কী ঘটেছিল আলোচিত ওয়ান-ইলেভেনে

আজ ১১ জানুয়ারি। বাংলাদেশে দিনটি ‘ওয়ান-ইলেভেন’ নামে পরিচিত। জাতীয় সংসদ নির্বাচন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর

2026-01-11T01:45:42+00:00
2026-01-11T01:45:53+00:00
 
  সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬,
৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
কী ঘটেছিল আলোচিত ওয়ান-ইলেভেনে
১৯ বছর পূর্তি আজ
প্রকাশ: রোববার, ১১ জানুয়ারি, ২০২৬, ১:৪৫ এএম  আপডেট: ১১.০১.২০২৬ ১:৪৫ এএম
‘ওয়ান-ইলেভেন’ সরকারের শপথ। ছবি : সংগৃহীত
আজ ১১ জানুয়ারি। বাংলাদেশে দিনটি ‘ওয়ান-ইলেভেন’ নামে পরিচিত। জাতীয় সংসদ নির্বাচন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অনাস্থা সৃষ্টি হওয়ার প্রেক্ষাপটে ২০০৭ সালের এ দিনে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিল সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ওইদিন বিকালে জরুরি অবস্থা জারির পর বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হয়েছিল।
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার দিনভরই ছিল নানা গুজব, গুঞ্জন। সার্বিক পরিস্থিতি ছিল থমথমে। বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের সঙ্গে বৈঠক শেষে বিমানবাহিনী প্রধান, নৌবাহিনী প্রধান, পুলিশের মহাপরিদর্শক, র‌্যাব, বিডিআরসহ সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানদের নিয়ে সেনাসদরে বৈঠক করেন তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ। 

রাত সাড়ে ৮টায় বঙ্গভবনে ডাকা হয় উপদেষ্টাদের। সে সময় উপদেষ্টাদের সবাইকে পদত্যাগের অনুরোধ জানালে প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে সরে দাঁড়ান রাষ্ট্রপতি। একই সঙ্গে উপদেষ্টারাও পদত্যাগ করেন। এরপর রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ১৪১ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেন। পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় ড. ফখরুদ্দীন আহমদকে। তিনি নতুন উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেন। এর আগে ২০০৬ সালের ২৮ নভেম্বর তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে প্রধান উপদেষ্টা করে তার নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়।

ওয়ান-ইলেভেন সৃষ্টির প্রাক্কালে সেনাবাহিনীর তৎকালীন প্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। তিনিই এক অনুষ্ঠানে ১১ জানুয়ারির জরুরি অবস্থা জারির দিনটিকে ওয়ান-ইলেভেন বা এক এগারো (১/১১) নামে আখ্যায়িত করেন। জরুরি অবস্থা জারির পর রাজনৈতিক দলগুলোর সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়। তবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হলেও বিভিন্নভাবে আন্দোলন গড়ে ওঠে। এক পর্যায়ে আন্দোলন রাজপথে নেমে আসে। পরিস্থিতি অনুধাবন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এক পর্যায়ে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে। সেই সঙ্গে ঘরোয়া রাজনীতিরও অনুমতি দেয়।

কেন ওয়ান-ইলেভেন হয়েছিল তা ওই ঘটনার কুশীলব সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ তার লেখা ২০০৯ সালে প্রকাশিত ‘শান্তির স্বপ্নে’ বইতে কিছুটা তুলে ধরেছেন তিনি। রাজনীতিতে কোনোভাবেই সেনাবাহিনীকে জড়াতে চাননি, এ কথাও বারবার বইতে লিখেছেন সাবেক সেনাপ্রধান। এমনকি তিনি যখন ডিভিশন কমান্ডারদের দেশের অবস্থা বর্ণনা করতেন এবং তাদের মতামত শুনতে চাইতেন তখন তারাও দ্রুত কিছু করার তাগিদ দিতেন। এ ক্ষেত্রে সাভারের জিওসি মেজর জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর কথা বইতে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন তিনি। এক-এগারো পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারে সেনাবাহিনী সরাসরি না থাকলেও সবখানেই যে তাদের প্রচ্ছন্ন হস্তক্ষেপ ছিল এ কথা সর্বজনবিদিত, যে কারণে দেশে-বিদেশে ওই সরকার ‘সেনা সমর্থিত সরকার’ বলেই পরিচিত। জেনারেল মইন ইউ আহমেদ তার বইয়ে লিখেছেন, জাতিসংঘের একটি প্রচ্ছন্ন হুমকির কথা, যেখানে শান্তিরক্ষা মিশন থেকে বাংলাদেশকে বাদ দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। সেনাবাহিনীর সীমিত আয়ের চাকরিতে সৈনিকদের একমাত্র অবলম্বন জাতিসংঘ মিশন। তাদের সামনে থেকে যদি সেই সুযোগ কেড়ে নেওয়া হয় তা হলে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা কষ্টকর হয়ে পড়বে।

