বাংলাদেশের যেকোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামেই নারীরা থাকেন সামনের সারিতে। সবশেষ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অগ্রণী ভূমিকা ছিল তাদের। দেশে নারী-পুরুষ ভোটারের সংখ্যাও প্রায় সমান। তবে স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় পার করেও রাজনীতিতে নারীর অবস্থান শক্তপোক্ত হয়নি।
প্রতিশ্রুতি ছিল জুলাই সনদ সইয়ের পরবর্তী নির্বাচনে প্রতিটি দল কমপক্ষে ৫ শতাংশ নারীপ্রার্থী মনোনয়ন দেবে। অথচ জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিগত ৫৪ বছরের মধ্যে এবার নারীদের অংশগ্রহণ সবচেয়ে কম হয়েছে। ৫১ রাজনৈতিক দলের ৩০টিতেই নেই নারীপ্রার্থী। এমনকি এবারের ভোটে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠা দল জামায়াতে ইসলামীসহ ইসলামপন্থি কোনো দলই নারীদের মনোনয়ন দেয়নি। বিএনপি প্রার্থী করেছে ৯ জন নারীকে আর গণঅভ্যুত্থান থেকে ওঠে আসা দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) দিয়েছে মাত্র ৩ জন নারীপ্রার্থী।
রাজনীতি বিশ্লেষকরা একে পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতির ফলাফল হিসেবে দেখছেন।
তারা বলছেন, ৫ শতাংশ নারীপ্রার্থী রাখার শর্ত না মানার মধ্য দিয়ে শুরুতেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। এটি শুধু নারীদের নয়, পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য লজ্জাজনক। এর পেছেনে নারীবিদ্বেষী মনোভাব ও নারীদের ক্ষমতা থেকে দূরে রাখার মানসিকতাকে দুষছেন তারা।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে তিনটি ধর্মভিত্তিক দল বাদে ২৭টি দলের প্রতিশ্রুতি ছিলÑ জুলাই সনদ সইয়ের পরবর্তী নির্বাচনে প্রতিটি দল কমপক্ষে ৫ শতাংশ নারীপ্রার্থী মনোনয়ন দেবে। এতে নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত) দেওয়া দলগুলো হলো— বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, চরমোনাই পীরের দল ইসলামি বাংলাদেশ ও মাওলানা মামুনুল হকের দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস।
সনদে বলা আছে, প্রার্থিতা ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ৩৩ শতাংশ করা হবে। তবে মনোনয়নপত্র দাখিলের পর দেখা গেছে, বেশিরভাগ দলই প্রতিশ্রুতি পূরণ করেনি। এক-এগারোর সরকারের সময় নির্বাচন কমিশন ২০২০ সালের মধ্যে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্বের শর্ত বেঁধে দিলে তা-ও পূরণ করতে পারেনি রাজনৈতিক দলগুলো।
ইসির সরবরাহকৃত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে দেশের ৩০০ আসনে দুই হাজার ৫৮২টি মনোনয়ন জমা পড়েছিল। এর মধ্যে নারীপ্রার্থীর মনোনয়নপত্র ছিল ১০৭টি, যা মোট প্রার্থীর তুলনায় ৪.২৬ শতাংশ। এদের মধ্যে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের পর ৩৯ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। শেষে নির্বাচনি প্রতিযোগিতার জন্য এখন পর্যন্ত টিকে আছেন ৬৮ নারীপ্রার্থী।
বিএনপি থেকে ৯ জন, এনসিপি থেকে তিনজন ছাড়াও জাতীয় পার্টি থেকে পাঁচ, গণঅধিকার পরিষদ থেকে দুই, গণসংহতি আন্দোলন থেকে চার, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) থেকে তিন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ মার্কসবাদী) থেকে আট, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জেএসডি থেকে ছয়, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ থেকে ছয় ও গণফোরাম থেকে দুজন নারীপ্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধতা ঘোষণা করা হয়েছে।
তা ছাড়া বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), নাগরিক ঐক্য, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টি (বিআরপি), জাতীয় পার্টি-জেপি, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি), আম জনতার দল, ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশ, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (বিএসপি) এবং বাংলাদেশ মুসলিম লীগ থেকে একজন করে নারীপ্রার্থী রয়েছেন। এ ছাড়া সারা দেশে বিভিন্ন দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত আরও সাতজন স্বতন্ত্র নারীপ্রার্থী বৈধতা পেয়েছেন।
এত কমসংখ্যক নারীপ্রার্থী থাকাকে হতাশাজনক উল্লেখ করেছেন নারী নেত্রী ও নারীর অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো।
৫৪ বছর পর এবার নারীদের অংশগ্রহণ সবচেয়ে কম : নির্বাচনে নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ন্যূনতম প্রতিশ্রুতিও রক্ষা করেনি বলে অভিযোগ করেছে ১২টি সংগঠনের মোর্চা ‘নারী রাজনৈতিক অধিকার ফোরাম’। সংগঠনটির দাবি— দলগুলো ঘোষিত পাঁচ শতাংশ নারীর মনোনয়নও বাস্তবায়ন করেনি, যা নারী নেতৃত্বের প্রতি রাজনৈতিক দলগুলোর অনীহারই প্রমাণ। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩০টি দলের কোনো নারীপ্রার্থী নেই।
