নাটোরে কৃষিজমির উর্বর উপরিভাগের মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে ইটভাটায়। জেলার বিভিন্ন স্থানে এসব মাটি বিক্রি যেন থামছেই না। গত দুই দশকে জেলায় কমে গেছে প্রায় ১০ হাজার হেক্টর আবাদি জমি। অপরিকল্পিতভাবে পুকুর খনন এবং গভীর করে মাটি উত্তোলনের কারণে ঝুঁকিতে পড়েছে ঘরবাড়ি, পাকা সড়ক, বৈদ্যুতিক লাইন এবং নাটোর বিসিক শিল্পনগরী। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের চোখের সামনেই চলছে কোটি কোটি টাকার এই মাটি বাণিজ্য।
দিনের আলো ফোটার আগেই একের পর এক এক্সকেভেটর (ভেকু) ও ডাম্প ট্রাক নেমে পড়ে
কৃষিজমিতে। গভীর করে কেটে নেওয়া হচ্ছে ফসল উৎপাদনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উর্বর উপরিভাগের মাটি। সেই মাটি চলে যাচ্ছে ইটভাটা ও ভরাট কাজে। প্রশাসনের একাধিক অভিযান ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেও বন্ধ করা যাচ্ছে না এই অবৈধ মাটি বাণিজ্য ও পুকুর খনন।
অপরিকল্পিতভাবে পুকুর খননের ফলে ফসলি জমিতে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। আবার কোথাও কোথাও বিশ থেকে ত্রিশ ফুট গভীর করে মাটি উত্তোলন করে পুকুর করার কারণে পাশের ঘরবাড়িতে দেখা দিচ্ছে ফাটল। আবার কোথাও ধসে পড়ছে জমির পাড়। ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎ লাইন এবং নাটোর বিসিক শিল্পনগরী।
নাটোর কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত দুই দশকে জেলায় প্রায় ১০ হাজার হেক্টর আবাদি জমি কমেছে। এর একটি বড় অংশ ইটভাটা, বসতবাড়ি, শিল্প-কারখানা ও বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে দিন দিন কমছে খাদ্য উৎপাদনের জন্য উপযোগী জমি। কৃষি বিভাগ তথ্যমতে, ২০০৬ সালে নাটোর জেলায় মোট আবাদি জমি ছিল ১ লাখ ৫৬ হাজার ৩২৫ হেক্টর। এ বছর তা কমে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৭১৭ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। জেলা মৎস্য বিভাগে সূত্রমতে, ২০১০-১১ অর্থবছরে জেলায় পুকুরের সংখ্যা ছিল ২৮ হাজার ৭৯০টি, আর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে এখন পুকুরের সংখ্যা ৩১ হাজার ৩৬২টি।
বিসিক শিল্পের তথ্যমতে, ১৯৮৭ সালে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শিল্প বিকাশের লক্ষ্যে সাড়ে ১৫ একর জমি নিয়ে ৯০ দশকে নাটোর জেলায় যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন-বিসিক। জমিস্বল্পতা ও অবকাঠমোগত দুর্বলতার কারণে কাক্সিক্ষত শিল্পায়ন হয়নি। এর মধ্যে শিল্পনগরীর বাউন্ডারি ওয়াল ঘেঁষে ২০-৩০ ফুট গভীর প্রায় ৬০ বিঘা আবাদি জমি পুকুর করা হয়েছে। এতেই কপাল পুরেছে বিসিক শিল্পনগরীর। বিসিক শিল্প প্রসারের জন্য যখন প্রস্তুতি চলছিল। তখন রাতারাতি সেখানে পুকুর খনন করা হয়। এতে অতিরিক্ত পুকুর খননের কারণে ঝুঁকিতে পড়েছে আশপাশের বসতবাড়ি, বিসিক শিল্পনগরীর বাউন্ডারি ওয়ালসহ ১২টি শিল্প ও কারখানার স্থাপনা।
কৃষিবিদদের মতে, জমির ওপরের অংশেই থাকে অধিকাংশ জৈব পদার্থ, অণুজীব ও পুষ্টি উপাদান। যা সৃষ্টি হতে একশ থেকে এক হাজার বছর সময় লেগে যায়। এই স্তর কেটে নেওয়া হলে জমির স্বাভাবিক উর্বরতা নষ্ট হয়ে যায়। পরে অনেক সার ব্যবহার করেও আগের মতো ফলন পাওয়া যায় না। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে দেশের সামগ্রিক কৃষি উৎপাদন এবং খাদ্যনিরাপত্তা বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে।
