রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে টিনের চালে বৃষ্টির মতো ঝরছে শিশির। ঘরের মেঝে আর আসবাবপত্র যেন এক একটি বরফের খণ্ড। হিমালয়ের কোল ঘেঁষা জেলা পঞ্চগড়ে পৌষের শেষ সময়ের দিনগুলোতে প্রকৃতি এখন এক নির্মম রূপ নিয়েছে।
রোববার (১১ জানুয়ারি) ভোর ৬টায় যখন থার্মোমিটারের কাঁটা ৭ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে দাঁড়িয়ে, তখন দ্বিতীয় ধাপে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহে উত্তরের হিমপ্রবণ জেলা পঞ্চগড়বাসীর জীবনযাত্রা যেন এক বরফ-শীতল স্থবিরতায় থমকে গেছে।
আবহাওয়া অফিস বলছে, তাপমাত্রা ওঠানামা করায় এই শৈত্যপ্রবাহ এখনই কাটছে না। উত্তরের হিমেল বাতাস আর ঘন কুয়াশার দাপট আরও কয়েকদিন চলবে। ততক্ষণ পর্যন্ত এক চিলতে উষ্ণতার আশায় খড়কুটো জ্বালানো আগুনের দিকেই হাত বাড়িয়ে থাকতে হবে এই প্রান্তিক জনপদের মানুষদের।
বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ভোর থেকে ঘন কুয়াশার চাদরে বন্দী প্রকৃতি। সূর্যি মামার দেখা মিললেও উত্তাপ ছড়াতে সে ব্যর্থ। নিম্ন আয়ের মানুষেরা এক টুকরো রোদের চেয়ে আগুনের কুণ্ডলীকেই বেশি আপন করে নিয়েছেন। তবে পেটের তাগিদে তীব্র শীত উপেক্ষা করেই কাজে বের হতে হচ্ছে পাথর ও চা শ্রমিকদের।
সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন জামালের মতো শ্রমজীবীরা। ভোরে যখন কুয়াশার চাদরে ঢাকা চারপাশ, তখন পেটের দায়ে তাকে ছুটতে হয় চা বাগানে।
চা শ্রমিক জামাল বলেন, ঠান্ডায় হাত-পা অবশ হয়ে আসে, মনে হয় রক্ত জমাট বেঁধে যাচ্ছে। কিন্তু কাজ না করলে ঘরের চুলা জ্বলবে না।
জামালের মতো হাজারো শ্রমিকের কাছে এই শীত কেবল আবহাওয়া নয়, বরং টিকে থাকার এক কঠিন যুদ্ধ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে ঘরেও শান্তি নেই। আলেয়া ও ফিরোজার মতো গৃহিণীরা জানান, ঘরের ভেতরটা এখন যেন ফ্রিজ। রান্নাবান্না আর ধোয়া-মোছার কাজে হাত দেওয়াটাই দায় হয়ে পড়েছে। রাতভর ঘরের বিছানা যেন বরফ হয়ে উঠে।
এদিকে হাড়কাঁপানো ঠান্ডার সমান্তরালে বাড়ছে নানান রোগবালাই। হাসপাতালের করিডোরে এখন সর্দি-কাশি, শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া আর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের কান্নার আওয়াজ ভারী করে তুলছে বাতাস। জেলার আধুনিক সদর হাসপাতালসহ উপজেলার হাসপাতালগুলোতে বহির্বিভাগে রোগীদের ভিড় চোখে পড়ার মতো।
চিকিৎসকরা বলছেন, বয়স্ক আর শিশুরা এই শীতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। তারা চিকিৎসার পাশাপাশি শীতে সুরক্ষা থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন।
জেলার প্রথম শ্রেণির তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার কেন্দ্রের জিতেন্দ্র নাথ জানান, গত মঙ্গলবার থেকেই এই অঞ্চলে শৈত্যপ্রবাহ বইছে। আজ (১১ জানুয়ারি) ভোর ৬টায় ৭ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। গতকাল (১০ জানুয়ারি) সকাল ৯টায় জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৮ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তার আগে গত শুক্রবার রেকর্ড করা হয়েছিল ৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
সময়ের আলো/জেডআই