সোমবার সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে ‘নারীপ্রার্থী মনোনয়ন সংকট : দলগুলোর প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের ব্যবধান এবং নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহিতা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন ফোরামের নেতারা।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, ৫৪ বছর পর এমন একটি নির্বাচন হচ্ছে যেখানে নারীদের অংশগ্রহণ সবচেয়ে কম। এটি শুধু নারীদের নয়, পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য লজ্জাজনক। রাজনৈতিক দলগুলো যদি নিজেদের ঘোষণাপত্র ও প্রতিশ্রুতি নিজেরাই রক্ষা না করে, তা হলে ভবিষ্যতে নারীরা কেন তাদের ওপর আস্থা রাখবে— এই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কী বলছে রাজনৈতিক দলগুলো : জুলাই গণঅভ্যুত্থান থেকে পরিবর্তনের বার্তা নিয়ে উঠে আসা দল এনসিপিও তাদের মনোনয়নের চিত্রে দেখাতে পারেনি প্রত্যাশিত নারী প্রতিনিধিত্ব। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের দলগুলোর মধ্যে শুধু এনসিপিই তিনজন নারীপ্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে।
এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন সময়ের আলোকে বলেন, এরকম তো হওয়ার কথা ছিল না। আমাদের ছয়জন পরিচিত নারী নেত্রী নির্বাচন করছে না। এটা নিয়ে কোনো আওয়াজও নেই।
তবে জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার সময়ের আলোকে বলেন, আমাদের ৪৪ জন প্রার্থীর মধ্যে ৩ জন নারী রয়েছে। আরও কয়েকজন নারীপ্রার্থী ছিল কিন্তু তারা নির্বাচন করবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছেন। এর মানে আমরা ৫ শতাংশ বেশি নারীপ্রার্থী দিয়েছি, যা এবারের জুলাই সনদে উল্লেখ ছিল। আমরা এই শর্ত পূরণ করেছি।
কেন নারীপ্রার্থী রাখেনি জামায়াতে ইসলামী? জবাবে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ সময়ের আলোকে বলেন, বিষয়টি আমাদের আলোচনায় আছে। পরবর্তী সময়ে নারীপ্রার্থী দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করব। এবার তো আর সুযোগ নেই। সংরক্ষিত আসনে নারীদের প্রার্থী করার সুযোগ আছে। তার দাবি, জুলাই সনদে ৫ শতাংশ নারীপ্রার্থী দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ আছে কিন্তু বাধ্যতামূলক নয়।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ সময়ের আলোকে বলেন, আমরাই সবচেয়ে বেশি নারীপ্রার্থী দিয়েছি। অনেক দল কোনো নারীপ্রার্থীই দেয়নি। এবারের জুলাই সনদে ৫ শতাংশ নারীপ্রার্থী দেওয়ার কথা উল্লেখ আছে। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক সমঝোতা হয়েছে। বিএনপিও নারীদের মাত্র তিন শতাংশের কিছুটা বেশি প্রার্থী করেছে; এর কারণ জানতে চাইলে জবাবে তিনি বলেন, আমরা যতটুকু পেরেছি, চেষ্টা করেছি।
বরিশাল-৫ আসন থেকে প্রার্থী হয়েছেন বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের নেত্রী মনীষা চক্রবর্তী। তিনি সময়ের আলোকে বলেন, নির্বাচনে নারীদের সামনে না আনার চিত্র দীর্ঘদিনের। বাসদ এবার ৪০ জনকে মনোনয়ন দিয়েছে। এর মধ্যে ৫ জন নারী। তাও মনে করি নারীর সংখ্যা কম হয়েছে। আর যে দল একজন নারীকেও প্রার্থী দেয়নি; তারা মূলত দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে নির্বাচন প্রক্রিয়া থেকে বাইরে রেখেছে।
তিনি বলেন, সাইবার বুলিংসহ বিভিন্ন ভয়, রাজনৈতিক দলের কঠোর সিদ্ধান্তের অভাবসহ নানা কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এর মূল সমস্যা নারী বিকাশের পরিবেশ ও নিরাপত্তা বিনষ্ট করা।
বিশ্লেষকরা কী বলছেন : নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভিন হক সময়ের আলোকে বলেন, জুলাই সনদের পুরো প্রক্রিয়াটা নারীবর্জিত ছিল। রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে কাউকে স্টেকহোল্ডার হিসেবে রাখা হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলো নারীদের যেভাবে পেছনে ঠেলে দিয়েছে তাতে আশচর্য হওয়ার কিছু নেই। কারণ তাদের মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চা নেই। নারীবিদ্বেষী মনোভাব ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আছে। এ জন্য নারীদের মনোনয়নের চিত্র দেখে অবাক নই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. রাশেদা রওনক খান সময়ের আলোকে বলেন, নারীদের পেছনে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজেরই অংশ। নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রেও এই চর্চা দেখা গেছে। আন্দোলনে সামনে, ভোটে পেছনে— নারীদের এমন চিত্র প্রায় সব দলের মধ্যে দেখা যাচ্ছে। অত্যন্ত সুকৌশলে নারীদের ক্ষমতার জায়গা থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। নতুন বাংলাদেশে যে সুবাতাস বইবে এমন ধারণা দিয়েছিল, সেখান থেকে তারা নিজেরাই নিজেদের পেছনে ঠেলে দিচ্ছে। এমনকি অভ্যুত্থানের সামনের নেতাদের দল এনসিপি থেকে ভোটের আগে নারীরা বেরিয়ে যাচ্ছে। আন্দোলনে তারা কিন্তু সম্মুখসারিতে ছিল।
জাতীয় ঐক্যমত কমিশনের সদস্য নাগরিকদের সংগঠন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার নারী প্রতিনিধিত্ব প্রশ্নে সময়ের আলোকে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর এই ভূমিকা খুবই দুঃখজনক। গ্রহণযোগ্য নয়। শুরুতেই রাজনৈতিক দলগুলো তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে। তারা ঐক্যমত কমিশনের জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতি রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।
এফআর