ওয়ান-ইলেভেনের সেদিন বিকালে বঙ্গভবনের ভেতরে সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্তাব্যক্তিদের উপস্থিতিতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টা প্রয়াত প্রফেসর ইয়াজউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে কী হয়েছিল, তা বিভিন্ন জনের বয়ানে খণ্ড খণ্ডভাবে এসেছে বিভিন্ন সময়ে। ‘শান্তির স্বপ্নে’ নামক স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থে মইন ইউ আহমেদ লিখেছেন, তিনিসহ সশস্ত্র বাহিনীর অন্যান্য প্রধান ও ডিজিএফআইয়ের একজন শীর্ষস্থানীয় কর্তা সেদিন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদকে পরিস্থিতি বোঝানোর জন্য বঙ্গভবনে গিয়েছিলেন। তারা আড়াইটার সময় বঙ্গভবনে প্রবেশ করেন। ভেতরে গিয়ে শোনেন, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ করছেন। তাদের একটি কামরায় অপেক্ষায় রাখা হয়। ঘণ্টা দেড়েক অপেক্ষা করার পর রাষ্ট্রপতির দেখা মেলে। রাষ্ট্রপতিকে তারা ‘মহা-সংকটময় পরিস্থিতি’ থেকে দেশকে উদ্ধার করার অনুরোধ জানান। রাষ্ট্রপতি বিষয়টি ভেবে দেখার জন্য সময় নেন।

মইন ইউ আহমেদ লিখেছেন, বঙ্গভবন থেকে বেরিয়ে সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ কর্তাদের মূল কাজ হয় প্রধান উপদেষ্টা হতে রাজি এমন একজন নিরপেক্ষ ব্যক্তি খুঁজে বের করা। তিনি বলেন, বঙ্গভবনেই রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন তাদের দুটো নাম প্রস্তাব করেছিলেন, একজন শান্তিতে নোবেলজয়ী প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস, অন্যজন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফখরুদ্দীন আহমেদ। প্রফেসর ইউনূসকে প্রথম ফোনটি করেন তিনি। তবে প্রফেসর ইউনূস অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে তিনি যেমন দেখতে চান সে রকম বাংলাদেশ গড়তে খণ্ডকালীন সময় যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশকে আরও দীর্ঘ সময় ধরে সেবা দিতে আগ্রহী। সেই মুহূর্তে ড. ইউনূসের কথার মর্মার্থ বুঝিনি। পরবর্তী সময়ে আমরা দেখেছি, তিনি একটি রাজনৈতিক দল করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। যদিও পরিস্থিতির কারণে তাকে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হয়েছিল।

এরপরে ড. ফখরুদ্দীন আহমেদকে ফোন করে ঘুম থেকে জাগানো হয় গভীর রাতে। প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার আমন্ত্রণ পেয়ে স্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার জন্য সময় চান তিনি। আধঘণ্টা পর ফিরতি ফোনে সম্মতি জানান। ওই দিনটিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘটনাবহুল দিন নাইন-ইলেভেনের মতো করে এক-এগারো হিসেবে অভিহিত করার সিদ্ধান্তও তারাই নিয়েছিলেন বলে বইতে লিখেছেন মইন ইউ আহমেদ। সেনাবাহিনীর ওই দিনের এ উদ্যোগ সে সময়ে দেশে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। যদিও সেনাসমর্থিত ওই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পরবর্তী দুই বছরের কর্মকাণ্ড পরে বেশ বিতর্কই সৃষ্টি করে। এর মধ্যে ‘মাইনাস-টু’ ফর্মুলা বলে পরিচিত প্রধান দুই দলের দুই নেত্রীকে অপসারণের একটি চেষ্টা নিয়ে এখনও দেশে সমালোচনা চলে।

২০০৮ সালের শেষদিকে ভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর ড. ফখরুদ্দীন আহমেদ যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। এরপর আর দেশে ফিরেছেন বলে শোনা যায়নি। তিনি ওয়াশিংটনে থাকেন বলে দেশের কোনো কোনো গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে। জেনারেল মইন ইউ আহমেদও যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী হয়েছেন অবসর গ্রহণের পর।


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: