যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি জোরদার

সময়ের আলো ডেস্ক

ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ এখন আর শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট নয়। রাজপথে ব্যাপক রাষ্ট্রীয় দমন, শতাধিক মৃত্যুর অভিযোগ ও হাজারো

2026-01-12T03:05:05+00:00
2026-01-12T03:05:05+00:00
 
  শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬,
৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি জোরদার
বিক্ষোভ দমনে মরিয়া তেহরান
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬, ৩:০৫ এএম 
সংগৃহীত ছবি
ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ এখন আর শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট নয়। রাজপথে ব্যাপক রাষ্ট্রীয় দমন, শতাধিক মৃত্যুর অভিযোগ ও হাজারো গ্রেফতারের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ইরান ঘিরে সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করছে। 

এর পাশাপাশি ইসরাইলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় ও সম্ভাব্য সামরিক পরিস্থিতি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা চলছে। বিশ্লেষকদের মতে, অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়ন, আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপ এই তিনটি ধারা একসঙ্গে ইরানকে এমন এক বিপজ্জনক সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়েছে, যার ফল শুধু তেহরানের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা গোটা মধ্যপ্রাচ্যকেই অস্থির করে তুলতে পারে।

বিক্ষোভে ব্যাপক রাষ্ট্রীয় দমন : বিবিসির ধারাবাহিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে চলমান বিক্ষোভ দমনে রাষ্ট্র যে মাত্রার শক্তি ব্যবহার করছে, তা সাম্প্রতিক কয়েক দশকে নজিরবিহীন। তেহরান, ইসফাহান, শিরাজ, মাশহাদ ও তাবরিজসহ বড় শহরগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনী সরাসরি গুলি, কাঁদানে গ্যাস, জলকামান ও লাঠিচার্জ চালিয়েছে। টানা এ বিক্ষোভে কমপক্ষে ১৯২ জন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে একটি মানবাধিকার গোষ্ঠী। নরওয়েভিত্তিক এনজিওটি জানিয়েছে, বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান হিউম্যান রাইটস কমপক্ষে ১৯২ জন বিক্ষোভকারীর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। 

সংস্থাটি সতর্ক করে দিয়ে আরও জানিয়েছে, কয়েক দিন ধরে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের কারণে যাচাইকরণ ব্যাহত হওয়ায় নিহতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে। গ্রেফতার হয়েছেন ২ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষ। নিহতদের মধ্যে নারী ও কিশোরদের উপস্থিতিও নিশ্চিত করা হয়েছে। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে বিবিসিও। বিবিসি পারসিয়ান নিশ্চিত হয়েছে, রাশত শহরের পুরসিনা হাসপাতালে শুক্রবার রাতে ৭০ জনের মরদেহ নিয়ে আসা হয়েছিল। কিন্তু হাসপাতালের মর্গে এত মরদেহ রাখার জায়গা ছিল না। ফলে অনেকের মরদেহ অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালের চিকিৎসকরা বিবিসির কাছে ‘ভয়াবহ’ অভিজ্ঞতার বর্ণনা তুলে ধরেছেন।

সংঘর্ষের ঘটনার পর হাসপাতালটিতে রোগীর চাপ এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে, আহতদের কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন (সিপিআর) করার পর্যন্ত সময় ছিল না বলে জানিয়েছেন সেখানকার চিকিৎসকরা। তেহরানের ওই হাসপাতালটির একজন চিকিৎসক বলেন, প্রায় ৩৮ জন মারা গেছেন, যাদের মধ্যে অনেকেরই মৃত্যু হয়েছে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে...বিশেষ করে যাদের মাথায় ও হৃদপিণ্ডে সরাসরি গুলি লেগেছে।

