মাছশূন্য বিলে শামুক ধরে চলে সংসার

এইচএম ফারুক, তানোর (রাজশাহী)

রাজশাহীর তানোরের কুমারী বিলে মাছ না থাকায় শামুক ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন বিল পাড়ের জেলেরা। কনকনে শীত উপেক্ষা করে বিলে

2026-01-15T01:19:07+00:00
2026-01-15T01:19:07+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
মাছশূন্য বিলে শামুক ধরে চলে সংসার
এইচএম ফারুক, তানোর (রাজশাহী)
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬, ১:১৯ এএম 
রাজশাহীর তানোরের কুমারী বিলের পাড়ে বস্তাভর্তি শামুক কাঁধে নিয়ে যাচ্ছেন দুই জেলে। ছবি : সময়ের আলো
রাজশাহীর তানোরের কুমারী বিলে মাছ না থাকায় শামুক ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন বিল পাড়ের জেলেরা। কনকনে শীত উপেক্ষা করে বিলে বস্তা বস্তা শামুক ধরে তা বিক্রি করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করতে বাধ্য হয়েছেন জেলেরা। পূর্বে বিলে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন বিলপাড়ের মৎস্যজীবীরা। শিব নদীর নাব্যতা না থাকা ও প্রতিনিয়ত বিলের পানি কমতে থাকার কারণে মাছ পাচ্ছেন না জেলেরা। 

ফলে শামুক ধরে আয়-রোজগার করছেন। সরকারিভাবেও কোনো সহায়তা পান না জেলেরা। তানোর পৌর সদর শীতলীপাড়া, কুঠিপাড়া, গোল্লাপাড়া, হলদার পাড়া, কামারগাঁ ইউনিয়নের মালশিরা, মাদারীপুর, বাতাসপুর, দমদমা, কামারগাঁয়ের শত শত জেলে সারা বছর বিলের মাছ ধরে সংসার পরিচালনা করতেন।

তানোর পৌর সদরের শীতলীপাড়া গ্রামের জেলে সাদ্দাম হোসেন বলেন, দিনরাত বিলে জাল ফেলে এক কেজি মাছও পাওয়া যাচ্ছে না। কনকনে শীত থাকার পরও জীবন-জীবিকার তাগিদে রাত কিংবা দিনে বিলে বিভিন্ন ধরনের জাল ফেলেও পাওয়া যাচ্ছে না মাছ। আর এ কারণেই প্রায় জেলেরা শামুক ধরা শুরু করেছেন। বিলের মাছের ওপর আমাদের জীবন-জীবিকা। সেই মাছ না পাওয়ার কারণে অন্য পেশা বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন জেলেরা। আবার বিলের পানি কমে যাওয়ার কারণে মাছ হারিয়ে গেছে। 

বিলপাড়ের জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কুমারী বিল বা শিব নদী ব্রিজ থেকে ধানতৈড় গ্রাম বা গুবিরপাড়া গ্রামের সামনে বিলের মূল অংশ। সেখানেই রয়েছে বিলের পানি। সামান্য পরিমাণ জায়গায় পানি থাকার কারণে প্রায়ই জেলেরা সেখানে জাল ফেললেও তেমন মাছ পান না। শীতলীপাড়া গ্রামের মুন্তাজ, সাগরসহ অনেকে জানান, বিলে দিনে রাতে জাল ফেলে এক থেকে দুই কেজি মাছ পাওয়া যাচ্ছে। 

যা দিয়ে কোনোভাবেই সংসার চলে না এবং দিন দিন পরিস্থিতি কষ্টকর হয়ে পড়েছে। আমরা দরিদ্র জনগোষ্ঠী। এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে জাল নৌকাসহ মাছ ধরার আসবাবপত্র কিনে থাকি। প্রতি সপ্তাহে কিস্তি দিতে হয়। এখন মাছ না পাওয়ার কারণে তিন বেলা ঠিকমতো খেতে পাচ্ছি না। ঘরে খাবার না থাকলেও কিস্তি দিতেই হবে। তবে অনেকে বাধ্য হয়ে শামুক ধরা শুরু করেছেন।

শামুক ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন শীতলীপাড়া গ্রামের নুরুল ইসলাম। তিনি জানান, আমরা ১২ জন একসঙ্গে ছয়টি নৌকা নিয়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিলে শামুক ধরি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ছয়টি নৌকায় ৭০ থেকে ৮০ বস্তা শামুক ধরা যায়। একটি বস্তায় ৪২ কেজি করে শামুক থাকে। এক বস্তা শামুক বিক্রি হয় ১৯০ টাকায়। সেই হিসেবে ৮০ বস্তা শামুকের দাম লাগছে ১৫ হাজার ২০০ টাকা। জনপ্রতি ১ হাজার ২৫০ থেকে ১ হাজার বা ১ হাজার ৩০০ টাকা করে পাচ্ছেন। আবার অনেক দিন ৫০০ টাকাও পাওয়া যায়।

নুরুল ইসলামের দলের তোতা, সজীব, বাবু ও সোনা জানান, প্রায় এক মাস ধরে শামুক ধরে জীবিকা নির্বাহ করা হচ্ছে। আমাদের দেখাদেখি এখন অনেকেই শামুক ধরা শুরু করেছেন। এখন ৪০-৫০টি নৌকা নিয়ে ৪-৫ দলে বিভক্ত হয়ে শামুক ধরা শুরু হয়েছে। হয়তো আর ১৫ থেকে ২০ দিন শামুক ধরা যেতে পারে। প্রথম দিকে যে পরিমাণ শামুক পাওয়া যেত সেটা এখন কমে গেছে। শামুক ধরে সন্ধ্যার দিকে শিব নদীর ব্রিজে গিয়ে বিক্রি করি। একসময় সমিতির মাধ্যমে বিল পরিচালনা করে প্রতি বছর ডিসেম্বরে মাছ ধরে মেলা করা হতো। এসব এখন কেবলই স্মৃতি। 

শামুক ব্রিজে বিক্রির জন্য নিয়ে যাওয়ামাত্রই নাটোর, ঈশ্বরদী, সিরাজগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ট্রাক পিকআপ এসে আমাদের কাছ থেকে এসব কিনে নিয়ে যায়। ক্রেতারা মাছ ও হাঁসের খামারের জন্য শামুক কিনছেন। তবে কনকনে শীতে প্রচুর কষ্ট করে শামুক ধরা হলেও তুলনামূলক কম দাম পাওয়া যায়। দাম বাড়তি হলে আরও বেশি টাকা আয় করা যেত। আর ১৫ থেকে ২০ দিন শামুক ধরার পর আবার আমরা বেকার হয়ে পড়ব। কারণ আমরা কৃষিকাজ করতে পারি না। এ সময়টা আমাদের সংসার চলে না। সরকারিভাবে এ সময় যদি কোনো সহায়তা পাওয়া যায় তা হলে অনেক উপকার হতো। কারণ বিলের মাছ ধরে আমরা সংসার পরিচালনাসহ সন্তানের পড়ালেখা ও কিস্তি দিয়ে থাকি।

বিগত বছরগুলোতে এ সময় বিলের মূল অংশে একেবারেই তলানিতে থাকে পানি। কিন্তু গত নভেম্বর মাসের শুরুতে এক রাতের ভারীবর্ষণে বিলে ব্যাপক হারে পানি বৃদ্ধি পায়। পুকুরের প্রচুর মাছ বিলে চলে আসে। জেলেরাও পাইকারি হারে নিষিদ্ধ জাল দিয়ে ছোট বড় মাছ মেরে জীবিকা নির্বাহ করে। ওই সময় জেলে পল্লীতে সুখ বয়ে যায়। কারণ সবাই ব্যাপক হারে মাছ পেত। কিন্তু ছোট ছোট মাছ ধরার কারণে মাছ বৃদ্ধি পায় না। যার ফলে বিলে মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। শামুকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে অনেক জেলে।

মৎস্যজীবী কলিমসহ অনেকে অভিযোগ করে বলেন, বিলে এখন মাছ নেই। উপজেলা মৎস্য দফতর কোনো খোঁজখবর নেয় না। বিলে মাছ ছাড়ে তাও কেউ জানতে পারে না। সরকারি বরাদ্দ এলেও মৎস্যজীবীদের দেওয়া হয় না। অতীতে বিলের মাছ দিয়ে মাছের মেলা হতো। সেটাও বাদ গেছে। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সাজু চৌধুরীকে এ বিষয়ে জানার জন্য একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। এ কারণে এ সংক্রান্ত তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। 

সময়ের আলো/কেএইচও


  বিষয়:   মাছশূন্য  বিল  শামুক  সংসার 


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: