ধুঁকছে সরকারি একমাত্র কাচ কারখানা

সাইফুদ্দিন তুহিন, চট্টগ্রাম

সারাদেশ

দেশে বাড়ছে আধুনিক ডিজাইনের ভবন-অফিস। সেই সঙ্গে বড় হচ্ছে কাচের বাজার। বর্তমানে বার্ষিক কাচের চাহিদা দেড় হাজার থেকে দুই হাজার

2026-01-11T21:30:25+00:00
2026-01-11T21:30:25+00:00
 
  সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬,
৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
ধুঁকছে সরকারি একমাত্র কাচ কারখানা
সাইফুদ্দিন তুহিন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: রোববার, ১১ জানুয়ারি, ২০২৬, ৯:৩০ পিএম 
দেশের একমাত্র সরকারি কাচ উৎপাদন প্রতিষ্ঠান ‘উসমানিয়া গ্লাসশিট ফ্যাক্টরি’। ছবি : সংগৃহীত
দেশে বাড়ছে আধুনিক ডিজাইনের ভবন-অফিস। সেই সঙ্গে বড় হচ্ছে কাচের বাজার। বর্তমানে বার্ষিক কাচের চাহিদা দেড় হাজার থেকে দুই হাজার কোটি টাকার। চাহিদার ভরা মৌসুমে বন্ধ একমাত্র সরকারি কাচ উৎপাদন প্রতিষ্ঠান ‘উসমানিয়া গ্লাসশিট ফ্যাক্টরি’। 

বেসরকারি খাতে কাচ উৎপাদন শুরুর পর থেকে এই কারখানায় নেমে আসে দুর্দিন। চট্টগ্রাম নগরীর কালুরঘাট এলাকায় অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানে একসময় ছিল জৌলুস। দিনভর ছিল ভারী মেশিনের প্রচণ্ড গর্জন। এখন চারদিকে পিন পতন নীরবতা। শ্রমিকরা পার করছেন অলস সময়। ২৫০-এর বেশি জনবল নেমে এসেছে ৩৫ জনে। 

ফ্যাক্টরির দ্বিতীয় চুল্লির (ফার্নেস-২) উৎপাদন কার্যক্রম ২০২৩ সালের ৩০ আগস্ট থেকে বন্ধ। জ্বালানি খরচ ও লোকসান এড়াতে বিশেষজ্ঞ কমিটির মতামতের ভিত্তিতে চুল্লি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর থেকে কার্যত সব ধরনের কাচ উৎপাদন বন্ধ আছে। কোলাহলমুখর কারখানায় বিরাজ করছে কবরস্থানের নীরবতা।

বিসিআইসি সূত্র জানায়, ১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি মালিকানাধীন এই প্রতিষ্ঠান ১৯৭২ সালে জাতীয়করণ করা হয়। ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত এটি দেশে একমাত্র গ্লাসশিট উৎপাদন কারখানা ছিল। আগেভাগে গ্লাসের অর্ডার দিয়েও সরবরাহ মিলত না। উৎপাদনের বিপরীতে চাহিদা ছিল অনেক। কিন্তু বেসরকারি খাতে গ্লাস উৎপাদন শুরুর পর বদলে যায় চিত্র। ১৯৯৭ সালে এমইবি গ্রুপ, ২০০৫ সালে পিএইচপি ও নাসির গ্রুপ উৎপাদন শুরু করে। দিন দিন চাহিদা বাড়ে আধুনিক নতুন প্রযুক্তির মানসম্পন্ন কাচের। এরপর উসমানিয়ার কাচের চাহিদা কমতে থাকে। 

বর্তমানে ভবন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসহ নানা স্থাপনায় কাচের ব্যবহার বাড়ছে। তাই প্রতি বছর দেশে কাচের চাহিদা বাড়ছে প্রায় আট থেকে ১০ শতাংশ হারে। এই খাতে নতুন বিনিয়োগ আসছে। চাহিদার ভরা মৌসুমে উসমানিয়াকে আধুনিকায়ন করা হয়নি। নতুন যন্ত্রপাতি স্থাপন করে বেসরকারি খাতের মতো উন্নত কাচ উৎপাদন প্রস্তাব আলোর মুখ দেখেনি। সময়মতো উদ্যোগ না নেওয়ায় শুরু হয় প্রতি অর্থবছরে ক্রমাগত লোকসান। লোকসানের কারণেই ২০২৩ সালে কাচ উৎপাদন বন্ধ করা হয়। এরপর থেকে ধুঁকছে। ক্রেতারা একমাত্র সরকারি কাচ কারখানা উসমানিয়া গ্লাসশিট ফ্যাক্টরি বিমুখ হয়ে পড়েছেন।

