রাজশাহীর তানোরে বিলকুমারীতে মাছ নেই। শামুক ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন বিলপাড়ের জেলেরা। কনকনে শীত উপেক্ষা করে সকালেই ছুটছেন বিলে। দীর্ঘ সময় শামুক কুড়িয়ে বাড়ি ফিরেন। যারা এত দিন বিলে মাছ শিকার জীবিকা নির্বাহ করত, এখন শামুক কুড়িয়ে জীবন চালাতে হচ্ছে তাদের।
শিব নদীর নাব্যতা না থাকা ও প্রতিনিয়ত বিলের পানি কমতে থাকার কারণে মাছ পাচ্ছে না জেলেরা। ফলে শামুক মেরে আয় রোজগার করছেন। সরকারিভাবেও কোনো সহায়তা পায় না তারা।
তানোর পৌর সদর শীতলীপাড়া, কুঠিপাড়া, গোল্লাপাড়া হলদার পাড়া কামারগাঁ ইউনিয়নের মালশিরা, মাদারীপুর, বাতাসপুর, দমদমা, কামারগাঁর শত শত জেলেরা সারাবছর বিলের মাছ মেরে সংসার চালান তবে এবার হচ্ছে ব্যতিক্রম।
তানোর পৌর সদরের শীতলীপাড়া গ্রামের জেলে সাদ্দাম হোসেন বলেন, কনকনে শীত থাকার পরও জীবন জীবিকার তাগিদে রাত-দিন বিলে বিভিন্ন প্রকার জাল ফেলেও এক কেজি মাছও পাওয়া যাচ্ছে না। একারণে জেলেরা শামুক মারা শুরু করেছেন। বিলের মাছের ওপর আমাদের জীবন-জীবিকা নির্বাহ। সেই মাছ না পাওয়ার কারণে অন্য পেশা বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে জেলেরা। আবার বিলের পানি কমে যাওয়ার কারণে মাছ হারিয়ে গেছে। বিলে যতটুকু পানি আছে সেখানে অভয়াশ্রম থাকার কারণে জাল ফেলা যায় না।
জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিলকুমারী বা শীব নদী ব্রিজ থেকে ধানতৈড় গ্রাম বা গুবিরপাড়া গ্রামের সামনে বিলের মুল অংশ। সেখানেই রয়েছে বিলের পানি। সামান্য পরিমান জায়গায় পানি থাকার কারণে প্রায় জেলেরা সেখানে জাল ফেললেও তেমন মাছ পায়না।
শীতলীপাড়া গ্রামের জেলে মুন্তাজ, সাগরসহ অনেকে বলেন, বিলে দিনে-রাতে জাল ফেলে যে মাছ পাওয়া যাচ্ছে তা দিয়ে কোনোভাবেই সংসার চালে না। আমরা দরিদ্র জনগোষ্ঠী। এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে জাল-নৌকাসহ মাছ মারার আসবাবপত্র কিনে থাকি। প্রতি সপ্তাহে কিস্তি দিতে হয়। এখন মাছ না পাওয়ার কারণে তিনবেলা খেতে পারা যাচ্ছে না। ঘরে খাবার না থাকলেও কিস্তি দিতেই হবে। তবে অনেকে বাধ্য হয়ে শামুক মারা শুরু করেছেন।
শামুক মেরে জীবিকা নির্বাহ শুরু করেছেন শীতলীপাড়া গ্রামের নুরুল ইসলাম। গত রোববার সন্ধ্যার দিকে তার সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, আমরা ১২ জন একসাথে বিলে শামুক মারছি। ছয়টি নৌকা নিয়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ৭০ থেকে ৮০ বস্তা শামুক মারা যায়। একটি বস্তায় ৪২ কেজি করে শামুক থাকে। এক বস্তা শামুক বিক্রি হয় ১৯০ টাকায় । সেই হিসেবে ৮০ বস্তা শামুকের দাম লাগছে ১৫ হাজার ২০০ টাকা। জনপ্রতি ১ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ১ হাজার বা ১ হাজার ৩০০ টাকা করে পাই। আবার অনেক দিন ৫০০ টাকা পাওয়া যায়।
তাদের দলের তোতা, সজিব, বাবু ও সোনা বলেন, প্রায় একমাস ধরে শামুক মেরে জীবিকা নির্বাহ করা হচ্ছে। আমাদের দেখাদেখি অনেকে শামুক মারা শুরু করেছেন। এখন ৪০/৫০ টি নৌকা নিয়ে ৪/৫ দলে বিভক্ত হয়ে শামুক মারা শুরু হয়েছে । হয়তো আর ১৫ থেকে ২০ দিন শামুক মারা হতে পারে। প্রথম দিকে যে পরিমাণ শামুক পাওয়া যেত সেটা এখন কমে গেছে। শামুক মেরে সন্ধ্যার দিকে শীবনদীর ব্রিজে গিয়ে বিক্রি করছি। একসময় সমিতির মাধ্যমে বিল পরিচালনা করে প্রতিবছর ডিসেম্বর মাসে মাছ ধরে মেলা করা হতো। এসব কেবলই স্নৃতি।
তারা আরও বলেন, শামুক মেরে ব্রিজে বিক্রির জন্য যাওয়ামাত্রই নাটোর ও ঈশরদী,সিরাজগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ট্রাক-পিকআপে এসে ক্রেতারা মাছ ও হাঁসের খামারের জন্য শামুক কিনছেন। তবে কনকনে শীতে প্রচুর কষ্ট করে শামুক মারা হলেও তুলনামুলক দাম কম। দাম বাড়তি হলে আয় আরও বেশি হত। কিন্তু শামুক ১৫ থেকে ২০ দিন মারার পর আবার বেকার হয়ে পড়তে হবে। কারণ আমরা কৃষিকাজ করতে পারি না। এসময়টায় আমাদের সংসার চলে না। সরকারিভাবে যদি কোনো সহায়তা পাওয়া যায় তাহলে অনেক উপকার হতো। কারণ বিলের মাছ মেরে সংসার পরিচালনাসহ সন্তানদের পড়ালেখা ও কিস্তি দেওয়া হয়।
কুঠিপাড়া গ্রামের মিলন, আজাদ, হামিদ বলেন, আমরা ছয়টি নৌকা নিয়ে ১২জন শামুক মারছি। সকাল থেকে সন্ধ্যা আবার কোনোদিন রাতেও মারা হয় শামুক। চাঁন্দুড়িয়া ব্রিজ থেকে চৌবাড়িয়া ব্রিজ পর্যন্ত বিলের অংশ হলেও এসময়ে শুকিয়ে গিয়ে খালের মতো অবস্থা হয়ে থাকে। খালে কেউ কেউ সীমানা নির্ধারণ করে সেচ অথবা যত সামান্য মাছ মেরে থাকে। বিলের মুল অংশ গোল্লাপাড়া খাদ্য গুদামের পূর্ব দিকের শীবনদী সেতু থেকে গুবিরপাড়া বা ধানতৈড় গ্রামের নিচে বিলের মূল অংশে রয়েছে সরকারি অভয়াশ্রম। সেখানে কাউকে মাছ মারতে বা জাল ফেলতে দেখা যায় না।
বিগত বছরগুলোতে এসময় বিলের মূল অংশে একেবারেই তলানিতে থাকে পানি। কিন্তু গত নভেম্বর মাসের শুরুতে একরাতের ভারী বর্ষণে বিলে ব্যাপকহারে পানি বৃদ্ধি পায়। পুকুরের প্রচুর বিলে চলে আশে। জেলেরাও পাইকারী হারে নিষিদ্ধ জাল দিয়ে ছোট বড় মাছ মেরে জীবিকা নির্বাহ করে। ওই সময় জেলে পল্লীতে সুখ বয়। কারন সবাই ব্যাপকহারে মাছ পেত। কিন্তু ছোট ছোট মাছ মারার কারণে বৃদ্ধি পায়না। যার ফলে বিলে মাছ পাওয়া যাচ্ছে না।শামুকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে অনেক জেলে।
মৎস্যজীবী কলিমসহ অনেকে অভিযোগ করে বলেন, বিলে এখন মাছ নেই। উপজেলা মৎস্য দপ্তর কোনো খোঁজ-খবর নেয় না। বিলে মাছ ছাড়ে তাও কেউ জানতে পারে না। সরকারি বরাদ্দ আসলেও মৎস্যজীবীদের দেওয়া হয় না। অতীতে বিলের মাছ দিয়ে মাছের মেলা হতো। সেটাও বাদ গেছে।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সাজু চৌধুরীকে এ বিষয়ে জানার জন্য একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। একারণে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সময়ের আলো/এইচএম.ফারুক/এমএইচজে