এ ছাড়া গুলিতে আহতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি অংশ হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মারা গেছেন বলে জানা যায়। সংঘর্ষে এত বেশি মানুষ নিহত হয়েছে যে মর্গে মরদেহ রাখার জায়গা নেই বলে জানান ওই চিকিৎসক। এ অবস্থায় একটির ওপর আরেকটি মরদেহ রাখা হয়। একপর্যায়ে মর্গে জায়গা না হওয়ায় প্রার্থনাকক্ষে নিয়ে গিয়ে মরদেহগুলো স্তূপাকারে রাখা হয়। হতাহতদের মধ্যে বেশিরভাগই বয়সে তরুণ। তাদের বয়স ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। অল্প বয়সে এভাবে প্রাণ হারানোয় তাদের দিকে তাকাতে আমার কষ্ট হচ্ছিল, বলেন হাসপাতালের আরেক কর্মী।

বিবিসি আরও জানিয়েছে, সরকার পরিকল্পিতভাবে ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করে দিয়েছে, যাতে বিক্ষোভের ছবি ও ভিডিও বাইরে না যায়। অনেক এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে। 

হাসপাতালগুলোতেও নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে, যাতে আহত বিক্ষোভকারীদের শনাক্ত করা যায়। সরকারের দাবি, এসব বিক্ষোভ বিদেশি শক্তির উসকানিতে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা। তবে বিবিসির সঙ্গে কথা বলা প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, অধিকাংশ বিক্ষোভ ছিল শান্তিপূর্ণ এবং জীবিকা, স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের দাবিতে।

নিরাপত্তা বাহিনীর শতাধিক সদস্য নিহত :
চলমান বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর অন্তত শতাধিক সদস্য নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। 
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন রোববার জানায়, ইসফাহান প্রদেশে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর ৩০ সদস্য নিহত হয়েছেন। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর বিশেষ ইউনিটের কমান্ডার জানান, গত ৮ ও ৯ জানুয়ারি বিভিন্ন শহরে দাঙ্গা দমনের অভিযানে নিরাপত্তা বাহিনীর আরও আট সদস্য নিহত হন।

আধাসরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, দেশজুড়ে চলমান বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর ১০৯ জন সদস্য নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে ইরানের রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, গোলেস্তান প্রদেশের রাজধানী গোরগানে তাদের একটি ত্রাণ ভবনে হামলার ঘটনায় সংস্থাটির এক সদস্য নিহত হয়েছেন।

কীভাবে কঠোর হলো রাষ্ট্র : প্রথম দিকে বিক্ষোভ শুরু হলে স্থানীয় পুলিশ দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এরপর ধীরে ধীরে আধাসামরিক বাহিনী বাসিজ মোতায়েন করা হয়। পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে বিপ্লবী গার্ড নামানো হয়। সর্বশেষ ধাপে আসে সেনা মোতায়েন ও সর্বাত্মক ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট। বিশ্লেষকদের মতে, এই ধাপে ধাপে কঠোরতা দেখাচ্ছে যে সরকার শুরুতে আন্দোলনের বিস্তার ও গভীরতা ভুলভাবে মূল্যায়ন করেছিল। এখন পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে তারা আরও বেশি শক্তির ওপর নির্ভর করছে, যা ক্ষোভকে আরও উসকে দিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি :
এদিকে এবিসি নিউজ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরান ঘিরে সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করেছে। পারস্য উপসাগরে অতিরিক্ত যুদ্ধজাহাজ ও ডেস্ট্রয়ার মোতায়েন করা হয়েছে। বিমানবাহী রণতরী ও যুদ্ধবিমানগুলোকে উচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে। হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা এবিসিকে জানিয়েছেন, এই প্রস্তুতির উদ্দেশ্য একদিকে ইরানকে বার্তা দেওয়া, অন্যদিকে আঞ্চলিক মিত্রদের আশ্বস্ত করা। পেন্টাগনের ভাষায় এটি ‘ডিটারেন্স’ বা নিবৃত্তিমূলক ব্যবস্থা।

এবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে এই সামরিক তৎপরতা এমন সময়ে জোরদার করা হয়েছে, যখন ইরানের ভেতরে অস্থিরতা তুঙ্গে। এতে তেহরানের শাসকগোষ্ঠী চাপের মুখে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে এমন আশঙ্কাও রয়েছে।

সর্বোচ্চ সতর্কতায় ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা : এবিসি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের সামরিক ও গোয়েন্দা আলোচনা চলছে। আলোচনায় ইরান, হিজবুল্লাহ, হামাস এবং পারমাণবিক কর্মসূচি সবই উঠে এসেছে।