বন্ধ হওয়ার আগে থেকেই লোকসানের হিসাব বড় হয়ে যায়। এক দশক ধরে লোকসানের ঘানি টানছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে লোকসানের পরিমাণ ছিল এক কোটি ২০ লাখ টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে লোকসান সাত কোটি ৯১ লাখ টাকা, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সাত কোটি ৮৮ লাখ টাকা, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দুই কোটি ৩৮ লাখ টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে  লোকসান হয় ১০ কোটি ৮২ লাখ টাকা। বন্ধ হওয়ার সময় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে লোকসানের পরিমাণ ছিল ১২ কোটি টাকা। অর্থাৎ বন্ধ হওয়া পর্যন্ত লোকসান ছিল কারখানার বড় বোঝা।

কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্যে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট ২ কোটি ২০ লাখ টাকার কাচ বিক্রি করা হয়। এসব কাচের উৎপাদনব্যয় ছিল ১০ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। পুরোনা প্রযুক্তির উৎপাদন অব্যাহত রাখায় উৎপাদনে ব্যয় বাড়তে থাকে। অথচ ২০১৩-১৪ অর্থবছরেও মুনাফা করেছিল এই প্রতিষ্ঠান। ওই বছর প্রায় ৩ কোটি ৯২ লাখ টাকা মুনাফা করে। এরপর থেকে লোকসান গোনা শুরু করে উসমানিয়া। 

সরেজমিন কারখানা ঘুরে দেখা গেছে, মূল ফটক থেকে উৎপাদন ইউনিট পর্যন্ত কারও দেখা নেই। গেটে আসন পেতে আছে সিকিউরিটির লোক। ভেতরে প্রবেশের মূল প্রশাসনিক ভবনের ডান পাশে আরেকটি ভবনের নিচতলায় বসে আছেন একজন জিএম। আশপাশের হিসাব শাখার সব কক্ষই ফাঁকা। প্রশাসনিক ভবনে বসেন কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক। নিচে হিসাব শাখার কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী বসে আছেন। বেশিরভাগ চেয়ারই ফাঁকা পড়ে আছে। 

কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, বন্ধ থাকায় বহু কর্মীকে বিভিন্ন শাখায় পদায়ন করা হয়েছে। তাই চেয়ারগুলো ফাঁকা পড়ে আছে। দুপুর ১২টা পর্যন্ত প্রশাসনিক ভবনে অবস্থান করে দেখা যায় ব্যবস্থাপনা পরিচালক তার কক্ষে আসেননি। তবে তিনি নিয়মিত অফিস করেন বলে জানালেন কর্মীরা। প্রশাসনিক ভবনের আগে আছে কাচ রাখার বড় বড় গুদাম। মাঝখানে একটি সরু রাস্তা। দুপাশে গুদামের অংশে সারি সারি গ্লাস রাখার স্লট। সবকটি গুদাম পড়ে আছে ফাঁকা। আবর্জনার স্তূপ হয়ে আছে ভেতরের পুরো অংশ। দেয়ালগুলো বিবর্ণ। বিভিন্ন অংশের ইট সুরকি পলেস্তারা খসে পড়েছে। গুদামের পাশে ফার্নেস চুল্লির প্লান্ট। আশপাশের ভবনগুলো একেবারেই জরাজীর্ণ অবস্থায়। চুল্লির প্ল্যান্টে যাওয়ার পথে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা আছে কাচের টুকরো। ১০ একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত এই কারখানা দেখলে মনে হয় ভৌতিক বাড়ি। বহু কর্মীকে অন্য শাখায় বদলির কারণে কোলাহল নেই।

উসমানিয়া থেকে নিয়মিত গ্লাসশিট কিনতেন এমন অনেক ক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সঠিক সময়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে গড়িমসি করা হয়। যার কারণে কারখানার এই খারাপ অবস্থা। ক্রেতা হারিয়ে আজ লোকসানের মুখে পড়েছে। প্রতি বছর কাচের চাহিদা বাড়ছে। চাহিদা বৃদ্ধির এই সময় দেশের প্রথম গ্লাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান উসমানিয়া আরও জমজমাট হওয়ার কথা ছিল। ভরা মৌসুমে এটি বন্ধ থাকা কোনো যুক্তিতে সমর্থন করা যায় না। ধারাবাহিক লোকসানের কারণে শেয়ারহোল্ডাররাও ক্ষতির মুখে পড়েছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেওয়া বন্ধ। ২০১৮-১৯ সাল থেকে বোনাস শেয়ার দেওয়াও বন্ধ রাখা হয়েছে।

