মাঠপর্যায়ের চিকিৎসকদের উদ্ধৃতি দিয়ে তৈরি সানডে টাইমসের এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা বিক্ষোভ দমনে অন্তত ১৬ হাজার ৫০০ বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৩ লাখ ৩০ হাজার মানুষ।
ইন্টারনেট বন্ধ রেখে মানুষ হত্যার এই আয়োজনকে ‘ডিটিজাল অন্ধকারের আড়ালে গণহত্যা’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। ইরান এ পর্যন্ত ৫ হাজার মৃত্যুর কথা স্বীকার করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বরাতে রয়টার্স বলছে, এর মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রায় ৫০০ সদস্য রয়েছে।
হতাহতের স্বীকারোক্তি : মাঠপর্যায়ের চিকিৎসকদের উদ্ধৃতি দিয়ে তৈরি সানডে টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক ইস্যু থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন শেষ পর্যন্ত ইরানি শাসনব্যবস্থা অবসানের দাবিতে ব্যাপক ক্ষোভে রূপ নেয়। শনিবার, দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার পর প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে স্বীকারোক্তিতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বলেন, এই অস্থিরতায় ‘কয়েক হাজার’ মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
তিনি বলেন, এই বিদ্রোহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিজে মন্তব্য করেছেন, উসকানিমূলক লোকদের এগিয়ে যেতে উৎসাহ দিয়েছেন এবং বলেছেন : ‘আমরা তোমাদের সমর্থন করি, সামরিকভাবেও সমর্থন করি।’ সে সময় তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘অপরাধী’ আখ্যা দেন এবং বিক্ষোভকারীদের যুক্তরাষ্ট্রের ‘পদাতিক সৈনিক’ বলে উল্লেখ করেন।
এদিকে ৫ হাজার মৃত্যুর কথা স্বীকার করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘর্ষ এবং সর্বাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কুর্দি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে। তার ভাষ্য, এ অঞ্চলটিতে কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদীরা সক্রিয়; অতীতে বিভিন্ন অস্থিরতার সময়েও সেখানকার সহিংসতা ছিল সবচেয়ে তীব্র। তিনি রোববার বলেন, ‘চূড়ান্ত মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে মনে হচ্ছে না। সড়কে নামা বিক্ষোভকারীদের সমর্থন ও অস্ত্র সরবরাহ করেছে ইসরাইল এবং বিদেশে অবস্থানরত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো।’
রয়টার্স লিখেছে, ইরানি কর্তৃপক্ষ অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার জন্য নিয়মিতই বিদেশি শত্রুদের দায়ী করে থাকে, যার মধ্যে রয়েছে ইসরাইল। এ ঘোর শত্রু গত জুন মাসে ইরানের ওপর সামরিক হামলা চালিয়েছিল।
প্রতিবেদনে সাড়ে ১৬ হাজার মৃত্যুর তথ্য : ইরানের আটটি বড় চক্ষু হাসপাতাল এবং ১৬টি জরুরি বিভাগের কর্মীদের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১৬,৫০০ থেকে ১৮,০০০ মানুষ নিহত এবং ৩,৩০,০০০ থেকে ৩,৬০,০০০ মানুষ আহত হয়েছেন; যাদের মধ্যে শিশু ও গর্ভবতী নারীও রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নিহতদের বেশিরভাগের বয়স ৩০ বছরের নিচে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্তত ৭০০ থেকে ১,০০০ মানুষ একটি চোখ হারিয়েছেন। তেহরানের একটি মাত্র হাসপাতাল নূর ক্লিনিকে ৭,০০০টি চোখের আঘাতের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
রক্তের অভাবেও অনেক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কয়েকটি হাসপাতালে চিকিৎসাকর্মীরা রোগীদের বাঁচাতে নিজেদের রক্ত দান করেছেন। তবে কিছু ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাহিনী রক্ত সঞ্চালনের অনুমতি দেয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
মিউনিখ মেড-এর মেডিকেল ডিরেক্টর এবং ইরানি-জার্মান চক্ষু সার্জন অধ্যাপক আমির পারাস্তা প্রকাশনাটিকে বলেন, ইরানি কর্তৃপক্ষ এবার বিক্ষোভ দমনে সামরিক মানের অস্ত্র ব্যবহার করছে। প্রমাণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, বিক্ষোভকারীদের মাথা, ঘাড় ও বুকে ‘গুলির আঘাত’ দেখা যাচ্ছে।
উল্লেখ্য যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি এখন পর্যন্ত ৩,০৯০ জনের মৃত্যুর বিষয়টি যাচাই করেছে; যার মধ্যে ২,৮৮৫ জন বিক্ষোভকারী। তারা ২২,০০০-এর বেশি গ্রেফতারের তথ্য দিয়েছে।
ডিজিটাল অন্ধকারের আড়ালে গণহত্যা : অধ্যাপক পারাস্তা ইরানের এই কর্মকাণ্ডকে আখ্যা দিয়েছেন ‘ডিজিটাল অন্ধকারের আড়ালে গণহত্যা’ হিসেবে। তিনি প্রকাশনাটিকে বলেন, ‘তারা বলেছিল, এটি থামা পর্যন্ত তারা হত্যা করবে; এবং সেটাই তারা করছে।’
উল্লেখযোগ্যভাবে এই চিকিৎসকরা রাষ্ট্রীয়ভাবে আরোপিত ইন্টারনেট বন্ধের বিরুদ্ধে জীবনরক্ষাকারী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত ইলন মাস্কের স্টারলিংকের মাধ্যমে পত্রিকাটির সঙ্গে কথা বলেছেন। চলতি সপ্তাহের শুরুতে স্টারলিংকের মালিকানাধীন কোম্পানি স্পেসএক্স ইরানের মানুষের জন্য স্যাটেলাইট সেবাটি বিনামূল্যে করে দেয়।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এতে করে মাস্কের কোম্পানি আরেকটি ভূরাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রে চলে এসেছে; এমন এক আঞ্চলিক শক্তির বিরুদ্ধে, যারা স্যাটেলাইট জ্যামার ও সিগন্যাল স্পুফিং পদ্ধতি ব্যবহার করে এমন তথ্য দিয়েছেন কর্মী, বিশ্লেষক ও গবেষকরা।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ শনিবার জানিয়েছিল, নিহতের সংখ্যা ৩,৩০৮ জনে পৌঁছেছে এবং আরও ৪,৩৮২টি ঘটনা পর্যালোচনার আওতায় রয়েছে। সংগঠনটি জানিয়েছে, তারা ২৪ হাজারের বেশি গ্রেফতারের ঘটনা নিশ্চিত হয়েছে।
নরওয়েভিত্তিক ইরানি কুর্দি মানবাধিকার সংগঠন হেঙ্গাও জানিয়েছে, গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ চলাকালে সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘর্ষগুলোর কিছু ঘটেছে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কুর্দি এলাকাগুলোতে।
বিবিসি লিখেছে, ইরানের মুদ্রা রিয়ালের দ্রুত অবমূল্যায়নের ক্ষোভ থেকে ডিসেম্বরের শেষ দিকে দেশটিতে বিক্ষোভ শুরু হয়, যা পরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শাসন অবসানের দাবিতে রূপ নেয়।
সময়ের আলো/এআর