ছোটপর্দার পাশাপাশি বড়পর্দায় কাজ করলেও নতুন বছরের শুরুতে মৌসুমী হামিদ আলোচনায় সিনেমা নিয়ে। চলতি বছরে একাধিক সিনেমা নিয়ে দর্শকের মাঝে হাজির হচ্ছেন মৌসুমী। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী রোজার ঈদে মুক্তি পাবে তার অভিনীত দুই সিনেমা ‘রঙবাজার’ ও ‘ট্রাইব্যুনাল’।
সম্প্রতি প্রকাশ হয়েছে ‘রঙবাজার’ সিনেমার ট্রেইলার। এক মিনিট ৪৭ সেকেন্ডের ট্রেইলারে একটি যৌনপল্লীর বাসিন্দাদের জীবন, লড়াই এবং টিকে থাকার সংগ্রাম ফুটে উঠেছে। ট্রেইলার প্রকাশের পর থেকেই দর্শক-অনুরাগীদের মধ্যে শুরু হয়েছে আলোচনা, কৌতূহল আর তীব্র প্রত্যাশা। প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো একটি যৌনপল্লী উচ্ছেদের ঘটনা কেন্দ্র করে দুই বছর আগে ‘রঙবাজার’ নির্মাণের কাজ শুরু করেন রাশিদ পলাশ। সিনেমাটির চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখেছেন গোলাম রাব্বানী। এই সিনেমায় একজন মাদক কারবারির চরিত্রে অভিনয় করেছেন মৌসুমী হামিদ।
সিনেমা ও চরিত্রটি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে ‘রঙবাজার’। যৌনকর্মীদের জীবনযাত্রা নিয়েই এগিয়েছে এর কাহিনি। সিনেমাটিতে আমার চরিত্রের নাম কবিতা। যে একসময় যৌনকর্মী ছিলেন। বয়স একটু বাড়ার কারণে খদ্দেরের কাছে তার চাহিদা কমে যায়। জীবন চালাতে গিয়ে পরে মাদক কারবার করেন। চরিত্রটি করে ভীষণ ভালো লেগেছে। ক্যারিয়ারে এমন চরিত্রে এই প্রথম অভিনয় করেছেন মৌসুমী।
এ জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো তার জন্য চ্যালেঞ্জিং ছিল। অভিজ্ঞতাও ছিল ভিন্ন রকম। মৌসুমী হামিদ বলেন, একেবারে যৌনপল্লীতে গিয়ে অভিনয় করাটা ছিল নতুন অভিজ্ঞতা। নিজের চরিত্রটি সুন্দরভাবে উপস্থাপনের জন্য আমি রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের দৌলতদিয়ায় যৌনপল্লীতে দুই সপ্তাহের মতো থেকেছি।
কাছে থেকে তাদের জেনেছি। আসলে বাইরে থেকে রঙিন মনে হলেও একজন যৌনকর্মীর ভেতরটা অনেক ফাঁকা। প্রত্যেকের জীবনে ভীষণ কষ্ট লুকিয়ে রয়েছে। কেউ ইচ্ছা করে এই পেশায় জড়িত হন না। তাদের নিয়ে সবার মধ্যে যে ধারণা তার কিছুটা হলেও পরিবর্তন ঘটাবে ‘রঙবাজার’ সিনেমার গল্প। সিনেমাটি অবশ্যই দর্শক দেখবেন বলে আমার বিশ্বাস।
‘রঙবাজার’র মতো আরেকটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে সিনেমায় কাজ করছেন মৌসুমী হামিদ। রায়হান খান পরিচালিত সিনেমাটির নাম ‘ট্রাইব্যুনাল’। এটি ক্রাইম থ্রিলার ঘরানার ও কোর্টরুম ড্রামা। অভিনেত্রী জানান, ইতিমধ্যে সিনেমাটির ৭০ শতাংশ শুটিং শেষ হয়েছে। চলতি মাসেই শুরু হবে এর বাকি অংশের কাজ।
সিনেমাটি নিয়ে মৌসুমী হামিদ বলেন, গল্প শুনেই কাজটি করতে রাজি হয়ে যান। সিনেমার গল্পটি টানটান উত্তেজনার। একটি দৃশ্য মিস করলে পরের দৃশ্য বুঝা কঠিন হয়ে যাবে। পুরোপুরি না দেখলে সিনেমাটির মজা পাবেন না দর্শক। ট্রাইব্যুনালে আমি প্রত্যক্ষদর্শীর চরিত্রে অভিনয় করছি। যিনি ঘটনাস্থলের নির্মমতা খুব কাছ থেকে দেখেছেন।
১৫ বছরের ক্যারিয়ারে ডজনখানেক সিনেমায় কাজ করেছেন মৌসুমী। ভিন্ন ঘরানার সিনেমায় প্রশংসিত হয়েছে তার অভিনয়। নানা গল্পের চিত্রনাট্যের ডাক পেলেও সব কাজে নিজেকে জড়ান না তিনি। গল্প ও চরিত্র বেছে নিতে বেশ সচেতন এই অভিনেত্রী।
‘রঙবাজার’ ও ‘ট্রাইব্যুনাল’ সিনেমা দুটি বেছে নেওয়ার কারণ প্রসঙ্গে মৌসুমী হামিদ বলেন, একজন অভিনয়শিল্পী দর্শকের মাঝে অনেক দিন বেঁচে থাকেন কাজের মাধ্যমে। কোনো কোনো অভিনয় তার সম্মানকে আলাদা জায়গায় পৌঁছে দেয়। তাই গড়পরতা কাজ না করে বেছে বেছে মানসম্মত কাজ করার চেষ্টা করি।
‘রঙবাজার’ ও ‘ট্রাইব্যুনাল’ সিনেমা দুটির গল্প আমার কাছে ব্যতিক্রম মনে হয়েছে। ‘রঙবাজার’ সিনেমায় নারায়ণগঞ্জের একসময়ের যৌনপল্লী টানবাজার উচ্ছেদের পর কী ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল সেই বাস্তব ঘটনাগুলো তুলে ধরা হয়েছে। গল্পে বেশ কিছু স্পর্শকাতর বিষয় আছে। কবিতা চরিত্রটি চ্যালেঞ্জিং হওয়ায় কাজটি করতে আরও বেশি আগ্রহী হই। একইভাবে ‘ট্রাইব্যুনাল’র চরিত্রটিও চ্যালেঞ্জিং। আসলে মানুষ হিসেবে যা নই, সে ধরনের চরিত্রে কাজ করার মধ্যে চ্যালেঞ্জ থাকে। সেই চ্যালেঞ্জিং চরিত্রে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।
পূর্ণদৈর্ঘ্যরে পাশাপাশি মৌসুমী হামিদ সম্প্রতি শেষ করেছেন একাধিক স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমা। চলতি বছরে বিভিন্ন আর্ন্তজাতিক উৎসবে সিনেমাগুলো প্রদর্শিত হবে বলে জানান তিনি।
বর্তমানে সিনেমা নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও মৌসুমী কাজ করছেন নাটকে। চলতি বছরের শুরুতে মাছরাঙা টেলিভিশনে প্রচারে এসেছে তার ধারাবাহিক নাটক ‘বিশ্বাস বনাম সরদার’। নাট্যকার বৃন্দাবন দাশের রচনায় এর পরিচালনা করেছেন সকাল আহমেদ। এতে গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন মৌসুমী হামিদ। অন্যদিকে এটিএন বাংলায় প্রচারিত হচ্ছে এই অভিনেত্রীর ধারাবাহিক নাটক ‘উকিল বাড়ির বউ’। তবে ধারাবাহিকে দেখা গেলেও একক নাটকে নেই মৌসুমী।
এ প্রসঙ্গে মৌসুমী হামিদ বলেন, এখন আসলে কাজ কম করা হয়। মানসম্মত গল্প ও চরিত্র না হলে ধারাবাহিক কিংবা একক কোনোটাতেই অভিনয় করি না। ‘বিশ্বাস বনাম সরদার’ ও ‘উকিল বাড়ির বউ’ ধারাবাহিক দুটির গল্প আমার কাছে ভালো লেগেছে। হাস্যরসের পাশাপাশি সামাজের কিছু বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে নাটক দুটিতে। তবে গত বছর কিছু একক নাটকেও কাজ করেছি। ভালো প্রস্তাব পেলে ঈদে একক নাটকে হয়তো দেখা যাবে।
একসময় ধারাবাহিক নাটক দর্শকদের মনের খোরাক মেটালেও এখন চাহিদা নেই। ধারাবাহিকে গল্পের ধারাবাহিকতা না থাকায় দর্শক একক নাটকই বেশি উপভোগ করেন। এ প্রসঙ্গে মৌসুমী হামিদের ভাষ্য- দর্শক দেখছেন বলেই ধারাবাহিক নাটক নির্মাণ হচ্ছে এবং বিভিন্ন চ্যানেলে নিয়মিত প্রচার হচ্ছে। দর্শকের ভালো সাড়াও মিলছে। ধারাবাহিকের চাহিদা আগেও ছিল এখনও আছে। তবে দর্শক ভালো গল্প পছন্দ করেন।
নাটকের বর্তমান অবস্থা ও কাজের সংকট নিয়ে জানতে চাইলে মৌসুমী বলেন, ভালো-মন্দ মিলিয়েই চলছে এখনকার নাটক। প্রচুর নাটক তৈরি হলেও মানের শিল্পীদের কাজের অভাব। আগের মতো অভিনয়ে ব্যস্ততা নেই অনেক শিল্পীর। কারও হাতে একেবারেই কাজ নেই। আমিও প্রত্যাশানুযায়ী প্রস্তাব পাচ্ছি না। ক্যারিয়ারের লম্বা একটা সময় পার করেছি। বর্তমানে নিজের অবস্থান অনুযায়ী কাজ পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া বাজেটের বিষয়টি তো রয়েছেই। আমাদের মতো শিল্পীদের বাদ দিয়ে নতুনদের নিয়ে কাজ করেন প্রায় নির্মাতা।
সময়ের আলো/কেএইচও