এদিকে শুধু কৃষিজমিই নয়, বিভিন্ন এলাকায় সরকারি খাল ও জলাশয় থেকেও অবাধে মাটি উত্তোলন করে বিক্রয় হচ্ছে। নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো. হাবিবুল ইসলাম খান বলেন, বর্তমানে জেলায় ১ লাখ ৪৭ হাজার ৭১৭ হেক্টর আবাদি জমি রয়েছে। ইতিমধ্যে গত বিশ বছরে ১০ হাজার হেক্টর আবাদি জমি কমে গেছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ গেছে পুকুর খনন ও ইটভাটায়। আর কিছু গেছে রাস্তাঘাট, শিল্প ও আবাসন অবকাঠামোগত উন্নয়নে।
অপরিকল্পিতভাবে যাতে কৃষিজমি নষ্ট না করা হয় এ ব্যাপারে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে পরামর্শ দিচ্ছি। নাটোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. ওমর আলী জানান, একসময় প্রাকৃতিক জলাশয় ও খাল-বিল থেকে প্রচুর দেশীয় প্রজাতির মাছ মাছ পাওয়া যেত। কালের বিবর্তনে এসব খাল-বিল, জলাশয়ে পানি না থাকায় মাছ হ্রাস পেতে থাকে। শিক্ষিত বেকার যুবকরা অনাবাদি জমি, পরিত্যক্ত জায়গায় পুকুর খনন করে মৎস্য চাষে রূপান্তর করে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি করছে।
নাটোরের জেলা প্রশাসক আসমা শাহিন জানিয়েছেন, অবৈধভাবে কৃষিজমি ও সরকারি খালের মাটি কাটা বন্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। বিভিন্ন সময় মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানা, ভেকু জব্দ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে অভিযান আরও জোরদার করার পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে প্রশাসন।
বিশেষজ্ঞদের মতে কৃষিজমির উর্বর মাটি একবার নষ্ট হয়ে গেলে তা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে বহু বছর লেগে যায়। সাময়িক লাভের জন্য চলতে থাকা এই অবাধ মাটি বাণিজ্য বন্ধ করা না গেলে শুধু একটি জেলার নয়, ভবিষ্যতে দেশের কৃষি, পরিবেশ এবং খাদ্যনিরাপত্তার ওপরও এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দিনের পর দিন প্রকাশ্যে মাটি কাটলেও কার্যকরভাবে তা বন্ধ হচ্ছে না। তাদের দাবি, প্রভাবশালী একটি চক্র রাজনৈতিক ও প্রশাসনের কিছু অসাধু ব্যক্তির সহযোগিতায় এই অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে অভিযানের পর কয়েক দিন বন্ধ থাকলেও পরে আবার আগের মতো শুরু হয় মাটি কাটা ও বিক্রি। একাধিক কৃষক জানান, সাময়িক আর্থিক লাভের আশায় অনেকেই কৃষিজমিতে পুকুর খননের নামে জমির মাটি বিক্রি করছেন। কিন্তু সেই জমিতে আর ফসল ফলছে না। এতে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকরাই।
নাটোর বিসিক শিল্পনগরীর শাহফুড ডাল মিলের মালিক বিশ্বজিদ জানান, আমরা প্রত্যেকেই সশরীরে বিভিন্ন সময় ডিসি অফিস, ইউএনও অফিস, রাজনীতিবিদ, সংসদ সদস্য সবার কাছে বারবার গেছি, লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ দিয়েছি কিন্তু কোনো প্রতিকার পাইনি। এমনকি স্টিল ও ভিডিও চিত্র তুলে নিয়ে এসব দফতরে গেছি। কোনোভাবেই পুকুর খনন বন্ধ এবং মাটি বাণিজ্য ঠেকাতে পারি নাই।
এমনভাবে তারা কারখানার ওয়াল ঘেঁষে মাটি কেটে ২০-৩০ ফুট গভীর করে পুকুর করছে। এতে গাছপালা, বাউন্ডারি ওয়াল, বাসাবাড়ি হুমকির মুখে। যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে পুকুরের মধ্যে পড়ে বিলীন হয়ে যেতে পারে। এখন তারা বস্তা দিয়ে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করছে।
সময়ের আলো/এসএকে