বগুড়ার আদমদীঘি ও নওগাঁর রানীনগর উপজেলায় ২২০ হেক্টর জায়গাজুড়ে ছড়িয়ে আছে ঐতিহ্যবাহী রক্তদহ বিল। এই বিলকে ঘিরে গড়ে উঠেছে ২৩টি গ্রাম। এসব গ্রামের মানুষ বছরের পর বছর এই বিলকে ঘিরেই জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। কিন্তু বিলটি পুনর্খনন না করার কারণে বর্তমানে বছরের অধিকাংশ সময়েই জলাবদ্ধতায় আবদ্ধ থাকছে। এর ফলে একদিকে কমেছে ফসলের উৎপাদন, অন্যদিকে কমেছে প্রাকৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা দেশীয় মাছের আধিক্য। জলাবদ্ধতার কারণে বর্তমানে বিলের জমিতে বছরে মাত্র একবার ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে।
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বলছে, যদি পুনর্খনন করা হয় তা হলে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী রক্তদহ বিলে প্রতি বছর ১৭০ কোটি টাকা মূল্যের অতিরিক্ত ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হবে। অপরদিকে পুনর্খননে বিলে যেমন নতুন প্রাণের সঞ্চার হবে তেমন প্রাকৃতিক পরিবেশে ফিরবে আমূল পরিবর্তন। তাই জীবিকার মান উন্নয়নে ও স্থানীয় অর্থনৈতিক চাকাকে আরও গতিশীল করতে এবং আগামীর টেকসই ও নিরাপদ প্রাকৃতিক পরিবেশ বিনির্মাণে ঐতিহ্যবাহী রক্তদহ বিল পুনর্খননের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবিদরা।
বিল পুনর্খননের সুফলের কথা উল্লেখ করে নওগাঁ বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রেজাউল ইসলাম বলেন, বর্তমানে জলাবদ্ধতার কারণে রক্তদহ বিল এলাকায় বছরে একবার মাত্র ফসল উৎপন্ন হচ্ছে। বিল এবং এর আশপাশের জলাশয় পুনর্খনন করা হলে জলাবদ্ধতা দূর হবে। তখন বছরে তিনবার ফসল উৎপাদন করা করা সম্ভব হবে। খনন করা হলে প্রতি হেক্টরে ১২ মেট্রিকটন হিসেবে বছরে অতিরিক্ত ৫ হাজার ৪০০০ মেট্রিকটন খাদ্যশস্য উৎপাদিত হবে, যার বাজারমূল্য প্রায় ১৭০ কোটি টাকা।
নওগাঁ বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রেজাউল ইসলাম আরও বলেন, খননকৃত বিল ও জলাশয়ের মাটি দিয়ে ১০ ফুট চওড়া পাকা গ্রামীণ সড়ক নির্মাণ করা সম্ভব হবে। এতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন হবে।
পুনর্খননের প্রকল্প সঠিকভাবে বাস্তবায়িত করা গেলে এই অঞ্চলে বিশাল জলাধারের সৃষ্টি হবে। এর ফলে প্রচুর মৎস্য উৎপাদন ও হাঁস পালন করা সম্ভব হবে, যা দেশের মাছ, মাংস ও ডিমের চাহিদা পূরণসহ স্থানীয় জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। নির্মিত গ্রামীণ সড়ক, খাল ও বিলের পাড়ে ফলজ, বনজ এবং ঔষধি গাছও রোপণ করা সম্ভব হবে। বড় জলাধার ও বৃক্ষরোপণের কারণে পাখির নিরাপদ অভয়াশ্রম গড়ে উঠবে। দেশের এমন জাতীয় সম্পদকে সঠিক ও টেকসই ব্যবহারের উপযোগী করে তুলতে বিল পুনর্খননের জন্য ইতিমধ্যে একটি প্রকল্প ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর প্রেরণ করা হয়েছে।
এদিকে রানীনগর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে রক্তদহ বিলের আউটলেট রতনডারা খালের ওপর গড়ে তোলা হয়েছে পাখিপল্লী ও মৎস্য অভয়াশ্রম। এই পর্যটন এলাকায় প্রতিদিনই শত শত পর্যটক প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রকৃতির সান্নিধ্যে এসে পাখি পল্লীর সৌন্দর্য উপভোগ করছেন। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে পাখিপল্লীর সঙ্গে রক্তদহ বিলের জলকেলি উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকদের আগমন ঘটছে। এ বিষয়ে রানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাকিবুল হাসান বলেন, যদি রক্তদহ বিলটি পুনর্খনন করা যায় তাহলে অত্র অঞ্চলের দৃশ্যপট পাল্টে যাবে। রক্তদহ বিলকে ঘিরে পর্যটনের নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে। এ ছাড়া পাখিপল্লীর সার্বিক উন্নয়নে জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, যার অধিকাংশ পদক্ষেপ বাস্তবায়নের কাজও চলমান।
নওগাঁ বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, নওগাঁ জেলার রানীনগর উপজেলা (আংশিক) ও বগুড়া জেলার আদমদীঘি উপজেলায় (আংশিক) ২২০ হেক্টর জায়গাজুড়ে রয়েছে রক্তদহ বিল। বিলে ইনলেট খালের সংখ্যা ২২টি, যেগুলোর দৈর্ঘ্য ১৮৫ কিলোমিটার। জলাবদ্ধতার কারণে প্রতি বছর এই অঞ্চলে ৪ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে মাত্র একবার ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হয়। এতে করে বছরের পর বছর ধরে ২৩টি গ্রামের ৭ হাজার কৃষক পরিবারের ৩৫ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিলটি পুনর্খনন না করার কারণে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ফসল উৎপাদনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে স্থানীয় কৃষকরা।
বিলকৃষ্ণপুর গ্রামের বাসিন্দা সাইদুর রহমান, মুকুল হোসেন, আমিনুল ইসলাম, নুর হোসেনসহ অনেকেই জানান, রক্তদহ বিল হচ্ছে দুটি উপজেলার সম্পদ। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ না করার কারণে সরকার এই সম্পদ থেকে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। যদি বিলটি পুনর্খনন করা হয় তা হলে বিলের জমিতে বছরে তিনবার ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া ফসলের পাশাপাশি মাছেরও উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। ফলে বিলের চারপাশের হাজার হাজার কৃষক ও মৎস্যজীবীদের জীবনচিত্র পাল্টে যাবে। পাল্টে যাবে এই অঞ্চলের দৃশ্যপট। তাই দেশের খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিলটি পুনর্খননের কোনো বিকল্প নেই।