কারখানার দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, কাচ উৎপাদন হয় এক ধরনের খনিজ বালু দিয়ে। সিলেট এবং কুমিল্লায় এসব বালু পাওয়া যায়। গ্লাস উৎপাদনের বড় সুযোগ হচ্ছে কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় না। শুধু বর্তমান প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে উচ্চমানের কাচ উৎপাদন করতে পারলে আগের জৌলুস ফিরে আসবে। দেশের ক্রেতারা আবার হুমড়ি খেয়ে পড়বেন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাচ কিনতে।

উৎপাদন শাখার কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফাঁকা গুদামগুলোতে একসময় অর্ডারের গ্লাসে ভর্তি থাকত। আগেভাগে অর্ডার দিয়ে গ্লাস তৈরি করার দরকার হতো। চাহিদা বেশি থাকায় অনেক সময় ক্রেতারা নির্ধারিত সময়ে গ্লাস পেতেন না। এখন সেই সব অতীতের স্মৃতি। বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বেসরকারি গ্লাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থাকায় ক্রেতারা সেদিকেই ঝুঁকে পড়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির উন্নত মানের গ্লাসের চেয়ে এই কারখানায় উৎপাদিত গ্লাসের মান কম। ফলে দ্রুত উসমানিয়ার গ্লাসের চাহিদা কমতে থাকে। চাহিদা কমে যাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়ে। আর লোকসানের ঘানি টানতে গিয়ে গ্লাস উৎপাদনই বন্ধ হয়ে গেছে। 

এ ব্যাপারে উসমানিয়া গ্লাসশিট ফ্যাক্টরির ব্যবস্থাপনা পরিচালক একেএম আনিসুজ্জামান সময়ের আলোকে বলেন, প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ বলতে যা বোঝায় সেরকম কিছু না। এখনও লে অফ করা হয়নি। ফার্নেসের চুল্লির দেওয়া মেয়াদ চলে গেছে। গ্যাস লাইন আছে। গ্লাস উৎপাদন করার সক্ষমতা আছে। চুল্লি নতুন করে নির্মাণ হলে উৎপাদনে যেতে সমস্যা নেই। কারখানা কবে থেকে উৎপাদনে যাবে এ প্রশ্নে তিনি বলেন, বিষয়টি আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বলতে পারবে। তবে কারখানা আবার চালুর চেষ্টা অব্যাহত আছে এটুকু বলতে পারি। 

গ্লাসশিট ফ্যাক্টরিটি বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি করপোরেশন বা বিসিআইসির অধীনে পরিচালিত হয়। এটি বিসিআইসির একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। 


এ ব্যাপারে বিসিআইসির পরিকল্পনা বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী নিয়াজ আবদুল কাদের সময়ের আলোকে বলেন, উসমানিয়াকে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই কারখানায় স্পেশাল এবং কনটেইনার— দুই ধরনের গ্লাস তৈরির জন্য প্রাক-সমীক্ষা হয়ে গেছে। এখন প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে মূল সমীক্ষা শুরু করতে। 

তিনি আরও বলেন, স্পেশাল গ্লাস হবে হিটপ্রুফ, অপারেশন থিয়েটারসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের গ্লাস। আর কনটেইনার গ্লাস হবে ছোট ছোট সাইজের পণ্য বোতলজাত করার গ্লাস। এসব গ্লাস সাধারণ ক্রেতাদের পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠানেও সরবরাহ করা যাবে। প্রাথমিক সমীক্ষায় দেখা গেছে এসব গ্লাস উৎপাদন করলে প্রতিষ্ঠান লাভবান হবে। জনবলের কর্মসংস্থান বাড়বে। তা ছাড়া নতুন ধরনের কাচ উৎপাদন শুরু হলে পরোক্ষভাবে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। 

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় আর্থিক সংস্থান একটি বড় বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, আশা করছি এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়া যাবে। 

আধুনিকায়নের জন্য মন্ত্রণালয়ে দেওয়া শতকোটি টাকার প্রস্তাবটি কোন পর্যায়ে আছে এ প্রশ্নে তিনি বলেন, এসব প্রস্তাব অনেক আগেই দেওয়া হয়েছে। এখানে (ফ্যাক্টরি এলাকায়) একটি নতুন কারখানা হবে।

এফআর


  বিষয়:   চট্টগ্রাম  দেশের একমাত্র  সরকারি কাচ উৎপাদন প্রতিষ্ঠান  উসমানিয়া গ্লাসশিট ফ্যাক্টরি  বন্ধ  ধুঁকছে 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: