গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলায় প্রতি বছরের মতো এবারও বসেছে ঐতিহ্যবাহী জামাই মেলা। এই মেলার প্রধান আকর্ষণ হলো বিভিন্ন প্রজাতির বিশাল বিশাল মাছ। উপজেলার জামালপুর, মোক্তারপুর ও জাঙ্গালীয়া ইউনিয়নের ত্রিমোহনায় অবস্থিত বিনিরাইল গ্রামে ঐতিহ্যবাহী এই মেলা পৌষ মাসের শেষ বা মাঘ মাসের প্রথম দিন অনুষ্ঠিত হয়। মেলার দিনটিকে ঘিরে এখানে দিনব্যাপী চলে আনন্দ-উৎসব।
বিনিরাইল গ্রামসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মেয়েরা মেলা উপলক্ষে তাদের স্বামী-সন্তান নিয়ে বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসেন। এলাকার জামাইরা মেলার সবচেয়ে বড় মাছটি কিনে শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে যাওয়ার যেমন চেষ্টা করেন তেমনি শ্বশুররাও চেষ্টা করেন সবচেয়ে বড় মাছটি কিনে মেয়ে, জামাই ও নাতি-নাতনিদের আপ্যায়ন করতে। বিনিরাইলের এই মেলা যেন জামাই-শ্বশুরের বড় মাছ কেনার এক নীরব প্রতিযোগিতা। স্থানীয়রা জানান, এক দিনের এ মেলায় প্রায় পাঁচ কোটি টাকার মাছ বিক্রি হবে।
বুধবার অনুষ্ঠিত এবারের মেলার প্রধান আকর্ষণ ছিল প্রায় ৬ ফুট লম্বা ও ৯২ কেজি ওজনের পাখি মাছ। ৬০০ টাকা কেজি দরে যার দাম ৫৫ হাজার ২০০ টাকা হেঁকেছেন গাজীপুর চৌরাস্তার মা মৎস্য আড়তের মালিক সোহাগ শেখ। মেলায় তিনি বিভিন্ন প্রজাতির ১০ লাখ টাকার মাছের পসরা সাজিয়ে বসেন। এ ছাড়া ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার সায়েদ আলী সুপার মার্কেটের নাইম মিয়া কাতলা, আইড় ও বোয়ালসহ নানা প্রজাতির প্রায় ১৫ লাখ টাকার মাছের পসরা নিয়ে বসেন। তার দোকানের একেকটি কাতলার ওজন ২৫ থেকে ৩০ কেজি। ঢাকার ডেমরা এলাকার মৎস্য ব্যবসায়ী সুমন ২০ কেজির কয়েকটি কাতলাসহ বাহারি প্রায় ৭ লাখ টাকার মাছ নিয়ে মেলায় আসেন। তারা এই মেলায় ১৫-২০ বছর ধরে মাছ বিক্রি করে আসছেন।
স্থানীয়রা জানান, ব্রিটিশ শাসনামল থেকে শুরু হওয়া বিনিরাইলের এই মেলা এখন ঐতিহ্যে রূপ নিয়েছে। শুরুতে এ মেলা শুধু হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য হলেও বর্তমানে এটি সব ধর্মের মানুষের কাছে ঐতিহ্যবাহী উৎসবে পরিণত হয়েছে। মেলায় হাজার হাজার ক্রেতা, বিক্রেতা ও দর্শনার্থীর আগমন ঘটে থাকে। মেলার আয়োজক কমিটির সভাপতি মাওলানা আলী হোসেন জানান, মেলাটি প্রায় ২৫০-৩০০ বছর ধরে চলে আসছে।
এই মেলা প্রতি বছর পৌষ মাস শেষে অনুষ্ঠিত হয়। তাই একে পৌষ সংক্রান্তির মেলাও বলে। মেলা উপলক্ষে এলাকার জামাইরা শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে এসে বড় বড় মাছ কেনেন বলে একে জামাই মেলা বলে। এই মেলায় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ কেনার উদ্দেশ্যে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসে। মেলা উপলক্ষে এলাকার চার-পাঁচ গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে মেহমানরা আসেন। এতে আত্মীয়তার সম্পর্ক সুদৃঢ় হয়। মেলায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এমনকি ভারত ও বার্মা থেকেও মাছের ক্রেতা, বিক্রেতা ও দর্শনার্থীরা আসেন।
সরেজমিন দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানা জাতের বড় বড় মাছ আনা হয়েছে মেলায়। পাশাপাশি আসবাবপত্র, গৃহস্থালির জিনিসপত্র, বাচ্চাদের খেলনা, হরেক রকম মিষ্টি, তিলা, কদমা, ফলসহ নানা জিনিসপত্রের পসরাও সাজিয়েছেন দোকানিরা। বিনোদনের জন্য রয়েছে নাগরদোলা, চরকি, ট্রেন, নৌকা, জাদুঘর ইত্যাদি।
সময়ের আলো/কেএইচও