জরাজীর্ণ স্কুল ভবনের ছাদ থেকে প্রায়ই খসে পড়ে পলেস্তারা। বাঁকা হয়ে গেছে জানালা-দরজা, খুলেও গেছে কয়েকটি। সে ভবনেই ঝুঁকি নিয়ে চলছে শিক্ষার্থীদের পাঠদান। মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার মালখানগর ইউনিয়নের নাটেশ্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবনের অবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই বেহাল। জীবনের ঝুঁকি জেনেও প্রতিদিন ভয় নিয়েই ক্লাসে আসতে হচ্ছে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের। অন্যদিকে ছোট ছোট শিশুদের স্কুলে পাঠাতে গিয়ে উৎকণ্ঠায় থাকছেন অভিভাবকরা। নাটেশ্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২০ সালে। ১৯৭২ সালে স্কুলটি সরকারিকরণ করা হয়। ১৯৯৬ সালে নির্মাণ করা হয় বর্তমান ভবনটি। সম্প্রতি সেটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করলেও পাঠদান চলমান রয়েছে।
এ বিষয়ে সিরাজদিখান উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়ের নামের তালিকা উপজেলা অনুযায়ী অগ্রাধিকারভিত্তিতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরে মহাপরিচালক অফিসে পাঠানো হয়েছে। আশা করছি এ বছরের মধ্যেই আমরা নতুন ভবন পেয়ে যাব। সেই সঙ্গে নতুন আসবাবপত্র সরবরাহের মাধ্যমে সম্পূর্ণরূপে পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারব।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমেনা বেগম বলেন, আমি বিদ্যালয়ে যোগদানের পর এখানে বড় ধরনের কোনো মেরামত হয়নি। জীর্ণ স্কুল ভবনে সন্তানদের পাঠিয়ে আতঙ্কে থাকেন অভিভাবকরা। ইতিমধ্যে দুটি বড় দুর্ঘটনা থেকে আমার বাচ্চারা অল্পের জন্য বেঁচে গেছে। এ জন্য অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের পাশের স্কুলে ভর্তি করাচ্ছেন। আমাদের স্কুলে পড়ালেখার মান ভালো। নতুন ভবন হলে অনেক ছাত্রছাত্রী আবার এই বিদ্যালয়ে ফিরে আসবে।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সানজিদা খানম বলেন, আমি এ বিদ্যালয়ে ২০১০ সাল থেকে শিক্ষকতা করছি। এখানে আসার পর থেকেই জরাজীর্ণ ভবনে ক্লাস নিচ্ছি। সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়। একবার সিলিং ফ্যান খুলে পড়েছে, প্রায় খসে পড়ে পলেস্তারা। আমরা মনোযোগ সহকারে এখানে থাকতে পারি না। বিদ্যালয়ের নতুন একটা ভবন হলে সবার দুশ্চিন্তার অবসান ঘটবে।
স্থানীয়রা জানান, বহুবার নতুন ভবন নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট দফতরে আবেদন করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ভয়ে-আতঙ্কে এরই মধ্যে অসংখ্য ছাত্রছাত্রী স্থানীয় মাদরাসাসহ অন্য স্কুলে চলে গেছে। শিক্ষকরা বলছেন, নতুন ভবন না হলে বিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থা স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে না। তাই দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণের দাবি তাদের।
সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নাটেশ্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে পড়াশোনা করছে ৯৪ শিক্ষার্থী। এখানকার ফলাফল ভালো হওয়ায় দূর-দূরান্ত থেকে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের পাঠদানের জন্য নিয়ে আসেন। তবে বাড়ি থেকে সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে অভিভাবকরা থাকেন আতঙ্কে। শিক্ষকরা জানান, ১৯৯৬ সালে নির্মাণের পর ২০০০ সাল থেকেই ভবনের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিতে শুরু করে। তখন থেকেই ছাদ থেকে খুলে পড়তে থাকে পলেস্তারা। বর্ষাকালে ছাদ দিয়ে পড়ে পানি।
সিরাজদিখান প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, সিরাজদিখান উপজেলায় ১২৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এখানে প্রাথমিক শিক্ষার হার ৭১ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। তবে উপজেলায় প্রায় ২৬ বিদ্যালয়ই ঝুঁকিপূর্ণ।
বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী শাহাজালালের কথায়, আমাদের বিদ্যালয় ভবনটি অনেক পুরোনো। শিক্ষকরা নিরাপদ স্থানে বসিয়ে আমাদের ক্লাস নেন। বিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী শিফা আক্তার জানায়, কয়েক দিন আগে তাদের ক্লাস চলার সময় পলেস্তারা খসে পড়ে। এমনকি তাদের ক্লাসে ফ্যানও খুলে পড়েছিল।
এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বাবলী আক্তার বলেন, বিদ্যালয়টি অনেক ঝুঁকিপূর্ণ। আমাদের সন্তানরা বিদ্যালয়ে এসে অনেক ভয়ে ভয়ে থাকে। আমরা তাদের বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে চিন্তায় থাকি।
স্থানীয়রা দ্রুত বিদ্যালয়ের জন্য একটি নতুন ও নিরাপদ ভবন নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন। তারা বলছেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ শিক্ষা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ জরুরি।