ইসরাইলি কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে কম কথা বললেও কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, তারা ইরানের বর্তমান দুর্বলতাকে কৌশলগত সুযোগ হিসেবে দেখছে। ইসরাইলের আশঙ্কা, ইরান যদি অভ্যন্তরীণ সংকট থেকে বের হতে বাইরের সংঘাতে জড়ায়, তা হলে তা পুরো অঞ্চলে আগুন লাগাতে পারে।

ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ঘিরে দেশটিতে সম্ভাব্য মার্কিন হস্তক্ষেপ নিয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে ইসরাইল। তবে ‘সর্বোচ্চ সতর্কতা’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হয়েছে, সে বিষয়ে সূত্রগুলো বিস্তারিত কিছু জানায়নি।

কেন পরিস্থিতি এত বিপজ্জনক : গার্ডিয়ানে প্রকাশিত বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরান সংকটকে শুধু অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ বা কূটনৈতিক টানাপড়েন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে তিন স্তরের সংঘাত। রাষ্ট্র বনাম জনগণ, আঞ্চলিক শক্তির দ্বন্দ্ব এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার রাজনীতি। 

কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের ফেলো এবং সাবেক হোয়াইট হাউস কর্মকর্তা চার্লস কুপচান গার্ডিয়ানকে বলেন, রাষ্ট্র যখন নিজের জনগণের ওপর আস্থা হারায়, তখন সে বাইরের শত্রুকে সামনে এনে ভেতরের সংকট ঢাকতে চায়। ইতিহাসে এর বহু উদাহরণ আছে।

ইতিহাসবিদ জন লুইস গ্যাডিস গার্ডিয়ানে লিখেছেন, শক্তির মাধ্যমে ঐক্য চাপিয়ে দিলে তা দীর্ঘমেয়াদে জোট বা রাষ্ট্রকে দুর্বল করে। তার মতে, একটি জোট বা রাষ্ট্র টিকে থাকে তখনই, যখন সদস্যরা বা নাগরিকরা স্বেচ্ছায় তার অংশ হতে চায়। গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপ ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে সংস্কারের দিকে ঠেলে দেবে এমন ধারণা অতীত অভিজ্ঞতায় ভুল প্রমাণিত হয়েছে বরং চাপ বাড়লে দমনপীড়ন বাড়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল ও বিভাজন : গার্ডিয়ান লিখেছে, ট্রাম্প প্রশাসনের ভাষা ও কৌশল পরিস্থিতিকে আরও অস্থির করছে। প্রকাশ্যে কঠোর বক্তব্য, সামরিক প্রস্তুতি এবং ইসরাইলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় সব মিলিয়ে ইরানকে কোণঠাসা করার চেষ্টা চলছে। কুপচানের মতে, এ ধরনের কৌশল স্বল্পমেয়াদে শক্তির বার্তা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে ভুল হিসাবের ঝুঁকি বাড়ায়।

ইউরোপীয় দেশগুলো মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিন্দা জানালেও সামরিক সংঘাতে জড়াতে অনিচ্ছুক। জাতিসংঘে বিবৃতি এসেছে কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপ কম। গার্ডিয়ানের ভাষায়, ইরান প্রশ্নে পশ্চিমা বিশ্ব ঐক্যবদ্ধ নয়। বিশ্লেষকদের মতে, সামনে তিনটি সম্ভাব্য পথ রয়েছে। এক, দমনপীড়ন আরও বাড়বে। দুই, সীমিত আঞ্চলিক সংঘাত শুরু হতে পারে। তিন, দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হবে, যা ইরানকে আরও দুর্বল করবে।

ইরান আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে রাজপথের রক্ত, রাষ্ট্রীয় দমন এবং সামরিক শক্তি প্রদর্শন একে অন্যকে উসকে দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি ও ইসরাইলের নিরাপত্তা ভাবনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকটে ভুল সিদ্ধান্ত শুধু ইরানের নয় পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।

সময়ের আলো/এআর

  বিষয়:   যুক্তরাষ্ট্র  সামরিক  প্রস্তুতি  জোরদার 


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: