্বালানি নীতি প্রণয়ন, প্রাকৃতিক সম্পদের জনগণের মালিকানা নিশ্চিত, যানজট ও দুর্ঘটনা রোধ, পাঁচ বছরের মধ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসা, সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশ, ক্রীড়া, শরীর চর্চা ও বিনোদন সুবিধা নিশ্চিত, স্বাধীন ও সক্রিয় জোট-নিরপেক্ষ পররাষ্ট্র নীতি, আন্তর্জাতিক আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের গণতন্ত্রায়ন ও স্থায়ী বিশ্বশান্তি ও পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণে দৃঢ় ও সক্রিয় প্রচেষ্টা চালানোসহ নানা প্রতিশ্রুতি রয়েছে যুক্তফ্রন্টের এ নির্বাচনি ইশতেহারে।
যুক্তফ্রন্ট নেতারা বলেন, ২৯ দফাকে সামনে রেখে চূড়ান্ত ইশতেহারে ১৪৭ অঙ্গীকারের সঙ্গে জনগণের সংকট নিরসন, দুর্নীতির মূলোৎপাটন ও তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার নিয়ে আসছে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট। যুক্তফ্রন্ট ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যেতে পারলে এই ২৯ দফা ও ১৪৭ অঙ্গীকারসহ যে প্রতিশ্রুতি ইশতেহারে রয়েছে তা বাস্তবায়ন করবে।
গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের সমন্বয়ক, ইশতেহার প্রণয়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত ও বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ বলেন, গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের দেওয়া ২৯ দফার ভিত্তিতেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইশতেহার প্রণয়ন করা হয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে এই ইশতেহারের খসড়া পাঠানো হয়েছিল। তাদের মতামতের ভিত্তিতে ইশতেহার তৈরি করা হচ্ছে। এবার ঘুষ-দুর্নীতি-লুটপাটের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন, দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ের মাধ্যমে মূলোৎপাটন ও তরুণদের কর্মসংস্থানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ইশতেহারে। এ ছাড়া ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং নব্বইয়ের সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী গণঅভ্যুত্থান ও চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়েই গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট ইশতেহার প্রণয়ন করছে। আগামী পাঁচ বছর এই দফাগুলো বাস্তবায়নে কাজ করবে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন বলেন, তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের মতামতের ভিত্তিতে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের ইশতেহার প্রণয়ন হচ্ছে। এটি এখন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। শিগগিরই গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের বৈঠক হবে। ওই বৈঠকে নির্বাচনি ইশতেহার চূড়ান্ত হবে। আগামী সপ্তাহের যেকোনো দিন এই ইশতেহার জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে।
উল্লেখ্য গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের দলগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ, বাসদ (মার্কসবাদী), বাংলাদেশ জাসদ, ঐক্য ন্যাপ, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ (মাহবুব) ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি।