দুর্গম পাহাড়ি পথে বাংলাদেশে আসছেন রোহিঙ্গারা

সারাদেশ

বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি সীমান্ত পথ ব্যবহার করে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মিয়ানমারের রাখাইনে চলমান সংঘাত,

2026-07-19T00:00:55+00:00
2026-07-19T00:07:02+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
দুর্গম পাহাড়ি পথে বাংলাদেশে আসছেন রোহিঙ্গারা
প্রকাশ: রোববার, ১৯ জুলাই, ২০২৬, ১২:০০ এএম  আপডেট: ১৯.০৭.২০২৬ ১২:০৭ এএম
দুর্গম পাহাড়ি পথে বাংলাদেশে আসছেন রোহিঙ্গারা। গ্রাফিক : সময়ের আলো
বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি সীমান্ত পথ ব্যবহার করে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মিয়ানমারের রাখাইনে চলমান সংঘাত, গোলাগুলি, মর্টার হামলা, খাদ্যসংকট ও কর্মহীনতার কারণে দুর্গম এই পথটিকে বেছে নিচ্ছেন অনুপ্রবেশকারীরা।টেকনাফ বা উখিয়ার নদীপথের তুলনায় আলীকদমের জঙ্গল ও পাহাড়ি ঝিরিপথ নজরদারিমুক্ত হওয়ায় স্থানীয় মানবপাচারকারী চক্রের সহায়তায় এই রুটটি এখন তাদের মূল করিডর হয়ে উঠেছে। ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য। 

ডেইলি স্টার-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত আলীকদমে শতাধিক মিয়ানমারের নাগরিক এবং অন্তত ছয়জন সন্দেহভাজন বাংলাদেশি মানবপাচারকারীকে আটক করেছে নিরাপত্তা বাহিনী। 

আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্যমতে, চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত স্থলপথে পালানো মিয়ানমারের নাগরিকদের ৭০ শতাংশই বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, যার সিংহভাগই নারী ও শিশু। ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ১ লাখ ৪১ হাজার ৫০০ জন বাংলাদেশে এসেছেন, যাদের ৭৯ শতাংশই নারী ও শিশু। 

স্থানীয় কুরুকপাতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ক্রাতপুং ম্রো জানান, আর্থিক প্রলোভনের কারণে অনেকেই এই মানবপাচারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন। তিনি বলেন, পাচারকারীদের নাম বললে তার পেছনে বড় বড় শত্রু লেগে যাবে। পাচারকারী চক্র সীমান্ত পার করে আলীকদম বাজারে পৌঁছে দিতে রোহিঙ্গা প্রতি সাড়ে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিচ্ছে। 

অনুপ্রবেশের ক্ষেত্রে মূলত ফাত্রা পাড়া–দোরিমুখ পাড়া–আলীকদম করিডরটি ব্যবহৃত হচ্ছে। বুচিতং, ইয়ংরিং ও লেলং পাড়ার পুরোনো পথগুলোতে নজরদারি বাড়ায় পাচারকারীরা এই নতুন রুট বেছে নিয়েছে। মিয়ানমার সীমান্তের জুরুম ঝিরি (সীমান্ত পিলারের ৫৯ থেকে ৬১ নম্বর এলাকা) সংলগ্ন পাহাড়চূড়ায় সন্ধ্যা নামার আগে রোহিঙ্গারা জড়ো হয় এবং রাত নামলে বাংলাদেশে প্রবেশ করে ফাত্রা ঝিরি ও মাতামুহুরি নদীর অববাহিকা ধরে ভোররাতে সিন্ধুমুখে পৌঁছায়। প্রায় ৫৪ কিলোমিটারের এই দীর্ঘ ও পিচ্ছিল পাহাড়ি পথে জঙ্গল, ঝিরি ও কোমরসমান কাদা-পানি পার হতে গিয়ে অন্ধকারে পাথর বা শিকড়ে হোঁচট খেয়ে অনেকেই আহত হন। 

রাংপু পাড়ার এক ম্রো বাসিন্দা জানান, ‘ওরা ওখানেই (সিন্ধুমুখ) বসে থাকে। কারণ, ওখান থেকে চারপাশে নজর রাখা যায়। কাউকে আসতে দেখলেই দ্রুত বনের ভেতর লুকিয়ে পড়তে পারে। নিরাপত্তা বাহিনীও রাতে ওখানে তেমন একটা যায় না।’

সীমান্ত পার হওয়ার পর দোরিমুখ পাড়া থেকে আলীকদম বাজার পর্যন্ত প্রায় ৫৪ কিলোমিটারের পথ অতিক্রম করতে তাদের প্রায় দুই দিন সময় লাগে। দোরিমুখ পাড়া থেকে পাকা সড়ক শুরু হওয়ায় সেখান থেকে মোটরসাইকেলের মাধ্যমে তাদের আলীকদম বাজারের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। এই কাজে স্থানীয় কিছু বাসিন্দা ও চালকদের আর্থিক প্রলোভন দেখিয়ে রুট ও টহলের তথ্য সংগ্রহ এবং পরিবহন সহায়তা নেওয়া হয়। 

পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে ফাত্রা পাড়ার এক বাসিন্দা জানান, এপ্রিলের শেষ দিকে তিনজন রোহিঙ্গা তাদের গ্রামে এসে জানায় যে তাদের এলাকায় কোনো কাজ ও খাবার নেই, সন্তানদেরও খাওয়াতে পারছে না। 

তিনি বলেন, ‘প্রথমে আমি এই কাজে রাজি হইনি। পরে ভাবলাম, সাহায্য না করলে হয়তো তারা আরও বিপদে পড়বে বা অন্য কারো কাছ থেকে সহযোগিতা নেবে।’ শেষ পর্যন্ত তিনি পথের তথ্য দেন এবং এর বিনিময়ে ১ হাজার টাকা পান। এছাড়া টহল সম্পর্কে অগ্রিম তথ্য সংগ্রহের জন্য পাচারকারীরা ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত দেয়। আলীকদমে পৌঁছানো পর্যন্ত মোটরসাইকেল চালককে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা এবং নিরাপত্তা চৌকি এড়াতে আরও দেড় হাজার থেকে ২ হাজার টাকা দিতে হয় রোহিঙ্গাদের।

নিরাপত্তা চৌকিগুলো ফাঁকি দিতে পাচারকারীরা অভিনব কৌশল অবলম্বন করছে। পোয়ামুহুরী বিজিবি চেকপোস্টে একটি মোটরসাইকেলের পেছনে বাঁধা বালতি দেখিয়ে তল্লাশি করা হলে চালক তা ‘খালি’ দাবি করে পার পেয়ে যান। এরপর মেন্ডন পাড়ার সেনা ক্যাম্প ও কৃলাই পাড়া বিজিবি চেকপোস্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোর ঠিক ৫০০ মিটার আগেই রোহিঙ্গাদের মোটরসাইকেল থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। তারা মূল সড়ক এড়িয়ে পাশের ক্ষয়ে যাওয়া পাহাড়ি পথ দিয়ে হেঁটে চেকপোস্ট পার হন এবং চালক খালি মোটরসাইকেল নিয়ে চেকপোস্ট পার হয়ে ওপারে গিয়ে আবার তাদের তুলে নেয়। 

অনুপ্রবেশের এই কৌশলের সত্যতা নিশ্চিত চেয়ারম্যান ক্রাতপুং ম্রো বলেন, ‘মোটরসাইকেল চালকরা চেকপোস্টের আগেই তাদের নামিয়ে দেন। তারা পাশের পথ দিয়ে হেঁটে পার হয়ে অপর পাশে অপেক্ষা করেন। এরপর মোটরসাইকেল আবার তাদের তুলে নেয়।’ 

আলীকদম বাজারের আগের শেষ সেনা চেকপোস্টের কাছেও যাত্রীরা নয়াপাড়া ও মংচা পাড়া হয়ে বিকল্প পথে হেঁটে দেড় কিলোমিটার দূরে মাতামুহুরি নদী পার হয়ে চেকপোস্ট এড়ায়।

অনুপ্রবেশকারী সব রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে না গিয়ে অনেকে আলীকদমের স্থানীয় বাজার, হোটেল, চায়ের দোকান ও নির্মাণকাজে অত্যন্ত স্বল্প মজুরিতে অনানুষ্ঠানিক শ্রমে যুক্ত হচ্ছে। আটকের আশঙ্কায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে ৪২ বছর বয়সি এক রোহিঙ্গা জানান, মিয়ানমারে খাবারের দাম বেশি ও কাজ না থাকায় সন্তানকে খাওয়াতে পারছিলেন না। ‘এখানে অন্তত খেতে পারছি, কিছু আয় করতে পারছি।’ 

বর্তমানে তিনি আলীকদম বাজারে ১ হাজার টাকা ভাড়ার একটি টিনশেড ঘরে ৪ বছরের সন্তানসহ থাকেন এবং একটি হোটেলে ভোর ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত কাজ করে মাসে ৫ হাজার টাকা আয় করেন। তার স্ত্রী উখিয়ার শরণার্থী শিবিরে রয়েছেন। 

একই পরিস্থিতিতে থাকা অন্য এক শ্রমিক জানান, বেশি মজুরি চাইলে কাজ পাওয়া যায় না, তাই যা দেওয়া হয় তা-ই তারা নেন। ২০ মে রাতে অনুপ্রেবেশ করা আরও দুজন রোহিঙ্গা সীমান্তের ওপার (মিয়ানমার) থেকে আসার কথা স্বীকার করলেও ভয়ে বিস্তারিত বলতে চাননি।


সীমান্ত পার হয়ে আসা অনেক রোহিঙ্গা জাল নাগরিকত্ব সনদ দিয়ে ভোটার তালিকায় নাম লেখাচ্ছেন। এমন অভিযোগের ভিত্তিতে গত ১২ জুলাই আলীকদম সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও তিন ওয়ার্ড সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে কর্তৃপক্ষ। এই অবৈধ যাতায়াত ও অনুপ্রবেশের ফলে স্থানীয় ম্রো সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। 

টোলা পাড়ার গ্রামপ্রধানের বড় ভাই ও কৃষক মনরাই ম্রো বলেন, গত ১৮ মে তার গ্রামের কাছে একটি পরিত্যক্ত জুম ঘরে ১৪ জন রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছিলেন। ‘তারা আমাদের কাছে খাবার চাইতে এসেছিল। আমরা তাদের জুম ভাত দিয়েছিলাম। তারা সবাই আলীকদমের দিকে যাচ্ছিল।’

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (বিআইপিএসএস) সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) এএনএম মুনিরুজ্জামান এই ঘটনাকে অত্যন্ত ‘উদ্বেগজনক’ অভিহিত করে বলেন, প্রত্যন্ত ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় কার্যকর সীমান্ত নিরাপত্তা বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। অনানুষ্ঠানিক পথে রোহিঙ্গা প্রবেশ ঠেকানো সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য একটি বড় ধাক্কা। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের দেশের অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে এভাবে প্রবেশ আশ্রয়দাতা সম্প্রদায়ের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। 

এই সমস্যা সমাধানে দ্রুত সমন্বিত এবং কার্যকর নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে জানান তিনি।

সময়ের আলো/জেডি 


  বিষয়:   দুর্গম  পাহাড়ি পথ  বাংলাদেশ  প্রবেশ  রোহিঙ্গারা 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: